চালতার আচার: ওটা মেয়েদের খাবার

Meye 8উম্মে ফারহানা: নারী এবং পুরুষের শারীরিক গঠনে কিছু পার্থক্য রয়েছে তাঁদের একটি মাত্র ক্রোমোজোম ভিন্নধর্মী হবার কারণে। কিন্তু এই সামান্য পার্থক্যকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করাটা একটা সামাজিক প্র্যাকটিস।এই প্রবণতার খাঁটি উদাহরণ- টক সম্পর্কিত ধারণা।

আমার নানি মনে করতেন,টক খাবার অম্লধর্মী বলে তা নারীর শরীরের জন্য বেশি উপযোগী। আমার প্রশ্ন হলো, নারীর শরীর কি তা জানে? আমার মনে হয় জানে না। স্কুলে যখন পড়তাম, দেখতাম টিফিন পিরিয়ডে অনেকে চালতার আচার, সেদ্ধ জলপাই আর কাচা বড়ই কিনে খেত। কে জানে কেন আমার কোনদিন ইচ্ছাও করেনি ওসব টক জিনিস খেতে। বিষয়টি জৈবিক হলে আমি নিশ্চয়ই তা এড়াতে পারতাম না। যেভাবে আমি এড়াতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি সাড়ে এগার বছর বয়সে ঋতুদর্শন।

খুব দুঃখ হতো যখন দেখতাম মাসিক ঋতুর কষ্টকর সময়ের মধ্যে দিয়ে আমাকে যেতে হচ্ছে, সমবয়সীদের কেউ নিজের না হওয়া পর্যন্ত কষ্টটা বোঝেনি। যেহেতু ওটা বায়োলজিক্যাল,চাইলেও থামানো বা কমানো যায়নি। কিন্তু টক খাওয়া বা মিষ্টি খাওয়া ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।

হুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘আজ রবিবার’ এর একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ল এই প্রসঙ্গে। জাহিদ হাসানকে আচার সাধার পর সে বলল “ওটা মেয়েদের খাবার” এবং তারপরই আচার খাওয়া শুরু করলো।
আচার মেয়েদের খাবার, সোপ সিরিয়াল মেয়েরা দ্যাখে, শাহরুখ খানকে শুধু মেয়েরা পছন্দ করে এসকল ধারণার পেছনে কিছু হলেও যুক্তি থাকতে পারে, সুযুক্তি হোক আর কুযুক্তি। কিন্তু মেয়েরা হিন্দী বোঝেন, ছেলেরা বোঝেন না, বা বুঝলেও কম বোঝেন এমন ধারণার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে?
আমার পতিদেব গেলেন এক পাকিস্তানী ফটোগ্রাফারের সঙ্গে ওয়ার্কশপ করতে। আমাদের বাঙালি কানে হিন্দি আর উর্দু একরকম শোনালেও আদতে দুটো ভাষা ভিন্ন। আমার জামাই জোর করেই ইংরেজির বদলে ভাঙা হিন্দি আর উর্দুর মিশ্রণে এক জগাখিচুরি ভাষায় কথা বলছিল সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে। তার এই চেষ্টায় ভদ্রলোক সম্ভবত সম্মানিত বোধ করেছেন, তাই বলেননি কোথায় কি ভুল হচ্ছে, স্মিত হাসিতে উৎসাহ দিয়েছেন।

ভাবুন, আপনি এমন এক জায়গায় গেলেন যেখানে কেউ বাংলা পারেনা, একজন যদি আপনার ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করে,আপনি নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়ে যাবেন, কৃতজ্ঞ বোধ করবেন আর তখন আপনি নিশ্চয়ই তার বাংলার ভুল ধরবেন না, ধরলে তিনি ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে উলটো অপমানিত হতে পারেন বলে আপনি ভদ্রতা করবেন।

সেই পাকিস্তানিও তাই করলেন, এতে আমার জামাইয়ের বন্ধুদের ধারণা হলো আমি স্টার প্লাসে সিরিয়াল দেখি, বাধ্য হয়ে বাসার সবাইকে দেখতে হয়, সেই থেকে হিন্দি আমার শেখা হয়েছে। এবং আমার পতিদেব ‘বাধ্য হয়ে'(?!) ভাষাটি শিখেছেন!
মজার ব্যাপার হলো এই জীবনে আমি বহু জিনিস টিভিতে দেখেছি, কিন্তু হিন্দী সিরিয়াল দেখিনি। এমনকি বাংলা নাটকও আমি দেখিনা প্রায় ১৮/২০ বছর ধরে।

যারা এরকম ধারণা যারা করেন তাঁরা কোনকিছু খতিয়ে দেখেন না, সবকিছুকে একটা ছাঁচে ফেলে দেবার চেষ্টা করেন। হিন্দি সিরিয়াল মাসিক ঋতুর মতন বিষয় নয় যে নারী মাত্রেই তা বরদাস্ত করবে,করতে বাধ্য হবে। কিন্তু ভুল ধারণায় যিনি বসবাস করতে চান তিনি যুক্তির ধার ধারেন না।
দুনিয়ায় এরকম মানুষই বেশি। তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু শক খেলাম যখন দেখলাম আমার ছাত্ররাও এমন ঢালাও ভাবে জিনিসপত্র দেখেন এবং  এমন ছাঁচে ফেলেই ভাবার চেষ্টা করেন। সেদিন ক্লাসে মেয়েরা হিন্দি ভাল কেন বোঝে এটা ব্যখ্যা দেবার জন্য দুই তিন ছাত্র অতি মাত্রায় উৎসাহিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।

আমি বুঝলাম না, এমনিতে ছেলেরা মেয়েদের শ্রেষ্ঠত্ব কোন ক্ষেত্রেই মেনে নিতে চায়না, এখন এই অস্বাভাবিক উৎসাহের কারন কী হতে পারে। কারণ বোঝা গেল একটু পরেই। তাঁরা বলতে চান মেয়েদের খেয়েদেয়ে আর কোন কাজ নেই তাই তাঁরা সারাদিন বসে বসে স্টার প্লাস দেখেন আর হিন্দি শেখেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন বেশ কয়েকজন কমবয়সী ছেলে এবং বয়স্ক পুরুষ মানুষকে চিনি যারা হিন্দি ও বাংলা সোপ সিরিয়াল দেখেন (এঁদের মধ্যে একজন আমার শ্বশুরগোত্রের,এবং কোন স্বল্প শিক্ষিত মফঃস্বলবাসী আদা ব্যবসায়ী নন, ঢাকায় থাকেন এবং একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের উঁচুদরের কর্মকর্তা, জাহাজে না হোক, উড়োজাহাজে অনেক চড়েছেন)।
তারপর একজন বললেন, হিন্দি ছবিও নাকি মেয়েরা বেশি দ্যাখে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তাহলে কেন আইটেম গানের মূল আকর্ষণ হিসেবে ছেলেরা নাচে না…

তিনি যা বলতে চাইলেন তা হল এটা ব্যবসায়িক। যে কোন ব্যবসা যে ক্রেতা বুঝে চালান হয় তা তাঁকে বোঝাতে পারলাম না। কয়দিন আগেই মাস্টার্স ক্লাসে ‘টোয়েলফথ নাইট’ পড়াবার সময় ‘ড্র্যাগ প্লে’র সঙ্গে লরা মালভির ‘মেল গেজ’ বিষয়ক তত্ব যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলাম ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা এত মালভি উদ্ভূত ‘ভিজুয়াল প্লেসার’ তত্বের ধার দিয়ে না গিয়ে বকতেই থাকল। ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্ররা অকারণে পুরুষতান্ত্রিক হতে পারবেন না এমনটা আমি আশাও করি না। তাই বলে ভাষা ও ভাষা শেখার মতোন বিষয় নিয়েও তাঁরা গোঁয়ারের মতন তর্ক করবে এটাও আবার হজম করতে পারলাম না। তাঁদের আমি LAD বা ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজেশন ডিভাইস’ নিয়ে কিছু বোঝাতে চাইলাম, কিন্তু তাঁরা তাঁদের ধারণায় অনড়।
আমি বুঝলাম, কাউকে তার প্রিকনসেপশন থেকে বের করে আনা খুব কঠিন। আর সেটা যদি কোনভাবে জেন্ডার সংক্রান্ত হয় তবে তো কথাই নেই।
মুখ ভরে চালতার আচার খেতে খেতে জাহিদ হাসান যেমন বলছিল “ওটা মেয়েদের খাবার” ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.