হিজাব বিরোধিতাই কি প্রগতিশীলতার মাপকাঠি?

Hijabi Nari 2উম্মে রায়হানা: নারীর জন্য পর্দাপ্রথা আজকে নতুন নয়। প্রাচীন সুমেরিয়ান, অ্যাসিরিয়ান, ব্যাবিলনিয়ান ও পারসিয়ান সমাজে নারীর মাথায় কাপড় দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।

ইতিহাস বলে, অ্যাসিরিয় পুরুষরা ছিল যোদ্ধা, শত্রু ও নারীর প্রতি রুদ্রমূর্তিই ছিল তাদের স্বাভাবিক চেহারা। প্রচুর যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সেই সমস্ত সমাজে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। দাসেরা কায়িক শ্রমে বাধ্য হতেন, দাসীরা ব্যবহৃত হতেন রক্ষিতা ও গৃহশ্রমিক হিসেবে।

পরিবারের নারী, অর্থাৎ, পুরুষের মা, স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে রক্ষিতা ও দাসীদের পার্থক্য করতেই সম্মানের প্রতীক হিসেবে মাথায় কাপড় দেওয়ার প্রচলন হয়। রক্ষিতা, দাসী ও বেশ্যাদের জন্য মাথায় কাপড় দেওয়া ছিল নিষিদ্ধ।

এই সমস্ত প্রাচীন সমাজ সংস্কৃতির তুলনায় ইসলাম নিতান্তই নতুন একটি ধর্ম বা জীবনদর্শন। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে নারীদের মাথায় হিজাব পরা ইসলামের নিয়ম বা মুসলিমদের ড্রেস কোড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। নারীর উপর আরোপিত এই ড্রেস কোড নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাই ইসলামের প্রসঙ্গটি এসেই যায়।

গত এক মাসে উইমেন চ্যাপ্টারে পর পর দুইটি লেখা প্রকাশিত হয় হিজাব নিয়ে। দুটি লেখাকেই আপাতদৃষ্টিতে হিজাবের বিরোধিতামূলক এবং প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণাপ্রসূত বলে মনে হয়। কিন্তু সাবধানে দ্বিতীয়বার পাঠ করলে যে কেউই দেখতে পাবেন, লেখাগুলোর মূল লক্ষ্য হিজাব বা পর্দা আরোপ করার পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়, বরং যে সমস্ত নারীরা হিজাব পরিধান করেন, সেই সমস্ত নারীরাই লেখকদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য

বিদ্বেষমূলক ও শ্লেষাত্মক এই লেখাগুলো নিয়ে ফেসবুকে প্রশ্ন তুললে অগ্রজ সুপ্রীতি ধর ও আমার শিক্ষক কাবেরী গায়েন আমার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে একটি লেখা তৈরি করতে বলেন। সেই ফেসবুক আলোচনার প্রেক্ষিতেই আজকের এই লেখা।

প্রথমেই স্পষ্টভাবে বলে রাখা ভালো, আমার অবস্থান নারীকে পর্দায় আবদ্ধ করার পক্ষে নয়।

মুসলিম পরিবারে জন্মালেও আমার ব্যক্তিগত জীবনাচরণে নানা উৎসবে অংশ নেওয়া ছাড়া ধর্মের কোন স্থান নেই। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে আমি উদাসীন এবং কোন ধর্মের নিয়মনীতিই আমি মানি না। ফলে হিজাব বিরোধী লেখার সমালোচনা করায় আমার মুসলিম জন্মপরিচয়কে চিহ্নিত করলে তা ভুল হবে।

নিজে ধর্ম না মানলেও অন্যের ধর্ম মানার অধিকারের পক্ষে কথা বলাকেই আমার কাছে মানবিক মনে হয়।

যে লেখাগুলোর কথা বললাম, প্রতিটিতেই বর্তমান সময়ে ফ্যাশনেবল যে সমস্ত হিজাবী দেখা যাচ্ছে তাদের প্রতি বিষোদগার রয়েছে। বলা হচ্ছে, হালের হিজাবের সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক রয়েছে ফ্যাশনের।

অর্থাৎ, ধর্মের নিয়ম মেনে হিজাব করলে লেখকদ্বয়ের কোন আপত্তি নেই। সেই জায়গায়, আমি ধরে নিতে পারি, তাঁরাও আমার মতই অন্যের ধর্মকর্ম করার অধিকারের পক্ষে।

কিন্তু, ধর্মের নামে ফ্যাশন করাতেই তাঁদের একে সমস্যাজনক বলে মনে হচ্ছে।

এইখানে এসেই খটকার শুরু হয়। ধর্মের মধ্যে থেকে চরম পুরুষাধিপত্যবাদী এই নিয়ম মেনে চললে যিনি আপত্তি করবেন না, ফ্যাশন হিসেবে করলেই তিনি কেন আপত্তি করবেন?

দুটি লেখাতেই ইসলামে কোন কারণে, কেমন করে হিজাব করতে বলা হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত বয়ান আছে। পড়ে মনে হওয়া স্বাভাবিক, সহি ইসলাম (বলে যদি পরম, এক ও অদ্বিতীয় কিছু থেকে থাকে) সেটা ঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না বলেই তাঁদের গাত্রদাহ হচ্ছে।

লেখকদের কয়েকটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই-

প্রথমত, ইসলাম পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম। পরম, এক ও অদ্বিতীয় সহি ইসলাম বলে কিছু নেই। ইসলামের পক্ষে অথবা বিপক্ষে কথা বলতে চাইলে সেটা সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলাই ভালো, সেখানে এককভাবে নারীপ্রশ্ন না জড়ানোই উত্তম। প্রতিপক্ষের নারীকে সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া ও আক্রমণ করা পুরানো শিশ্নবাদী আচরণ। নারীপ্রশ্নে সংবেদনশীল কোন মানুষ এই আচরণ করলে তাঁর/তাঁদের সংবেদনশীলতাকেই সন্দেহ হয়।

দ্বিতীয়ত, বেশ্যা-সতী, বিবাহিত-কুমারী, চাকুরীজীবী-গৃহিণী, সন্তানবতী-বন্ধ্যা ইত্যাদি নানাবিধ বিভাজনে নারীকে বিভাজিত করা একটি পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র। বিকিনি-হিজাব বিভাজনও এর বাইরে নয়। এই বিভাজনে পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের ডিভাইড অ্যান্ড রুল কৌশলের মধ্যে পড়ে যাওয়া। নারীর জন্য ক্রমাগত আদর্শ তৈরি করার কূট কৌশলে যোগ দেওয়া মানে মুক্তির পথে এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া।

তৃতীয়ত, বোরখা বা হিজাব আমাদের (আমি, আপনি বা ঐ লেখকদ্বয়) জন্য আরোপিত, আধিপত্যমূলক ও অসভ্য নিয়ম মনে হলেও, যে মেয়েটি গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে মফস্বলের কলেজে পড়তে যায়, মফঃস্বলের কলেজ পাশ করে রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা খটখটায়, তাঁর জন্য বোরখা একটি দারুণ অস্ত্র।

না, আমি ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের কথা বলছি না। পোশাক যৌন নিপীড়নের কারণ নয়। নিপীড়ন বন্ধ করতে নয়, পরিবার ও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে লড়াই করতেই এই অস্ত্র তাঁর প্রয়োজন পড়ে। তাকে প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করতে হয় যে সে ভুল কিছু করছে না, সে পরিবারের সম্মান বজায় রাখছে।

আমরা বাবা-মায়ের আদুরে মেয়েরা কি অন্য রকমভাবে এই প্রমাণ করার পরীক্ষার মুখোমুখি হই না? তাহলে আরেক নারীর লড়াই করার অস্ত্রকে কেন খারিজ করবো?

খারিজ যদি করতেই হয়, প্রশ্ন যদি করতেই হয়, করতে হবে সেই কাঠামোকে, ব্যক্তিকে তো নয়!

চতুর্থত, হিজাবকে ফ্যাশন হিসেবে সামনে আনার ক্ষেত্রে নানা মুসলিম নারীবাদীদের অবদান আছে। তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর নানা অংশে পর্দার মধ্যে থেকে নারীরা লড়াই করে যাচ্ছেন সমান অধিকারের জন্য। নারীবাদ কোন সরল, একরৈখিক বিষয় নয়। ইতিহাস বলে, শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত, শহুরে নারীদের লড়াই, প্রায়শই কৃষ্ণাঙ্গ,মুসলিম নারীদের সমস্যা ও সংকটকে চিহ্নিত করতে, আমলে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রয়োজন পড়েছে অন্য অন্য নারীবাদী স্কুলের। হিজাবি ফ্যাশনকে বিরোধিতা করতে গিয়ে মুসলিম নারীবাদকেই খারিজ করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় পড়ে যাওয়া নিতান্ত অনুচিত বলেই আমি মনে করি।

শেষতক এই বলি, হিজাবি ফ্যাশনের আরেকটি নারী-বান্ধব অর্থ কি আমরা দাঁড় করাতে পারি না? যখনই ধর্ষণের কারণ হিসাবে নারীর পোশাককে দোষারোপ করা হবে তখনই কি আমরা সমস্ত নারীসুলভ সৌন্দর্য বজায় রেখে হিজাব পরে সমাজকে উল্টো প্রশ্ন করতে পারি না- এই দেখ, হিজাব পরেও আমার সৌন্দর্য এতটুকু কমে যায়নি? পোশাক সমস্যা নয়, সমস্যা তোমাদের শিশ্নসর্বস্ব মনন?

এখানে আলোচিত দুটি লেখার লিংক দিয়ে দেয়া হলো পাঠকের সুবিধার জন্য-

হিজাব, নেকাব…..এবং https://womenchapter.com/views/11536

হিজাবিদের সেক্স আপিল কি কেবলই চুলে? https://womenchapter.com/views/11422

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.