আমার না বলা গল্প- ৭

0

সুরঞ্জনা চৌধুরী:

একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসছে বার বার। সকাল থেকে বেশ কয়েকবার। এমনিতে কাজের ধরনের কারণে প্রায় সব কলই ধরি। কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকে একটু ইতস্তত করি চেনা নম্বর না হলে।

কিন্তু বার বার কলটি আসছিল, তো ধরলাম। অপর প্রান্তে একটি মেয়ে। ভেজা গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি কাঁদছে। জানতে চাইলাম কে সে, কী কারণে আমায় কল করেছে।
শুনলাম, বুঝতে পারছিলাম মেয়েটি যা বলছে তার প্রতিটি বর্ণ সত্যি।

তিরিশের নিচে মেয়েটির বয়স। কোনও একটি জেলা শহরে চাকরি করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। মোটামুটি ভালো দেখতে। বিয়ে করেনি এখনও। আরেকটি পরিবারের সাথে থাকে।

মেয়েটির যখন বয়স নয়, যে আরবী শিক্ষকের কাছে সে পড়তো আরও অনেকের সাথে, সেই আরবী শিক্ষক একদিন তাকে ডেকে নিয়ে যায় তাবিজ দিবে বলে, যাতে মেয়েটির মুখস্ত দ্রুত হয়।

শিক্ষকের বাড়িতে আর কেউ ছিল না, মেয়েটি ধর্ষিত হলো লোকটির দ্বারা! রক্তাক্ত মেয়েটি মাকে এসে বলে সব কথা, মা চুপ থাকতে বলেন। সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। কিন্তু মেয়েটির চিকিৎসা দরকার বলে জেলা সদরে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাখা হলো কিছুদিন। চিকিৎসা তার হলো ঠিকই, কিন্তু সেই আত্মীয়- সম্পর্কে তার মামা প্রায় প্রতিদিন মেয়েটিকে নগ্ন করে তার সারা গায়ে হাত বুলাতো আর মেয়েটিকে জোর করে তার পুরুষাঙ্গ (পুরুষ?) ধরতে বাধ্য করতো। মেয়েটি কাউকে বলেনি, কারণ সে জেনে গেছে এই কথা বলা যাবে না।

মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে মেয়েটি কোচিং করতো, কোচিং সেন্টারের শিক্ষক নানা ছুতায় তার বুকে হাত দিতো। অন্য মেয়েদেরও দিতো। কিন্তু তারা কেউ কাউকে এসব বলে নাই। কারণ তারা জেনেছে, এসব বলতে হয় না। ঝিনুক নীরবে সহো!!

মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ঢাকায় এসেছে, উঠেছে সম্পর্কিত চাচাতো বোনের বাসায়। মেয়েটি আসার পরে সেই বোনের বেড়ানোর একটা সুযোগ হলো, বাচ্চাদের এই মেয়েটির জিম্মায় রেখে চাচাতো বোন এখানে-সেখানে মনের আনন্দে বেড়ায়। বোনের অবর্তমানে দুলাভাইয়ের শরীর জেগে উঠলে মেয়েটিরই তো দোষ। কেন সে মেয়ে! এই কথা জানাজানি হলে বোনের সংসার ভেঙ্গে যাবে সেই বুদ্ধিটুকু মেয়ের আছে, কাজেই কাকে বলবে সে, কে আছে তার কথা শোনার!
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মেয়েটি এলো হলে থাকতে। ভালো ছাত্রী মেয়েটি শিক্ষকের নজরে এলো। শিক্ষক তাকে আলাদাভাবে নোট দিতেন। বিনিময়ে শরীর ছাড়া আর কীইবা গুরুদক্ষিণা হিসেবে চাইতে পারেন সেই শিক্ষাগুরু! মেয়েটি কাউকে বলতে পারেনি। বলতে হয় না এসব কথা।

চাকরি পেয়েছে মেয়েটি, নিজের মেধার জোরেই পেয়েছে। একই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান- তারা নারীর মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে। মেয়েটির সুপারভাইজার তাকে খুব স্নেহ করেন। অফিসের শেষে তাকে ডেকে পাঠান নিজের রুমে, শেখাতে চেষ্টা করেন কাজ।

এই পৃথিবীতে বিনিময় প্রথায় নারীর জন্য তার শরীরই অপর পাল্লায় তোলা হয়। মেয়েটি সুপারভাইজারেরও সুপারভাইজার- যিনি একজন নারী, তাকে বলার চেষ্টা করলো এই প্রথমবারের মতন। তাকে বলা হলো, এই কথা জানাজানি হলে সেই লোকটির খুব কিছু একটা হবে না, কারণ মেয়েটি কি প্রমাণ করতে পারবে যে লোকটি তাকে যৌন হয়রানি করছে?

হায়, কোন পুরুষ নামের জানোয়ার অধস্তন নারী স্টাফকে যৌন হয়রানি করার সময় সাক্ষী রাখে!!! ধোপে টিকবে না এই নালিশ, মাঝখান থেকে মেয়েটি খারাপ মেয়ে হিসাবে বিবেচিত হবে। বরং সে চেপে যাক, তাকে অন্য জায়গায় বদলি করে দেয়ার চেষ্টা করবেন ওই ঊর্ধ্বতন নারী কর্মকর্তা, এমনটিই মীমাংসা হলো।

মেয়েটি বদলি হয়ে এসেছে আরেক জায়গায়। এখানে ভালই চলছিল। সংস্থার কাজের কারণে সরকারি দফতরের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। বিভিন্ন মিটিঙে যেতে হয়। জেলা সদরের একজন বড় সরকারী কর্মকর্তা মেয়েটিকে ফোন করতে শুরু করেছেন, বিভিন্ন সময়ে মেয়েটিকে তার অফিসে যেতে বলেন। অশালীন ঠাট্টা, যেমন এতো বয়স পর্যন্ত কিভাবে একলা থাকছেন এই জাতীয়।

মেয়েটি অফিসের ঊর্ধ্বতন মহলে জানানোর চেষ্টা করলে তাকে বলা হলো, তার জায়গায় আগে যে মেয়েটি কাজ করতো, সেতো এমন নালিশ করে নাই! নিশ্চয়ই এই মেয়েটির আচরণের মধ্যেই কোনও সমস্যা আছে! আর জলে বাস করে কুমীরের সাথে সংঘাতে যাওয়া যায় না। হায়রে নারীর মানবাধিকার রক্ষার ধ্বজাধারী সংস্থা!

ফোনের অপর প্রান্তে মেয়েটি কাঁদছে, ফোন কানে আমি চুপচাপ। কান্না ভেজা স্বরে সে জানালো, উইমেন চ্যাপ্টার এ ‘আমার না বলা গল্প’ পড়ে তার মনে হয়েছে অন্তত এখানে সে সব কথা খুলে বলতে পারবে।

কি করতে পারবো মেয়েটির জন্য জানি না। চেষ্টা করবো।
তাকে শুধু বললাম ভালো থেকো, সাহস হারিও না। তোমার সাথে এর আগে যা হয়েছে, সেটা তো আর কিছু করতে পারবো না। তবে রুখে দাঁড়াও, আমরা আছি তোমার পাশে। হেরে যেও না। আর জানাবো বাকী সবাইকে তোমার কথা, যে কথা কম বেশী আমাদের সব মেয়ের, সব নারীর।
কেন? কেন? কেন? কেন এমন হবে মেয়েদের সাথে? কেন আমরা পরিবার থেকে সাপোর্ট পাবো না।

পাগলা কুকুরে কামড়ালে যদি কুকুরকে মেরে ফেলা হয়, তাহলে সেই সব পুরুষ (?) যারা কুকুরের থেকেও অধম, তাদের মুখোশ কেন খুলে দেয়া যাবে না। আর কতদিন চুপ থাকতে বলা হবে আমার মেয়েকে, আমার ভাগ্নীকে, আমার ভাইঝিকে, আমার ছোট্ট বোনটিকে? আর কতদিন? (চলবে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 20
  •  
  •  
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৭,৬৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.