আমার না বলা গল্প-৬

যৌন মর্ষকাম, বাংলাদেশ ও ভারতসুরঞ্জনা চৌধুরী: ‘আগুনমুখার মেয়ে’ উপন্যাসে লেখক নূরজাহান বোস নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা অকপটে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ১০ বছর বয়সে নিজের আত্মীয়র হাতে তিনি কিভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। সত্যি বলতে কী, এটা লেখকের জন্য অসীম সাহসের বিষয়! নারী লেখকদের মধ্যে কমই আছেন, যারা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা অকপটে বলেছেন। তসলিমা নাসরিন আলাদা। তিনি সব কালকে ছাড়িয়ে গেছেন তার লেখনী দিয়ে।

আজ যখন সবাই একটু একটু করে মুখ খুলতে শুরু করেছে, তখন ফিরে তাকাই নিজের জীবনের দিকে। কী ছিল সেখানে? ছোটবেলায় মায়ের চাকরির কারণে আমাকে প্রায় একা একাই বড় হতে হয়েছে। বড় ভাই বাসায় থাকলেও সে কমই থাকতো। বরং তার বন্ধুরা তাদের বান্ধবীদের নিয়ে বাসাটাকে ডেটিং স্পট বানিয়ে তুলেছিল। সেই ছোট্ট আমি তখন ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়াতাম এ বাড়ি ও বাড়ি। মাঝে মাঝে বন্ধুরা মিলে চুপি চুপি এসে দেখার চেষ্টা করতাম বাসায় দরজা বন্ধ করে আসলে কী ঘটছে। টিনের ঘরের ছিদ্র দিয়ে যা দেখতাম, তাতে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যেত আর বন্ধুদের সামনে আমার মাথা হেঁট হয়ে যেত লজ্জায়-অপমানে। ওরা আস্তে আস্তে পা ফেলে বাসা ছেড়ে দৌড়াতো। আমি দাঁড়িয়েই থাকতাম চলচ্ছক্তিহীন হয়ে।

প্রায়ই মা আমাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠাতো দাদীমার কাছে। কিন্তু আমি যেতে চাইতাম না। সেখানে ছিল দাদীমার নিকটাত্মীয় একজন, সম্পর্কে আমার চাচা। ডিগ্রি পড়তো। বাড়িতে আমাদের শরিকে আরেকটি পরিবার ছিল, যেখানে দুটি ছেলেমেয়ে আমার ছোট হলেও খেলার সাথী। ওদেরকে নিয়ে সেই চাচা এক সন্ধ্যায় এক খেলা পাতলো। গল্প বলার খেলা। আমিও উৎসাহী হয়ে গেলাম।

সে গল্প বলছে, আর আমরা সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে তার সাথে বিছানায় শুয়ে-বসে শুনছি। সে একবার অপর যে মেয়েটি ছিল তাকে পায়ের ওপর দোল খাওয়ালো। এরপর আমাকে সে এক ঝটকায় দুপায়ের মাঝখানে নিয়ে চেপে ধরলো। সাথে সাথে কী একটা শক্তমতো ঠেকলো আমার নিচের অঙ্গে। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই সে বার বার ওপর-নিচ করতে লাগলো। যতোই আমি নামতে চাই, সে ততজোরে কবিতা বলে আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। ওই বাচ্চাগুলোও তার দেখাদেখি হাসছে। আমি তখনও বুঝতে পারছি না, আমার কী করা উচিত! কিছুক্ষণ পর যখন আমার প্যান্ট ভিজে গেল, আমাকে সে নামিয়ে দিল আর ফিসফিস করে বললো, যাও, কলপাড়ে গিয়ে ধুয়ে ফেল গিয়ে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলো যে, পা পিছলে পড়ে গেছিলে!

আমি তার কথামতো কলপাড়ে গিয়ে ধুতে গিয়ে দেখি আঠালো জাতীয় কিছু একটাতে ভিজে আছে আমার প্যান্ট। বিকট গন্ধ। গা গুলিয়ে আসলো আমার। আমি তখন কত আর, বয়স সাত। ক্লাশ থ্রিতে পড়ি। কিন্তু কেন জানি কাউকে কিছু বলতে পারলাম না। দাদীমা দেখলো আমি প্যান্ট বদলেছি। জিজ্ঞাসা করলো, ‘কী দিদা, হিসু করে দিছো’? সেই রাতে প্রচণ্ড জেঁকে জ্বর আসে আমার। পরদিন মা খবর পেয়ে নিয়ে যায় আমাকে। দাদীমা বললো, সন্ধ্যারাতে ভিজতে গেলে তো জ্বর আসবেই। আমিও ভাবলাম, হয়তো তাই।

এরপর থেকে বাড়ির কথা মনে হতেই আমি আতংকে প্রমাদ গুনতাম। তারপরও একাকি মায়ের চাকরির কারণে আমাকে প্রায়ই যেতেই হতো বাড়িতে। আর যতোই দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করতাম না কেন, কিভাবে যেন নিত্যনতুন ফন্দিফিকির এটেঁ ওই চাচা ঠিকই কিছু একটা ঘটাতো আমার সাথে। আমাকে ডেকে বুকের মধ্যে হাত দিয়ে বলতো, যখন বড় হবে, তখন এগুলোও বড় হবে, তখন টিপে দিলে তুমি আরাম পাবে।

আমি ততদিনে কিছু কিছু বুঝতে শিখে গেছি এগুলো অন্যায়, এগুলো পাপ। আমার সাথে যা হচ্ছে তা অন্যদের সাথে হয় না। আমি খারাপ মেয়ে বলেই হয়তো এরকমটি হচ্ছে।

আল্লাহর কাছে বলতাম, আমাকে ভাল মেয়ে করে দাও, যা চাও আমি তাই করবো, কিন্তু এরকম যেন আর না ঘটে আমার সাথে। আল্লাহর একচোখ কানা ছিল কিনা জানি না। আমার কথা তার কানে যেতো না। অভিনব উপায়ে সব ঘটতো। আমি চুপ হয়ে যাই, আমার চঞ্চলতা উবে যায়। মনে মনে আমি একটা খারাপ মেয়ে সাজি।

এরপরে আসে আমার নিজেরই মামাতো ভাই। ছোটবেলায় মামার বাড়ি যাওয়া ছিল সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা। সেই আনন্দই একদিন পানসে হয়ে গেল। তিন-তিনটা মামাতো বোন আর আমি খেলছিলাম লুকোচুরি। মামাতো ভাইটা আমাকে একপর্যায়ে ঘরে আটকে বললো, এখানে লুকাও। আমিও লুকালাম। সে জানালা বন্ধ করে দিল। ভাবলাম, এটাও খেলারই অংশ। সে তখন তার পাশে আমাকে শুইয়ে জোর করে চেপে ধরে নিজেকে। প্যান্ট খুলতে হয় না, তার আগেও সে ভিজিয়ে দেয় আমাকে। আবারও সেই চেনা বিকট গন্ধ। রাতের বেলা এতোগুলো মানুষের ঘরে তার পাশেই আমাকে শুইয়ে দিয়ে বড়বোনও শোয় সেখানে। সেই রাতেও মামাতো ভাইয়ের হাত ঠিকই চলে আসে আমার প্যান্টের ভিতরে। আমি কাউকে কিছু বলতে পারি না। আবারও আল্লাহকে ডাকি। বড়দের নামাজ পড়তে দেখে নিজেও জায়নামাজের কাছে গিয়ে বসে মনে মনে আল্লাহকে বলি, ‘আল্লাহ, আমাকে ভাল মেয়ে করে দাও, খারাপ মেয়ে করো না, আমি খারাপ মেয়ে হতে চাই না’।

আল্লাহ আমাকে নিরাশ করেন। বড় হতে হতে আমি কেবলই খারাপ মেয়ে হতে থাকি নানাভাবে, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.