কালো মেয়ের মূল্য কতো?

Canada Tribal sতামান্না ইসলাম: রহিমা খাতুনের মনে বিরাট এক দুঃখ ছিল। বাবা মা তাকে কোনদিন পড়া লেখা শেখার  কোন সুযোগ দিল না। ১৩ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিল। বিয়ের আগে মাদ্রাসায় পড়া বড় ভাইয়ের কাছে লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি লিখতে শিখেছে সে, এইটুকুই।

নিজের মনের এই দুঃখ থেকে জন্ম নিল এক জেদ। তার চার মেয়েকে সে পড়ালেখা শেষ না করিয়ে বিয়ে দিবে না কিছুতেই। লোকের মুখে নানা মন্দ কথা শুনে, অনেক যুদ্ধ করে সে চার চারটি মেয়েকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করিয়েছে।

স্বামী যখন রিটায়ার করেন তখন শুধু বড় মেয়েটির বিয়ে হয়েছে। তারপরে কোন রকমে মেজটিরও বিয়ে দিলেন। ঠেকে গেলেন তিন নম্বরটিকে নিয়ে। রিটায়ার করে তিনি আর তার স্বামী গ্রামের বাড়ি চলে এসেছেন।

ছোট মেয়ে দুইটি ঢাকায় হস্টেলে থেকে পড়া শেষ  করছে। পিঠাপিঠি দুই বোন। ছোটটির একটি ছেলেকে পছন্দ, বিয়ে প্রায় পাকা। আটকে গেছে তিন নম্বরের জন্য। এই মেয়েটির গায়ের রঙ কালো। চোখ দুটি টানা টানা, কিন্তু বোঁচা বোঁচা চেহারা। শুধু এই কারণে মাস্টার্স পাস মেয়েটির জন্য হন্যে হয়েও কোন পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ তার চার মেয়ের মধ্যে এই মেয়েটা সবচেয়ে গুনের। রান্না বান্না, সেবা যত্ন, ঘরের যে কোনো কাজে সে পটু। এতো কিছুর পরেও তার সেই গুণবতী, শিক্ষিত মেয়েকে নিলামে উঠাতে হলো। ত্রিশ হাজার টাকা যৌতুকের বিনিময়ে বিএ পাস এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হলো মেয়েটির। নারী স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা রহিমা খাতুনের আজন্ম লালিত স্বপ্ন মাতৃত্বের কাছে এসে যৌতুক নামক অন্যায়ের কাছে হেরে গেলো।

এই ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু এর চিত্র ঠিক কতখানি পালটেছে গত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরে? সেদিন এক জায়গায় পড়লাম ভারতে প্রতি এক ঘণ্টায় একটি করে মেয়ে যৌতুকের কারণে মারা যায়। আইন করে যৌতুক নিষেধ করা সত্ত্বেও, অতি উচ্চ শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যেও দেখেছি যৌতুক এক অতি সাধারণ ঘটনা।

আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে, এই যুগে, সব ক্ষেত্রে এতো এগিয়ে থেকেও এই শিক্ষিত মেয়েগুলো এই ব্যাপারটা কতো সহজে মেনে নেয়। ভারতে নাকি যৌতুকের মাপ পাত্রীর বয়সের সাথে বাড়তে থাকে। কম বয়সী পাত্রীর যৌতুক কম। আমাদের অবস্থাটা আশা করি তার চেয়ে কিছুটা ভালো।

অর্থাৎ, আধুনিক, শিক্ষিত সমাজে অন্তত ঢাকঢোল পিটিয়ে, বলে কয়ে, জোর করে যৌতুক নেওয়াটা কমেছে। যেটা বেড়েছে সেটা হলো হিন্দি সিনেমার নকলে বিয়ের আয়োজন করতে গিয়ে মা-বাবার শেষ সম্বল খরচ করে ফেলা। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। শিক্ষিত, আধুনিক সমাজে যৌতুকের দাবি না বাড়লেও, কালো মেয়ের দাম কিন্তু বাড়েনি। বদলায়নি তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।

বিয়ের বাজারে কালো, অসুন্দর মেয়েদের অবস্থা রয়ে গেছে একই রকম। শুরুতে পঁয়ত্রিশ বছর আগের যে গল্পটি বলেছি, সেই একই গল্পের পুনরাবৃত্তি দেখেছি কিছুদিন আগেও। কালো বলে বড় বোনের বিয়ে হচ্ছে না, তার জন্য অপেক্ষা করে থেকে থেকে শেষ পর্যন্ত ৮/৯ বছরের ছোট ফর্সা বোনটি বিয়ে করে ফেললো।

কালো মেয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টভঙ্গি না বদলালেও একটা ক্ষেত্রে আমরা কিছুটা উদার হয়েছি। কোন মেয়ে বিয়ে না করে একা আছে, চাকরি করছে শুনলে এখন আর আমরা আঁতকে উঠি না। এই ব্যাপারটাকে সমাজ আস্তে আস্তে মেনে নিতে শুরু করেছে। কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায়।

চাকরি করে, কাজ করে খাওয়া, একা থাকা একটা মেয়ের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমাদের সমাজ ঠিক কতখানি প্রস্তুত? আজ কাজের শেষে বাড়ি ফেরত মেয়েকে পথে গণধর্ষণ করা হয়, কাল যে সেই মেয়েকে একলা ঘরে ধর্ষণের শিকার হতে হবে না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন কি?

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.