যৌন সন্ত্রাস ও আমাদের রক্তে লুকিয়ে থাকা হিপোক্রেসি

Sumu
সুমু হক

সুমু হক: সম্প্রতি এই টরন্টো শহরের দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের বাবা-মায়েরা খুব জোরদার আন্দোলন চালালেন। তাঁদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো বর্তমান প্রাদেশিক সরকার স্কুলগুলোতে যে যৌনতা বিষয়ক কারিকুলাম চালু করছে, তার বিরোধিতা করা। এ আন্দোলনে কিছু ক্যাথলিক এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের অভিভাবকেরা যুক্ত থাকলেও, এর বড় অংশ জুড়েই ছিলেন ভারতীয় এবং বিশেষ করে বাংলাদেশী ও পাকিস্তানী অভিবাসী বাবা-মায়েরা।

দিনের পর দিন তারা সন্তানদের স্কুলে যেতে দেননি, পিকেটিং করেছেন, যাতে তাদের সন্তানেরা এই সেক্স এডুকেশনের কবল থেকে রক্ষা পায়!

এই কারিকুলামের অংশ হিসেবে ক্লাস ওয়ানের ছেলেমেয়েরা নিজেদের দেহের অংশগুলোর সঠিক নাম শিখবে, ক্লাস টুএর বাচ্চারা শিখবে কন্সেন্ট বা সম্মতির বিষয়ে, অর্থাৎ যেকোন পরিস্থিতিতে, যে কোন পরিবেশে যৌন সম্পর্কে কেউ তাদেরকে বাধ্য করতে চাইলে, না বলবার অধিকার তাদের আছে, আর ক্লাস থ্রির বাচ্চারা শিখবে জেন্ডার আইডেনটিটির বিভিন্ন দিকগুলো নিয়ে।

তো এই কারিকুলাম দেখে দক্ষিণ এশীয় অভিভাবককূলের বিশ্বাস জন্মালো, পৃথিবী এবার রসাতলে গেলো বলে, কেয়ামতের আর বিশেষ দেরী নেই! টিভিতে দেখলাম তাঁরা সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, তাঁদের সংস্কার আর মূল্যবোধের পরিপন্থী এই শিক্ষাব্যাবস্থার। একজন তো বলেই ফেললেন, তাঁদের আশংকা যে তাঁদের ছেলেরা স্কুল থেকে এইসব শিখে এসে, বাড়িতে বোনের ওপর এক্সপেরিমেন্ট চালাবে, তাই তিনি আতঙ্কিত।

(একটু আগে আমার একজন বন্ধুর সাথে কথা বললাম, যে পুরষ এবং বাংলাদেশী, তার বক্তব্য, “যে বলেছে, সে যখন এইদেশে বসে এরকম মন্তব্য করতে পারে, ভবিষ্যতে তার ছেলের পক্ষে এমন কাণ্ড ঘটানো কিছু নয়, ও হয়তো সেদিক থেকে মিথ্যে কিছু বলেনি।“)

বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বলছে, যে প্রতি চারজনের একজন উত্তর আমেরিকান (যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডা) নারী তাদের জীবনের কোন না কোন একটা সময়ে যৌন সন্ত্রাসের শিকার হবেন। এই উপাত্ত আরো বলছে যে যৌন আক্রমণের স্বীকার ৬০% এর বয়স ১৭ এর নিচে। ১৬ বছরের কম বয়েসী ১৭% মেয়েরা কোন না কোন সময় ইন্সেস্ট অর্থাৎ নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে যৌন আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে। ৮০% ভাগ ক্ষেত্রে আক্রমণকারী পরিবারেরই কেউ অথবা পূর্বপরিচিত। ভুলে যাবেন না, এই তালিকায় কিন্তু আমাদের মত দক্ষিন এশীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসী মেয়েরাও আছে।

আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে এই সমস্ত অত্যাচার ঢেকে রাখলেই সকলের মুখ রক্ষা এবং আমাদের ধর্ম ও মূল্যবোধ রক্ষিত হয় বলে এই খবরগুলো বাইরে আসতে পারেনা। নাহলে একবার ভাবুন তো, বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে এইরকম একটি সার্বজনীন গবেষণা চালানো হলে, তার থেকে পাওয়া তথ্য কত বেশি ভয়াবহ হতো! এই ঢেকে রাখাটাই সব, তাতেই সব কূল রক্ষা হয়। সেদিক থেকে ভাবলে আমরা শরৎচন্দ্রের কাল থেকে খুব বেশি তো আগাইনি, বরং পিছিয়ে গেছি কয়েক শতাব্দী।

গত দু”দিন ধরে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের ধর্ষণের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে খুব তোলপাড় হচ্ছে, এমনকি বাবা-মায়েরাও খুব সোচার হচ্ছেন। দেখে আমার একরকম অদ্ভূত অনুভূতি হচ্ছে। একই সাথে প্রবল হাসিও পাচ্ছে, এবং বিবমিষাও হচ্ছে। বিবমিষা হচ্ছে বাঙ্গালিকূলের হিপোক্রেসি দেখে।

বাংলাদেশে (কিংবা দক্ষিণ এশীয় যে কোন দেশে) বেড়ে ওঠা যে কোন মেয়েই জানে, পুরুষ, বিশেষ করে মধ্যবয়সী আত্মীয়কূলের লালসার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়ে বেড়ে ওঠার ভয়ংকর বাস্তবতা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার কাছ থেকে একটা মন্ত্র কানে নিয়েই বেড়ে উঠেছি। আমি এবং আমার বাড়ন্ত শরীর পৃথিবীর তাবৎ পাপের আশ্রয়স্থল, উস্কানিদাতা।

কখনো কোন অভিভাবক কিংবা বাবা-মাই একবারও ভেবে দেখেননি, ক্রমাগত এই মেয়েগুলোর ওপর অপরাধবোধ এবং হীনমন্যতার বোঝা না চাপিয়ে দিয়ে, শুধু যদি তাদেরকে একটু আত্মবিশবাস, যৌনতা বিষয়ক মৌলিক ধারণা এবং আত্মরক্ষার কৌশল শিখিয়ে বড় করা তোলা যেতো, অনেক দুর্ঘটনাই তাহলে এড়ানো সম্ভব ছিলো। একথাটা লিখেই মনে হ’লো, সেই জ্ঞান দেবেন-ই বা কারা, যে অভিভাবক এবং শিক্ষক সম্প্রদায় নিজেরাই এ বিষয়ে অজ্ঞ, তাঁরা নিশ্চয়ই নয়!

খুব ছোটবেলায়, আমার তখন এগারো কি বারো বছর বয়স, আমি আমার এক ভগ্নীপতির (আহ, কি মধুর সম্পর্ক, সাহিত্যে এবং চটি সাহিত্যে যার মাধুর্যের জয়-জয়কার!) অসুস্থ কামনার শিকার হয়েছিলাম। এখন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, এ ঘটনা খুব সম্ভব চলেছিলো বহু বছর ধরে, আমার জ্ঞান হবার বহু আগে থেকেই। এই ঘটনা জেনে আমার শিক্ষিতা এবং আধু্নিকা (!) মা ক্রমাগত আমাকে এবং আমার অশালীন পোশাক (সালোয়ার কামিজ এবং লং স্কারট-টপ)এবং অশালীন আচরণকে দায়ী করে গেলেন, এবং উচ্চ-শিক্ষিত এবং নিজের যৌবনে হিপ্সটার ইমেজ বজায় রাখা, এককালে জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিশনে কাজ করা আমার মামা (যার জামাতা এই কাহিনীর নায়ক) কিছুই বললেন না, এবং করলেন না।

অনেক বছর পর্যন্ত তিনি আমাকে সেই একই ভগ্নিপতির সাথে একই টেবিলে বসে খেতে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করেছেন। এতে নাকি আমার বোনটির সংসারটা বেঁচে যাবে। সেই একই যুক্তিতে আমার মামা এবং মা কেবল আমার বোনটির বিয়েতে যৌতুক দিয়েই ক্ষান্ত হননি, আজীবন তার সংসার খরচ যুগিয়ে এসেছেন, খুব সম্ভব আজো যোগাচ্ছেন।

আর আমার বোনটি? শ্বশুর বাড়ি এবং স্বামীর বিভিন্ন অত্যাচারে সে প্রায় মানসিক ভারসাম্য হরিয়েও জীবন্মৃত হয়ে দিন কাটাচ্ছে তার পতিদেবতার সাথে।

আমি বড় হয়েছি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রিভিলেজড পরিবারগুলোর একটিতে। বাবা-মা উচ্চ-শিক্কিত এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। সেই আমাকেই যদি এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হয়ে উঠতে হয়, তো বাংলাদেশের ৯৯% ভাগ মেয়ের নিরাপত্তা কোথায়!

সেটা ছিলো এক অন্য সময়ের গল্প। সময়ের সাথে প্রযুক্তির প্রসার ঘটেছে। আততায়ীরাও এখন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে অনেক আধুনিক কৌশল আবিষ্কার করেছে যৌন নির্যাতনের। গত দু’দশক ধরে বিভিন্ন সব অত্যাধুনিক মাধ্যম আবিষ্কৃত হয়েছে যৌন নির্যাতনের! যে সমাজে পুরুষেরা জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক যৌনতা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করে পর্ণ কিংবা পতিতালয় থেকে, তাদের কাছ থেকে আমরা সুস্থ কোন পরিণতি কি আশা করতে পারি আদৌ! বরং আমাদের সমাজে এটাই স্বাভাবিক। মেয়েদেরকে আমরা দেই হীনমন্যতার পাঠ, আর পুরুষদেরকে শেখাই অসুস্থ যৌনবিকারের তৃপ্তির শর্টকাট মেথড।

গত কয়েক দিন ধরে ফেসবুক উত্তাল হয়ে আছে সুপ্রীতি ধর এবং তাঁর কন্যার ওপর সাইবার সন্ত্রাস নিয়ে, পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের খই ফুটছে। এমনকি একেকজন সেলিব্রিটি যাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন মার্কি দ্য সাদকেও লজ্জায় ফেলবে, আজ প্রচণ্ড সোচ্চার হয়েছেন সাইবারভিত্তিক যৌন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। আমার খুব ঘেন্না হচ্ছে নিজের ওপর। এরকম ঘটনা তো আজই প্রথম নয়। বহু বছর ধরে দেখতে দেখতে একরকম ঘাটা পড়ে গেছে, অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের। ইনবক্সে চ-বর্গীয় গালিগালাজ, আচমকা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে সে রিকুয়েস্ট গ্রহণ করলেই তাকে যৌন সম্পর্কের সম্মতি ধরে নিয়ে আগ্রাসী হয়ে ওঠা, এসব কিছু নতুন ঘটনা নয়। অথচ সাইবার জগতটা যে সমাজের বাইরে নয়, এর মানুষগুলোও সমাজেরই প্রতিফলন, এই জেনে, একেই স্বাভাবিক ভেবে নিয়ে এত যুগ চুপ থেকেছি আমি, আমরা।

যখন আমার মেধাবী সুন্দরী বোনটির ফেসবুক একাউন্ট হ্যাকড হয়ে ফটোশপ করা আপত্তিকর ছবি প্রকাশিত হয়েছিলো, আমি চুপ থেকেছি। আমার বোনটি তার মূল্য দিয়েছে মেধাবী ডাক্তার হয়েও সে জীবন ভুলে গিয়ে হঠাত করে এক প্রবাসী পাত্রের সাথে গাটছড়া বেঁধে সমস্ত পৃথিবীর সামনে নিজের সতীত্ব প্রমাণ করতে নিজের ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিয়ে। যখন আমার বন্ধুকে কেউ আপত্তিকর বার্তা পাঠিয়ে উত্যক্ত করেছে, আমি বলেছি পাত্তা না দিতে।

যখন আমায় কেউ ফেসবুকে অনাকাংখিত যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব পাঠিয়েছে, আমি তাকে ব্লক করে দিয়ে বাঁচলাম বলে নিঃশ্বাস ছেড়ে চুপ-চাপ থেকেছি, একটিবারও ভাবিনি, এই মানুষগুলোর মুখোশ উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন। যখন আমার কাছের মানুষগুলো বৈবাহিক জীবনে স্বামীর হাতে ধর্ষিত হবার মর্মান্তিক বর্ণনা দিয়েছে, আমি কানে আঙ্গুল দিয়ে থেকেছি। যখন মাঝ রাতে আমার চাচাকে কাজের মেয়ের বিছানা থেকে উঠে যেতে দেখেছে, আমার সমস্ত পরিবার চুপ থেকেছে। নিজের অসম্ভব সুন্দরী-বিদূষী মেয়ের প্রতি তাঁর স্বামীর বছরের পর বছর ধরে চলা অমানবিক অত্যাচার দেখেও আমার আত্মীয়া সব ভুলে থেকেছেন অর্থ, বাড়ি-গাড়ি এবং দামী শাড়ি-গয়নার আচ্ছাদনে, আমি কিচ্ছু করিনি, নির্বাক থেকেছি।

আজ তাই দিদির প্রতি এই সাইবার সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করি কোন মুখে! সময় পাল্টাবে, নির্যাতনের ধরণ পাল্টাবে, পাল্টাবো না শুধু আমরা। পাল্টাবে না আমাদের পচে যাওয়া সমাজ। নিজেদের লালসার বিকৃত ছাপ ঢাকতে আমরা কেবল দিনের পর দিন আমাদের মেয়েদের ওপর বোরখা আর হিজাবের বোঝা চাপাবো, তাদের নত মাথা আরো নত করবো। তাদের সবরকম আত্মবিশ্বাস হত্যা করবো ঠিক সেইরকম জোশে, যেভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে চোখ মেলার আগেই এই কন্যা সন্তানদের হত্যা করে এসেছি আমরা, আজো তাই করে যাচ্ছি পৃথিবী জুড়ে!

সভ্যতা সামনে এগোবে, আর আমরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকবো, যতক্ষণ পর্যন্ত না পৌঁছে যাই গুহামানবের যুগে। ও, না, সে সময়েও বোধহয় নারীরা আজকের চেয়ে বেশি মর্যাদা পেতো। বাণিজ্য কিংবা সম্পদের ধারণা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় বোধ করি তখনও নারীরা সম্পত্তি কিংবা পণ্য বলে বিবেচ্য হ’তো না।

তার চেয়ে আমার বন্ধুটির একটু আগে বলা শ্লেষটুকু দিয়েই শেষ করি, “এর চেয়ে বরং আমরা পুরো সমাজটাকেই বোরখার নিচে চাপিয়ে রাখি!” হ্যাঁ, সেই ভালো।

শেয়ার করুন:
  • 34
  •  
  •  
  •  
  •  
    34
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.