প্রধানমন্ত্রী সমীপে ২: আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছি

PM 1গোধূলি খানঃ আমাদের চোখ খোলা, কিন্তু তা বন্ধেরই সমতুল্য। আমাদের মুখ খোলা কিন্তু সত্য বলার অধিকার নাই। আমরা কানে শুনি, কিন্তু বধিরতার সমতুল্য। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী এই আমাদের আমজনতার বর্তমান অবস্থা। আমরা অত্যাচারিত, কিন্তু উফ পর্যন্ত করতে পারছি না। আমাদের  নারীদের অবস্থা আরো মানবেতর, মহা-আতঙ্কে আছি।

মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী, আপনার তীক্ষ্ণ বিবেচনা আশা করছি এ ঘটনায় যে, পুলিশের হাতে নির্যাতিত মেয়েটির কিছু ছবি দিয়ে একজন জ্যেষ্ঠ নারী সাংবাদিক সুপ্রীতি ধর, যিনি কৃতি সাংবাদিক ও নারী অধিকারের পক্ষে ঋজু কন্ঠস্বর, আপোষ করেননি আদর্শবিহীন কোন নিয়মনীতির কাছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পিতা হারিয়েছেন সুপ্রীতি। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ওই ঘটনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সাথে আপনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকনের ফেসবুক ওয়ালে মেয়েটির ফুলের টব ছুঁড়ে মারা ও তাকে পুলিশের পেটানোর ছবি দিয়ে, দক্ষ দেখে পক্ষ নিন স্ট্যাটাস দেন। এবং তার  ‘দক্ষ দেখে পক্ষ নিন’ বিষয়ক পোস্টে পুলিশী নারী নিগ্রহ পোস্টটিকে নিয়ে সমালোচনা করেন এবং সেখানে কিছু তর্কও হয় দুজনের মধ্যে।

এরপরই সুপ্রীতি এ নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলে তার ওয়ালে শুরু হয় একটি গ্রুপের নোংরা ভাষায় আক্রমণ, গালি দিয়েই ক্ষান্ত ছিল না তারা, সাইবার যৌন সন্ত্রাস শুরু করে। তার ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে এর প্রতিবাদ করলে তাকেও রেহাই দেয়া হয় না। আর এই গ্রুপটিকে সবাই একনামেই চেনে, যার নাম সিপি গ্যাং।

মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী, এখানে লক্ষ্যনীয় যে, ঐ গ্রুপটির আর্থিক সহায়তাও দেয়া হয় আপনার দপ্তর থেকে। গ্রপটি দাবি করে তারা আওয়ামি লীগের কট্টর সমর্থক। এদের হাতেই নাকি আওয়ামি লীগের ইমেজ। এরা অনলাইন-অফলাইন আওয়ামী লীগের ইমেজ রক্ষায় নিয়োজিত। খুবই হতাশাব্যঞ্জক যে এদের উপরে ন্যস্ত আওয়ামী লীগের মত সুপ্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দলের ইমেজ।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, চিন্তার বিষয় এ ঘটনার উৎপত্তি স্থল আপনার দপ্তরের প্রেস বিভাগ হওয়াতে। আপনার সরকার ও দলের প্রতি আম-সমর্থকের অনাস্থা একটু একটু করে দেখা দিবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনাব আশরাফুল আলম খোকনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞ্যেস করলে তিনি বলেন, ‘সিপি গ্যাংকে জানি। সুপ্রীতি ধর ও তার মেয়ের সাথে যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি। তবে আমার ফেসবুকওয়ালে এসে দিদি যা-তা বলেন ( আমাকে জামাত, মুশতাক, নব্য আওয়ামী লীগার ও আমার পুরো পরিবার বিএনপি করে বলা)। আমি তার প্রতি উত্তর দিয়েছি। তাকে কেউ আমার ওয়ালে গালি দেয়নি, দিয়েছে তার ওয়ালে। আমার ও সুপ্রীতি ধরের এই বিষয়টাকে নিয়ে নিয়ে মাস্কাওয়াথ আহসান নামের একজন আমার পিছনে লেগেছে।  মাস্কাওয়াথের সাথে আমার পলিটিক্যাল ও আইডিওলজিক্যাল পার্থক্য আছে’।  আহসানকে যারা তার পিছনে লাগিয়েছে, তাঁদের উনি জানেন বলে তিনি আরো উল্লেখ করেন।

Godhuly
গোধূলী খান

এ বিষয়ে একাডেমিক সাফল্যে পুরস্কার পাওয়া, বিতর্কে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন, কমনওয়েলথ ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ড পাওয়া ইন্টারন্যাশনাল ব্রডকাস্টার ও মিডিয়া প্রফেশনাল মাস্কাওয়াথ আহসানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘উইমেন চ্যাপ্টার প্রধান সুপ্রীতি ধর, মি খোকনের ‘দক্ষ দেখে পক্ষ নিন’ বিষয়ক পোস্টে পুলিশী নারী নিগ্রহ পোস্টটিকে নিয়ে সমালোচনা করাতেই তার পোস্টে মি. খোকনের লোকেরা সাইবার নিগ্রহ চালায়। এই সাইবার নারী নিগ্রহের প্রতিবাদ জানিয়েছি আমি। এর বাইরে পিছে লাগার মত এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন তিনি। তার অনুসারীদের সাইবার নিগ্রহটিই এখানে মূখ্য। চট করে ‘ অন্য দলের লোক বলা’ বা ‘আইডিওলজিক্যাল দ্বন্দ্বের’ কথা বলা এগুলো বহু ব্যবহারে জীর্ণ একটি টেকনিক; নিজের অপরাধকে হালকা করা এবং এই অপরাধ থেকে মনোযোগ সরিয়ে বিষয়টিকে ‘ব্যক্তিগত বা আদর্শিক দ্বন্দ্বের’ ক্লিশে কথা বলে লাভ নেই।

‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ নামের যে ফেইক আইডি থেকে সুপ্রীতি ধরকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠাতে বলা হয় সেই ফেইক আইডি-টি মি. খোকনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরের সঙ্গে যুক্ত। সুতরাং সাইবার নারী নিগ্রহকে ধামাচাপা দিয়ে এসব ষড়যন্ত্রসূত্র সামনে নিয়ে আসা ডিনাইয়াল। ‘অভি’ নামের যে ছেলেটি সুপ্রীতি ধর ও উনার মেয়ের প্রতি সাইবার যৌন সন্ত্রাস; একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে মি. খোকন তাকে কেক খাইয়ে দিচ্ছে।

খোকনের পক্ষ নিয়ে সুপ্রীতিদি আর তার মেয়েকে অশ্লীলতম কথা বলে যাওয়া এই ‘অভির’ অপরাধের দায় তার নেতা হিসেবে খোকন এড়াতে পারেন না। দিদির উপরে সাইবার হামলার প্রতিবাদ করায় ‘আমাকে’ জামাতের ট্যাগ লাগিয়ে বা ষড়যন্ত্রসূত্র খুঁজে লাভ নেই; এখানে আলোচ্য বিষয় ‘দিদির’ সাইবার হ্যারাসমেন্ট।

সুপ্রীতি ধর জানান, ‘এ নিয়ে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের বন্ধুদেরই সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে সাংবাদিক মহল এবং নারী আন্দোলনকারীরা, তারা মুখে কুলুপ এটেঁছে, কেউ কিছু বলছে না। হয়তো এই হামলাকারী গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকরা হোমরাচোমড়া হওয়ায় এটা হচ্ছে। এর আগেও অনলাইনে অনেক মেয়ে এরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে এই গ্রুপটির মাধ্যমেই। কোনো শাস্তি দূরে থাক, কিছুই হয়নি। বরং অনেক মেয়ের জীবন বিপন্ন হয়ে গেছে পর্যন্ত। কাজেই এই মুহূর্তে আমার ও আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে চিন্তিত’।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, নিজ ঘরে কম্পিউটারে বসেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি না, কিছু লিখলে বা মুখ খুললে যৌন সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়। পরিবারবর্গসহ হত্যার হুমকি দেয়া হয়। আমাদের পিছনে উন্মাদ কিছু সাইবার ক্রিমিনাল লাগিয়ে দেয়া হয়। নারীরা স্বভাবত যৌন সন্ত্রাসে ভয় পায়, ভয় পায় চরিত্র নিয়ে নোংরা কথা বলাকে। আর এটাকে অস্ত্র করে দেখার নোংরা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

রাজপথে নারীর উপর যৌন নিপীড়নকে কিছু যুবকের দুষ্টুমি বলে জায়েজ করেছেন খোদ আইজিপি। উনার পত্নী, কন্যা বা বোনের উপর এই হামলা হলেও কী উনি একই কথা বলবেন? বড্ড জানতে ইচ্ছে করে। নাকি ঊনারা বুলেট প্রুফ গাড়িতে যাওয়া-আসা করেন বলে এই ধরনের নির্যাতন বা নিপীড়ন ঊনাদের সইতে হয় না!

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আইজিপির কাছে আপনি, আমি-আমরা নারীরা কি নিরাপদ?

নববর্ষের নারী নিগ্রহের ঘটনার ২৮ দিন পেরিয়ে গেছে; তদন্তে কোন সাফল্য আসেনি। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন কালে আরেকজন নারী নিঃগৃহীত হয় পুলিশের হাতে। পুলিশ যখন পেটানোর নির্দেশ পায় উপর থেকে, তখন কি অবস্থা ধারণ করে, তা আপনিসহ সব বিদগ্ধ রাজনীতিকরাই জানেন। হরতাল বা অবরোধে পিকেটিং করেনি রাজনৈতিক কোন দলই অস্বীকার করবে না।

আওয়ামী লিগ, বিএনপি বা জামায়াতের করা হাজার হাজার পিকেটিং-এর ছবি আমি নিজেই তুলেছি, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের ফটো সাংবাদিকতার কার্যকালীন সময়ে। আমার তোলা পুলিশের টানা হিঁচড়ায় ব্লাউজ ছেঁড়া মতিয়া আপার রাস্তায় শুয়ে থাকা ছবিটি ফেসবুকসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয় বা হচ্ছে। কিন্তু ওইদিন মতিয়া আপাকে মহিলা পুলিশ টানাটানি করেছিল।

আমার প্রশ্ন, এইদিন মহিলা পুলিশ থাকা শর্তেও কেন পাঁচ/ছয়জন পুরুষ পুলিশ মেয়েটির ওপর আঘাত হানলো, কিম্বা মেয়েটিকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যেত, ইস্পাতের তৈরি জলকামানের গাড়িতে খালি ফুলের টব মারার যা শাস্তি তা কেন দিলো না? কিন্তু এমন পাকসেনা স্টাইলের হামলা! তা কি আপনি মেনে নেবেন?

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগে আজ আপনার থেকেও বড় আওয়ামী লিগারে ভরে গেছে, তারা জানেই না আওয়ামী লিগের রাজনীতির ইতিহাস। বিপ্লব ঘরে বসে কম্পিউটারে হয় না, বা তেলবাজি কথাতে (যদিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আজ সুযোগ্য লোকের থেকে তেলবাজরাই বেশি গ্রহণীয়)।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যদি এই দিকটা একটু নজর দেন বা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে  এই ঘটনা খতিয়ে দেখার অনুরোধ করছি, অনুগ্রহ করে দায়ী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান করুন। আমাদের দেশে স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নাই, সেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তির অন্যায় আর দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা মানে নিজের বিপদকে স্বাগত জানানো। কিন্তু নারীর হয়ে নারীর উপর অন্যায় সহ্য করার মত বা যে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ না করার মত শিক্ষা পরিবার দেয়নি। পারিবারিক সুশিক্ষায় একজন মানুষকে সঠিক মানুষ করে তোলে আর আর পরিবারের কুশিক্ষা শিক্ষিত মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, অঢেল অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতাও তাকে বদলাতে পারে না।

অচিরেই নারী নিগ্রহের ব্যাপারে আপনার সুদীর্ঘ নিরবতার অবসান ঘটবে ও আপনি কঠোর পদক্ষেপ নেবেন, এটাই প্রত্যাশা করছি। যাতে নববর্ষের নিঃগৃহীত নারীরা, পুলিশের হাতে নিঃগৃহীত নারী এবং আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহারকারী সাইবার সন্ত্রাসীদের হাতে নিঃগৃহীত সুপ্রীতি ধর সুবিচার পাবেন ও অন্তত সাইবার  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

লেখক ও সাংবাদিক।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.