আমার না বলা গল্প- ৫

Counter Hit 2ফেরদৌসী খান : ১। বয়স আমার ৭ কি ৮ হবে। আমি তখন থেকেই নাটক, নাচ, গান এগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। আর এগুলোর সুবাদে আমি পাড়ার সকল ভাইয়েরা ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠি। সেই ভালোবাসার দাবি নিয়েই সন্ধ্যায় আমাকে নিয়ে যায় আমারই পাড়ার এক বড় ভাই। আমাকে বাজারের হোটেলে নিয়ে মিষ্টি খাওয়ায়। তারপর চকলেট কিনে তারই সাইকেলে চড়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়। বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই বিরাট এক মাঠের পাশে সাইকেল রেখে সে আমাকে বলে সে একটু প্রস্রাব করবে। আমি যেন তার সাথে মাঠে যাই।

আমি প্রথমে না করলেও পরে ভূতের ভয়ে তার পিছু পিছু এগিয়ে যাই। হারামজাদা প্রস্রাব করে আমারই সামনে। আমি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ আমাকে টান দিয়ে শুইয়ে দেয়া হয় মাটিতে। আমি চিৎকার করতে থাকি। কেন এমন করছেন জিজ্ঞাসা করাতে আমাকে বলা হয় আমার সাথে একটা খেলা খেলবে। সেদিনের সেই খেলা আমি খেলতে দেইনি। খুব সজোরে ধাক্কা দিয়ে ভূতের ভয় ভুলে গিয়ে আমি দৌড়ে পালিয়ে আসি আমার বাড়িতে। সেদিনের সেই কথা আমার আর কাউকে জানানো হয়নি। সেদিন সেই ছোট্ট মনে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, আমি নিরাপদ নই।

২। তখন আমি এইচএসসি’র শিক্ষার্থী। টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাতাম আমি। প্রতিদিন আমাকে মিরপুর যেতে হতো পড়াতে। একদিনের কথা। আমি বাসের মধ্যে দ্বিতীয় সারির একটি সিটে বসা, তবে জানালার দিকে নয়। বাসটি যখন মিরপুর ১ নম্বর এসেছে হুরহুর করে অনেক যাত্রী একবারে উঠলো। সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। আমার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে চল্লিশোর্ধ এক নরপশু। কিছুক্ষণ পর আমি টের পেতে থাকলাম আমার ঘাড়ের কাছে শক্ত কি জানি আমাকে চাপ দিচ্ছে। শক্ত জিনিসটি কি দেখার জন্যে উপরের দিকে তাকালাম। ভিড়ের মধ্যে হারামজাদা তার পুরুষাঙ্গ আমার ঘাড়ে লেপটে ধরেছে। আমি প্রথম অবস্থাতে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তারপর………………খেয়াল করলাম আমার দুচোখ বেয়ে জল পড়ছে। আমি আবারো আহত হলাম। শিকার হলাম। আর একবার জানলাম, আমি নিরাপদ নই।

ঘুরে দাঁড়াবার গল্প

১। আমি তখন অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তখনও টিউশনি করি। হলে থাকি। নীলক্ষেত থেকে বাসে চড়েছি শ্যামলী যাবো। মেয়েদের নামে বরাদ্দ সিট, ইঞ্জিনের উপর বসা। আমার সামনে আমার বাবার বয়সই আরেক নরপশু দাঁড়িয়ে আছে। আমার দুই পায়ের মধ্যখানে আস্তে আস্তে তার পা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। প্রথম অবস্থাতেই সজোড়ে একটা ধাক্কা মারলাম।

জানতে চাইলাম, সমস্যা কি? অসুবিধা হচ্ছে কোথাও? উত্তর নেই। পা সরিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার একই কাজ করছে। খুব আস্তে জিজ্ঞাসা করলাম, কি সমস্যা চাচা? কোথাও সমস্যা হচ্ছে? উত্তর নেই। তৃতীয়বার আর কোন সুযোগ আমি দিলাম না। পা ঢুকিয়ে দেবার সাথে সাথে আমার দুই পা দিয়ে তার একটি পা চিপে ধরে ব্যাগের মধ্য থেকে পিন বের করে খোঁচাতে শুরু করলাম আমি। আমি খোঁচাচ্ছি আর চিৎকার করছি। আমার মগজে যতো গালি আছে সবগুলো ঢেলে দিলাম ওর উদ্দেশ্যে। আমি শুধু চিৎকার ছাড়া আর কোন কিছু শুনতে পারছিলাম না………

২। বইমেলার রাস্তা। সন্ধ্যার পর। তখন একটা ষ্টলে আড্ডা দিতাম। ফিরছি সাথে রয়েছে আমার বন্ধু। পেছন থেকে একটা হাত চলে এলো সরাসরি আমার বুকে। আমি হাতটা ধরে ফেললাম আর সেই সাথে আমার সর্বশক্তি দিয়ে ঘুষি মারতে লাগলাম লোকটিকে। তারপর উপুর্যপরি মার খেলো আমার আর আমার বন্ধুর হাতে। একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললাম রব ভাইয়ের চায়ের দোকানে এসে। দুটো আঙ্গুলে প্রচণ্ড ব্যাথা পেয়েছিলাম, কিন্তু মনে পেয়েছিলাম তৃপ্তি।

তাই বন্ধু, এই অনুভূতি আছে কমবেশি সকলের। এই অনুভূতি হোক শক্তির। আসবে ধেয়ে ওরা, রুখতে হবে আমাদের। আমাদের সন্তান, আমাদের শক্তি হয়ে দাঁড়াবে আমাদেরই পাশে। শুধু সারা বছর ধরে ওরা আমাদের গায়ে-পিঠে-মুখে-বুকে হাত দিয়ে যাবে, আর আমরা সেই হাত দেবার সুযোগ তৈরি করে দিবো? আমরা কি একত্রিত হয়ে সেই হাত রুখবো না?

তাতো হয় না। সেটা তো আর হতে দেয়া যায় না। তাই আসুন যেখানে হাত সেখানেই প্রতিরোধ। পহেলা বৈশাখ এর নির্যাতন আমাদের শক্তিতে রুপান্তরিত হোক। আর সেই শক্তি নিয়ে আমরা এগিয়ে যাই সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্নে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.