হে পুরুষ, এ লজ্জা তোমার

Counter Hit 2ফারহানা আনন্দময়ী: ধর্ষণ শব্দটার মধ্যেই স্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হয় এক সুপ্ত বিকৃত জৈবিক অনুভবের অসভ্য উল্লাসধ্বনি। আমি নিশ্চিত, আমাদের সমাজে অনেক পুরুষ আছেন, যারা খবরের কাগজে কোনো ধর্ষণের খবর, তার বিস্তারিত বর্ণনা একাধিকবার পড়েন শুধু এক বিকৃত আনন্দলাভের জন্যে। যে সিনেমায় ধর্ষণদৃশ্য আছে, সেটি টিকেট কেটে তারা বারবার দেখতে যান শুধু ওই একটি বিশেষ দৃশ্য দেখার জন্যে।

এখন বলুন তো, তারাও কি ধর্ষণ না করেও ধর্ষক নন?

আজ আবার এই বিষয়টি সামনে চলে এলো, আমাদের দেশে ধর্ষণের প্রকরণে নতুন সংযোজন, চলন্ত গাড়িতে দলবেঁধে পালাক্রমে ধর্ষণ। গারো নারী শব্দটিতে আমার আপত্তি আছে, সে নারী, আমার মতই একজন নারী, একজন মানুষ। গত পরশু রাতে বাংলাদেশের একজন নারী ধর্ষিত হয়েছে খোদ রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে, এমন কোনো গভীর রাতও তখন নয়, দেশের সবচেয়ে বৃহৎ শপিং-মলের একটি দোকানের একজন সাধারন বিক্রয়কর্মী তাঁর কাজ সেরে ঘরে ফেরার পথে।

পরদিন সকালে তিন থানা ঘুরে তবেই আক্রান্ত নারীটি অভিযোগ দায়ের করতে পেরেছেন। এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তদন্ত, শুনানির দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলবে, হয়তো বিচারও হবে না… এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ আবারও ধর্ষিত হবে।

আমি দৃঢ়ভাবে ধন্যবাদ জানাই আক্রান্ত নারীটিকে, যিনি এই কঠিন অবস্থাতেও মানসিকভাবে শক্ত থেকে ধর্ষণের ঘটনাটি চেপে না গিয়ে আইনী অভিযোগ দায়ের করেছেন। আমরা এখন থেকে বুঝতে শিখবো, জানবো, ধর্ষিত নারীটির কোনো সম্ভ্রমহানি হয়নি, সম্ভ্রমহানি হয় সমাজব্যবস্থার, সম্ভ্রমহানি হয় এই সমাজে বসবাসকারী ধর্ষক পুরুষজাতির। লজ্জিত হতে শেখো সমাজের বাকি পুরুষ, যারা প্রকাশ্য ধর্ষণ না ক’রেও মনে মনে ধর্ষক… লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাও, যারা আসলেই মানবিক পুরুষ… যারা সত্যিই ঘৃণা করো এই ধর্ষণ নামক বিকৃত অনাচারকে।

ভুলিনি, ২০১২’এর শেষদিনের সকালটা শুরু হয়েছিল নির্ভয়া নামের এক বীর মেয়ের পরাজয়ের উপাখ্যান দিয়ে। পুরুষ নামক কিছু বিকৃত মানসিকতার প্রাণীর সাথে দিল্লির রাস্তায় চলন্ত বাসে ধর্ষণের লড়াইয়ে নিজেকে রক্ষার সংগ্রামে পরাজিত মেয়েটি হেরে গেল জীবন রক্ষার লড়াইয়েও। প্রায় দুইটা সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ের পর জীবনদান করার বিনিময়ে তাঁকে ‘প্রকৃত বীর’ খেতাব অর্জন করতে হলো। সমগ্র ভারত তাঁকে ডেকেছে ‘India’s Daughter’।

কিন্তু দেশমাতা তো পারেনি সেই মেয়ের সম্মান রক্ষা করতে, মূল্যবান জীবনটা রক্ষা করতে। এবং পারেনি, তারও পরে আরো অনেক ধর্ষণ বন্ধ করতে, আবারও নারী ধর্ষিত হয়েছে চলন্ত গাড়িতে, পথে, রেঁস্তরায়। তবে নির্ভয়ার সৌভাগ্য, তাঁর পাশে সেদিন পুরো ভারত যেভাবে প্রতিবাদের, প্রতিরোধের দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছিল, একই ঘটনার শিকার হাজারো হতভাগ্য লাঞ্ছিত নারীর সেই সৌভাগ্য হয় না।

আমাদের জানার বাইরে প্রতিদিন, প্রতিরাতে এরকম অসংখ্য নারীকে হতে হচ্ছে পুরুষ নামক হায়েনার লোলুপ কামনার শিকার, কর্মক্ষেত্রে, ঘরে, রাস্তায়, পাহাড়ে, চলন্ত গাড়িতে… কোথায় নয়? সে খবর পৌছায় না আমাদের কাছে, প্রচার মাধ্যমের কাছে, এমন কি থানা পুলিশের কাছে… কিছুটা সমাজের ভয়ে, কিছুটা আইনী জটিলতার ভয়ে। আমাদের পুরুষশাসিত এবং পুরুষশোসিত সমাজে, ধর্ষণকারী পুরুষটির চেয়ে ধর্ষণের শিকার নারীটিরই যেন গ্লানি অধিকতর।

সমাজ ব্যবস্থার প্রভাবে সাধারণ মানুষের ভেতরে মানসিক ভাবনার দৈন্যটা এমন গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে যে, আক্রান্ত নারীটিকেই ভাবতে বাধ্য করে ধর্ষিত হয়ে যেন অপরাধটা সেই করেছে। বহমান এমন অজস্র ঘটনার মাঝে দিল্লীর সেই ঘটনাটাই ব্যতিক্রম। বর্বরতার অন্ধকারের শিকার মেয়েটিকে আলোকিত জায়গা দেয়া হলো… সে আজ ‘Brave Heart’, সে আজ নির্যাতিত নারীর প্রতীক।

মনে পড়ে গেল ভুলে যাওয়া আমাদের সেই সীমা চৌধুরীর মুখটা। প্রায় একইরকম ঘটনাই তো ঘটেছিল সেদিন। কিন্তু তাঁর এই সৌভাগ্য হয় নি, আমরা তাঁকে ডাকি নি ‘Bangladesh’s Daughter’ বা তৎকালীন আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান সেদিন সীমা চৌধুরীকে আখ্যায়িত করেন নি ‘She is a True Hero’। হতভাগ্য সীমা খেতাব পেয়েছিল পতিতার। আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে ঠিক সন্ধ্যার মুখে গার্মেন্টস কর্মী সীমা চৌধুরী ফিরছিল তাঁরই সহকর্মী বা ছেলে বন্ধুর সাথে। পথ আগলে দাঁড়াল পুলিশ, সন্ধ্যার পর দুজন নারী পুরুষকে একত্রে দেখে তাঁদের ভেতরে একটি অনৈতিক সম্পর্কের পরিচয় জোর করে আরোপ করা হলো এবং চালান করা হলো চট্টগ্রামের রাউজান থানায়। পরদিন পর্যন্ত ছেলেটিকে আটকে রাখা হলো এবং সীমা চৌধুরী সেলের ভেতরে ধর্ষিত হলো চারজন পুলিশ সদস্য দ্বারা। বর্বর পুলিশের শারীরিক ও মানসিক অতাচার সহ্য করতে না পেরে ঘটনার দুই মাস পরে মারা গিয়েছিল সীমা চৌধুরী।

কী করে ভুলি ১৪ বছরের কিশোরী ইয়াসমিনের কথা! ৯৫ সালের ঘটনা…ঢাকা থেকে সেও ফিরছিল বাড়িতে, মায়ের কাছে। পথে একটি পুলিশ ভ্যান তাঁকে তুলে নিলো নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার আশ্বাসে। পরদিন সকালে রাস্তার ওপর পাওয়া গেল ধর্ষিত ইয়াসমিনের আধমরা দেহ। সেদিন ইয়াসমিনকে আমরা ডাকতে পারিনি ‘Brave Heart’। আমাদের দেশে এভাবেই হারিয়ে যায় ভাগ্যহীনা সীমা বা ইয়াসমিনেরা, কালের গর্ভে জায়গা পায় না তাঁদের নির্যাতনের গ্লানিময় ইতিহাস। তাঁদের জন্য এভাবে ফুঁসে ওঠেনি পুরো দেশ, তাঁদের জন্য গণবিক্ষোভে ফেটে পড়েনি আমাদের শিক্ষিত সমাজ। সীমা, ইয়াসমিনদের জন্য জলে ভরে ওঠেনি আমাদের কোনো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের দু’চোখ!

পুরুষের পাশবিক পৌরুষ জাহিরের কয়টা ঘটনাই বা আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় ? বছরখানেক আগে রাঙামাটির কাউখালিতে তোমাচিং মারমা নামের মেয়েটিকে ধর্ষণ করে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলা হলো। আদিবাসী কয়েকটি সংগঠনের মিলিত মানব বন্ধন ছাড়া প্রতিবাদের আর কোনো খবর কোথাও চোখে পড়েনি।

অথচ একজন নির্ভয়ার জন্যে দু’সপ্তাহ ধরে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় পুরো ভারত জুড়ে প্রতিবাদের যে ঝড় দেখেছি গণধর্ষণের বিরুদ্ধে, তুলনাটা আপনিই চলে আসে…শিক্ষা এবং সচেতনতায় কতটা পিছিয়ে আছি আমরা। অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বড্ড বেশি আলসেমি আমাদের! এশিয়ার মানবতাবাদী সংগঠনের রিপোর্টগুলোতে চোখ বুলালে সত্যিই আতংকিত হয়ে উঠতে হয় আমাদের। আমরা সাধারন মানুষরা খবরও রাখি না , পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে গত চার মাসে ঘটে গেছে চারটি নির্মম ধর্ষণের ঘটনা… আর এর মধ্যে একটি আবার ঘটেছে তাঁদেরই নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্য দ্বারাই।

নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন-সম্ভোগ করাকে যদি বলা হয় ধর্ষণ, তবে তো আমাদের মতো দরিদ্র দেশে, যেখানে শতকরা ৮০ভাগ মানুষ দারিদ্র-সীমার নীচে বাস করে, এমন সমাজে শতকরা ৮০ভাগ নারীই তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনে ধর্ষিত হয় তাঁর স্বামী পুরুষটি দ্বারা। পেটের ক্ষুধা মেটানোর তাগিদেই যাদের সারাদিন চলে যায় মানবেতর পরিশ্রমে, সেখানে দিনশেষে কয়জন নারীর তখন বেঁচে থাকে জৈবিক ক্ষুধা?

ধর্ষণের ঘটনা তো এই উপমহাদেশে আজকেই প্রথম নয়, এবং নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এটিই শেষ ঘটনাও নয়। আমরা নারীরা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ধর্ষিত হয়ে এসেছি, হচ্ছি এবং হতে থাকবো, যতদিন পর্যন্ত না এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একনায়ক পুরুষদের মানসিক ভাবনার গঠন পরিবর্তন হবে, তারা উপলব্ধি করতে শিখবে ধর্ষণের লজ্জা তাঁরই লজ্জা।

এবং একই সাথে শরীর আমার, সিদ্ধান্ত আমার…এ অধিকার অর্জনের জন্য নারীদেরও আরও অনেকটা দূর পথ এগোতে হবে… শিক্ষা, সচেতনতা আর স্বনির্ভরতার পথে, একই সঙ্গে আত্মরক্ষার কৌশলগুলোও শিখে নিতে হবে যতটুকু পারা যায়।

শেয়ার করুন:
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.