পুরুষতন্ত্রের টেরাকোটায় নারী……

Mothers Day 1ফেরদৌসি রিতা: পৃথিবীতে কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, ক্রমশ সে নারী হয়ে ওঠে। পুরুষের এক মহৎ প্রতিনিধি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী!/পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারী।

রোমান্টিকের চোখে নারীমাত্রই দয়িতা বা মানসসুন্দরী, তাই তার চোখে পড়েছে শুধু নারীর চারপাশের বর্ণ, গন্ধ, ভূষণ, যাতে নারীকে সাজিয়েছে পুরুষ। পুরুষতন্ত্র নারীকে নিয়োগ করেছে একরাশ ভূমিকায় বা দায়িত্বে। নিয়োগ করেছে কন্যা, মাতা, গৃহিণীর ভূমিকায়, এবং তাকে দেখতে চায় সুকন্যা, সুমাতা, সৃগৃহিনীরূপে। এই ভাবনা কিন্তু কেবলমাত্র এ সমাজের পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়, এ ভাবনা নারীর জন্যে পুরুষসুলভ করুণা, এবং পুরুষ গর্ভে ধারণ করার গর্বও তিনি বোধ করেন।

বাংলায় নারী’ শব্দ নির্দেশ করে বাসনার উপর ভিত্তি করে। যেমন স্ত্রী, রমনী, ললনা, অঙ্গনা, কামিনী, বনিতা, মহিলা, বামা, নিতম্বিনী, সুন্দরী। এর পাশাপাশি আরো রয়েছে মেয়েমানুষ,’ ‘মেয়েলোক, ‘মেয়েছেলে যা থেকে বোঝায় নারী একটি স্ত্রীলিঙ্গ পশু। নারীকে মানুষ করে দেখবার পরিবর্তে এই যে বিভিন্ন সম্মোধন দিয়ে তাকে কালিমালিপ্ত করেছে এই সমাজ সেই সমাজ কিসের ইঙ্গিত বহন করে সেটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।

পুরুষতন্ত্র যা একটা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা একেক সমাজে একেক রূপ ধারণ করে। পুঁজির সাথে এই মতবাদ বা তন্ত্রের একটি সখ্যতা রয়েছে। পুঁজিতন্ত্র বা পুঁজিবাদ সম্পত্তির উপর ব্যক্তিমালিকানাকে প্রাধান্য দেয় অর্থ্যাৎ সেখানে উৎপাদনের উপকরণসমূহ ব্যক্তিমালিককে ছেড়ে দেয়া হয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদন, বন্টন, চাহিদা যোগান, মূল্য-নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত উদ্যোগকে সমর্থন করা হয়। আর এখানে নারী নিয়ন্ত্রিত হয় পুরুষের কঠোর নিয়ম শৃংখলার মধ্যে। তার ব্যক্তিগত একটি সম্পদের অংশ হিসেবে।

এখানে অনেকেই মনে করেন এই ব্যবস্থায় অবাধ প্রতিযোগিতার কারনে শ্রেণী- শোষণ বৃদ্ধি পায়। এই শ্রেণী শোষণের করাঘাতে নারী পৃষ্ঠ হতে থাকে। নারীকে সকল মানব সম্পদের অধম করে তাকে আরো বেশি শোষিত হতে হয়। কারণ নারী যে কাজ করে থাকে সাধারণত সেটি ঘরের ভেতরে আর সেই কাজ কোনো উৎপাদনশীল কাজের সংগায় পড়ে না। যেহেতু এই কাজ অতিরিক্ত মূল্য সৃষ্টি করে না সেহেতু তাকে কোনোরূপ উৎপাদনশীল কাজ হিসেবে ধরা হয় না।

সেকারণেই নারী সব সময়ের জন্যেই শ্রেণী শোষনের তলদেশে অবস্থান করে। এই ব্যবস্থায় সব শ্রেণীর পুরুষ শোষিত হয় তবে সবচেয়ে নির্মমভাবে শোষিত এবং প্রচন্ডভাবে শৃংখলিত হয়ে থাকে নারী। যার কিছু নমুনা আমরা আমাদের সমাজে দেখতে পাই।

পুঁজিবাদী বিশ্বের নিয়ম হচ্ছে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা। পুঁজিতন্ত্র সবসময় একে অপরকে ঠকিয়ে ব্যক্তি সাফল্য অর্জনের মন্ত্রণা দেয়। এটা এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা যেখানে বন্ধু কে, বা শত্রু কে সেটা বড় কথা নয় কিভাবে সে নিজেকে টিকিয়ে রাখবে সেটাই তার কৌশল। পুরুষতন্ত্রের সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নারী কখনও কখনও তার উপর চাপিয়ে দেয়া অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়ে থাকে এবং অনেকক্ষেত্রে নারী হয়ে ওঠে নারী নির্যাতক। যেহেতু এই ব্যবস্থায় সমগ্র মানব জাতির মধ্যে পুঁজিপতিরা নিম্ন শ্রেণীর মানব জাতিকে শোষণ করতে থাকে সেই মানব জাতির মধ্যে আবার একটু ক্ষমতাবান নারী জাতি অপেক্ষাকৃত দুর্বল নারীকে টিকে থাকার সংগ্রামে শোষণ করতে থাকে। সমাজ কর্তৃক সে এই ধারণাটি সংগ্রহ করে এবং তার প্রয়োগ করে থাকে সমাজের মধ্যে অবস্থানরত ক্ষমতাহীন নারীর উপর। তাই নারী নির্যাতনের নির্যাস বুঝতে হলে এই ব্যবস্থাটিকে খুব পরিস্কারভাবে উপলব্ধি করতে হবে।

শ্রেণীবিভক্ত সমাজের পুরুষতন্ত্র এ রকম অভিভাবকের জোরেই নারীর চিন্তা ও আচরণকে নিয়ন্ত্রিত করে, নারীকে দিয়েই নারী নিপীড়নের কাজটি করিয়ে নেয়। লোকসাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় এমন সব পুরুষতান্ত্রিক অভিভাবকেরই কথামালা প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এইসব কথামালা প্রতিনিয়ত শুনতে শুনতে নারী নিজের অজ্ঞাতসারেই পুরুষতান্ত্রিক ভাবনায় প্রভাবিত হয়ে সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আর এই ভাবনা থেকেই নারীকে পুরুষতন্ত্র-বঞ্চিত ভূমিকা গ্রহণে বাধ্য করে। অথচ আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় নারী যেন নিজের ইচ্ছায় কিংবা সহজাত প্রবৃত্তির তাড়নাতেই নারী নিপীড়নে প্রবৃত্ত, নারী স্বভাবতই নারীর শত্রু, নারীই নারী-অধিকারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারিনী।

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সকল সমাজেই নারী চরম শোষণ ও লাঞ্ছণার শিকার হয়েছে। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষ চিরকাল নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্রোহ করেছে, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠার ইতিহাসও আমাদের জানা আছে। টিকে থাকার সংগ্রামে যারা অগ্রগামী হয়েছে, যারা সাহসিকতা দেখিয়েছে তারাই জয়ী হয়ে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

নারী জাগরণের সেই ইতিহাসে যাদের নাম লিখিত আছে তাদের মধ্যে আছেন আশালতা সেন (১৮৯৪-১৯৮৬) ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে একজন নারীনেত্রী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১-১৯৩২) সর্বকনিষ্ঠ ব্রিটিশ আন্দোলনে আত্মাহুতি দেন, মনোরমা বসু (১৮৯৭-১৯৮৬) নারীনেত্রী মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য, জবেদা খাতুন চৌধুরী (১৯০১-১৯৪৫) প্রথম মুসলিম রাজনীতিবিদ, ক্লারা জেটকিন (১৮৫৭-১৯৩৩) নারী দিবস প্রতিষ্ঠার ঘোষক, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) নারী শিক্ষার প্রবক্তা, এ্যানি বেসান্ত (১৮৪৭-১৯৩৩) নারী অধিকার আদায়ের নেত্রী-ইন্ডিয়া, লুসি স্টোন (১৮১৮-১৯৯৩) নারী অধিকার আদায়ের নেত্রী-আমেরিকা, কল্পনা দত্ত জোসি (১৯১৩-১৯৯৫) ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের যোদ্ধা, ইলা মিত্র (১৯২৫-২০০২) তেভাগা আন্দোলনের রানীমা, হেনা দাস (১৯২৪-২০০৯) ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী,  সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯) বাংলা মায়ের প্রাণের কবি ও নারীনেত্রী, গীতা মুখার্জী (১৯২৪-২০০০)পার্লামেন্ট সদস্য ও নারীনেত্রী, বেটি ফ্রাইডেন (১৯২১-২০০৬) নারীবাদী লেখক-আমেরিকা, লীলা নাগ (১৯০০-১৯৭০) স্বাধীকার আন্দোলনের নেত্রীসহ রয়েছে নাম না জানা অনেক আন্দোলনকারী। মহিয়সী এই নারীরা পুঁজিতন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। নারীকে মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি শোষিত মানুষের পক্ষে এরা নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।

ইতিহাসের এইসব মহিয়সী নারীর জীবনযুদ্ধের ইতিহাস থেকে আমাদের উপলব্ধির জায়গাটিকে আরো শক্ত করে তুলতে হবে। আমরা পুরুষতন্ত্রের আসল রূপের বিশ্লেষণ না করে সকলক্ষেত্রে নারীর আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারি না। তাই এইসব আন্দোলন আমাদের সকল শ্রেণীর, শুধু নারী টিকে থাকবার জন্যেই এই সংগ্রামে লিপ্ত হবে সেরকম নয়। তাকে সাথে নিতে হবে সেইসব সহযাত্রীদের যারা শাসক শ্রেণী দ্বারা নিষ্পেষিত। সেখানে নারীকে আলাদা করে ভাবার কোনো অবকাশ নেই। আমরা সেই সমাজের স্বপ্ন দেখি যে সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীরা। যারা পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিপতিদের বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে এনে দিয়েছিলেন নতুন আলোর ভোর। আমরাও সেই ভোর দেখার অপেক্ষায়, যেখানে সকল শোষিত নারী-পুরুষের হাত এক হয়ে কাজ করে চলবে।

তথ্যসূত্র: পুরুষতন্ত্র ও নারীর সংস্কার-যতীন সরকার, নারী-হুমায়ুন আজাদ, নারী জাগরণ এবং নজরুল-রহমান ম. মাহবুব

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.