প্রধানমন্ত্রী সমীপে ১, আপনারও কি আঘাত লাগে?

Nari BCUগোধূলি খান: আঃ কি কষ্টই না পেয়েছে গাড়িটি! একটা খালির টবের আঘাতে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে বিশাল জল কামানের গাড়িটি। আর ওই টবের আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত গাড়িটি তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আর এই প্রিয় বাহনের প্রতি এহেন আঘাত সইতে না পেরে এই জলকামান নামক বাহনের দাবিদারগণ কাতর হয়ে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েন। আবেগে বলক উঠতে থাকে, বলক  উথলিয়ে উঠায়, খালি টব নিক্ষেপকারী একটা শুকনা পাতলা মেয় কে তীব্র আক্রোশে মারতে মারতে মারতে শুয়ে ফেলে।

দোষ কি পুলিশের? দোষ তো মেয়েটার?
কেন সে খালি টব ছুঁড়বে পুলিশের জলকামানের দিকে। ওর অনুভূতি আঘাত পায়নি? জলকামানের কি ব্যথা করেনি? ওর কি দুঃখ লাগেনি? মেয়েটার এহেন পশুসুলভ আচরণ পুলিশ বিভাগ কেমনে মেনে নিবে?  ওদের নীতি আছে, নিয়ম আছে, মারদাঙ্গি আছে (শুধুমাত্র নিরীহ মানুষ আর নারীর জন্য প্রযেজ্য )।
মেয়েটার কি মানবতাবোধ বলে কিছু নেই! কিভাবে সে পারলে স্টিল বডির একটা বাহনকে একটা পোড়া মাটির টব দিয়ে আঘাত করতে! এই আঘাত কি সামান্য কিছু, এই আঘাত পুরা পুলিশের যানবাহন সমাজের উপর আঘাত। আর বোধ সম্পন্ন পুলিশ কিভাবে মানবে এই আঘাত!

আর তাই বীর নপুংসক পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে আঘাত করেছে মেয়েটিকে। একজন তো বাংলা সিনেমার মত মেয়েটির গলাধাক্কা দিয়ে সজোরে আছড়ে ফেলে ফুটপাথে, মেয়েটি উঠে দোড়ে পালাতে চেষ্টা করে। হুহু বাবা এতো সোজা, এর নাম দাঙ্গা পুলিশ, প্রায় উড়ে আসলো মেয়েটির পশ্চাৎদেশে লাথি দিতে, শুধু লাথি নয়, গলাটা পিছন থেকে চেপে ধরে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে দেয়ালের দিকে। পালাতে চেষ্টা করেও লাভ হয়নি, ঠিকই আমাদের পুলিশ নামক বীরপুঙ্গবগুলি নিজেদের মারদাঙ্গি দেখালো। গলাটা চেপে ধরেছে পেছন থেকে একটা হাত, আরেকজন লাথি মারছে পিছন থেকে, আরেকটি হাত এগিয়ে আসছে ভাঙ্গা টবের টুকরো নিয়ে আঘাত করতে। মারতে মারতে শুয়ে ফেলছে তিনচার জন পুলিশ।

ফুটপাথের উপর পড়ে থাকা ইসমত জাহান, তাতেও মুক্তি নাই হাহা, পরে থাকা ইসমতের শরীরের পরে দাঙ্গা পুলিশের বুটের লাথি একের পর এক।

কি বুঝলি মেয়ে, কার সাথে লাগতে এসেছিস! কার অনুভূতিতে আঘাত করেছিস! পুলিশরাই দেশ চালায়, আর এই চালকদের বাহনে আঘাত! দেখ এবার কত ধানে, কত চাল। অমানবিক ছেমড়ি টাকে কিছুটা মানবতা শেখালো পুলিশরা। আরো ভালো করে শেখানোর জন্য ওরা এবার মামলা করবে। পুলিশি কাজের বাধায় দেয়ার শিক্ষা  দেয়ার ব্যবস্থা নেবে। সাবাশ এই না হলে কি ফুলিশ সরি পুলিশ।

পত্রিকার পাতায় চোখ রাখা মাত্র চমকে উঠি! হতবিহবল হয়ে পড়ি। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠি। মনে হয় কে যেন পিছন থেকে তীব্র জোড়ে হ্যাঁচকা টান মারছে চুলের গোড়া ধরে। পরক্ষণে অনুভব করি বুটের লাথি  সজোরে পড়ছে শরীর জুড়ে, ব্যথায় কন্ঠরোধ হয়ে আসে।

সারা পৃথিবী যখন মা দিবস পালন করছে, আমাদের পুলিশ মায়ের জাতকে বুটের নিচে পিষছে। এই পুলিশগুলি, আমাদের কারো কারো বাবা, ভাই ও সন্তান। এদের হাতেই নির্যাতিত হচ্ছে অমানুষিকভাবে, এদেরই মেয়ে, বোন ও মা তাঁদের সহপাঠী সহযোগে। আর কেন তারা নির্যাতিত হলো ২৭ দিন আগে নববর্ষের উৎসবে ঘটে যাওয়া যৌন সন্ত্রাসের প্রতিবাদে।

কিছু প্রশ্ন কিলবিল করে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী, নারীর নিরাপত্তায় বলিষ্ঠ কোন আইন আজো হয়নি কেন? ইভটিজিং প্রতিকারে নেই কেন আইন? আমরা মেয়েরা স্কুল কলেজে যেতে পারিনা। অফিস করতে হয় নানান যৌন অপদস্থ হতে হতে। বাসার বাইরেও যাওয়াটা কেন কঠিন করে তুলছেন? আমাদের শুনতে হয় নারীর অধিকার আদায় করে নিতে হবে, কেউ দেবে না।

কাদের কাছ থেকে আদায় করতে বলছেন? আমাদের সব অধিকারের দাবী তো আপনার জানা, কিন্তু কোনটা পূরণ করেছেন? আমাদের মেয়েদেড় বিয়ের বয়স সুচতুর ভাবে ১৬ তে নিয়ে এসেছেন। আপনি নারী হয়েও কেন নারীর সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছে না। নারীর প্রতি পদক্ষেপ দিনকে দিন কঠিন করে তুলছেন কেন? আমাদের হেফাজত করার দায়িত্ব আপনার আর আপনি ইসলামী মৌলবাদীদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রেখে তাঁদের অন্যায় মেনে নিচ্ছেন একের পর এক আর আমাদের স্থান আরো সংকুচিত করে তুলছেন কেন? নারীর নিরাপত্তা বা নারী অধিকারের ক্ষেত্রে আপনি কেন নিশ্চুপ হয়ে যান? আপনি নিরাপত্তা ঘোরটপে জীবনযাপন করেন, বিরোধীদলে থাকলেও এর বত্যয় ঘটে না।

আপনার কি একবারো মনে হয়নি, নারীর উপর এই যৌন সন্ত্রাসের হামলা ওইদিনের কিছু নারীর উপরই শুধু নয়, তা আমাদের সব নারীর উপর, যার থেকে আপনিও বাদ পড়েন না। আপনার অনুভূতি কি আঘাত এ ঘটনায় আঘাত পাই না। আপনি এতো বিষয়ে কথা বলেন কিন্তু নারীদের মৌলিক দাবীতে কেন  চুপ করে আছেন? আপনার কি কিছুই বলার নাই। গত ২৭ দিন ধরে অপেক্ষায় আছি, আজ বলবেন, আজ বলেননি, কাল নিশ্চয় বলবেন। কিন্তু আমাদের অপেক্ষা দীর্ঘতর হচ্ছে কিন্তু আপনার নারীর উপর যৌন সন্ত্রাস নিয়ে কোন কথা নাই।

কেন নেই? আর মা দিবসে আমাদের ভাই বোনদের উপর যে অমানুষিক নির্যাতন হল তার খবর কি আপনি পেয়েছেন? বা টিভিতে দেখেছেন? শুনে বা দেখে থাকলে আপনার অনুভূতিতে কি একটু আঘাত লেগেছে? মা হিসেবে আপনার বুকে একটু কি ব্যথা বোধ করেছেন? আহা ইসমত তো আমারও মেয়ে হতে পারতো ভেবেছেন?
পুলিশ বড় গলায় জানায় দেশ চালায় পুলিশ আর এই কারনে কি পুলিশের করা অন্যায় আর অন্যায়  বলে পরিগণিত হবে না। ছাত্র ইউনিয়নের ডাকা প্রতিবাদ আন্দোলন কি এতোই ভয়াবহ ছিল যে, কোন কারণ ছাড়ায় তাঁদের উপর লাঠি চার্জ করা হল। লাঠিচার্জের পর কোন বিক্ষোভকারীর যদি কেউ ফুলের টব নিক্ষেপ করে, তার উপর অন্যায় নির্মম অত্যাচারের ঝড় বইয়ে দেবে রাজপথে? নারীর উপর যৌন সন্ত্রাস’র প্রতিবাদে কি আপনারা পুলিশ বাহিনী আবার অনাগত ছাত্র আন্দোলনের রূপ দেখতে পেয়েছে? নাকি ভয় পেয়েছে এই মিছিল ঠেকাতে না পারলে, এই মিছিল থেকে কেঠো গণতান্ত্রিক সরকার বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হতে পারে?

Nari BCU 2মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী, আপনার পুলিশ বাহিনী এতো সাহস কেন শুধু মাত্র অহিংস আন্দোলনকারীর উপর? পুলিশই বা কেন থেকে থেকে এমন আচরণ করে যাতে আপনার সরকারের ভাবমূর্তি ধুলায় লুটাই? দয়া করে বসুন এই পুলিশদের সাথে, ওদের সমস্যা চিহ্নিত করুন, তার সমাধান করুন, ওদের অর্থনৈতিক সমস্যার সাথে পারিবারিক ও মানসিক সমস্যা গুলা চিহ্নিত করুন। পুলিশকে মান্ধাতা আমলের ট্রেনিং থেকে মুক্ত করুন। তাঁদের দাস বানানোর ট্রেনিং না দিয়ে নিরাপত্তারক্ষীর ট্রেনিং দেন। তাঁদের যুগোপযোগী ট্রেনিং দেবার ব্যবস্থা করুন, পুলিশ আর রাজনীতিকরা আজ জনগণের কাছে সব থেকে অনাস্থা আর ঘৃণার বস্তুতে পরিণত হয়েছে, শুধুমাত্র আপনাদের উদাসীনতার কারণে।

এদেশে কেন অন্যায়ের প্রতিবাদকারীরা নির্যাতনের শিকার হয়? পেট্রল বোমা মারলে দোষ হয়না, মানুষসহ যানবাহন পুড়িয়ে দিলে দোষ হয় না। দিনের পর দিন আপনারা রাজনীতির নামে পথঘাট আটকে মিছিল মিটিং করেন তাতে দোষ হয় না, সাত আটটা খুন করলে দোষ হয় না, দোষ হয় না ঘুষ খেলে, দোষ হয় না ইসলামের নামে জঙ্গিবাদের সহতায়, দোষ হয় না অবিচার, অন্যায় আর দুর্নীতির। আপনার কি কিছুই চোখে পরে না। আপনারা রাজনীতিকরা ক্ষমতায় আসার আগে এক কথা বলেন, এসে আরেক কথা আর কাজ করেন। ভোটের সময় আমরাই সব থাকি আপনাদের মুখে কথা ও সুখে , ভোটের পরে আপনাদের মুখের কথায় বা সুখের সময় আর আমাদের নাই হয়ে যায় কেন?

সর্বজ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী, আপনার জ্ঞান-গরিমার শেষ নাই, আপনার জ্ঞান ভান্ডারের কোথাও কি আমাদের দেশের নারী সমাজের প্রকৃত অবস্থার ছবি আছে? নাকি আপনি চারদিক থেকে ঘিরে থাকা একদল পুরুষের চোখে দেখেন, তাঁদের কানে শোনেন, তাঁদের দেয়া বাক্য প্রয়োগ করেন? আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা তো আকাশচুম্বী নয়। আমরা নারীর নিরাপত্তা দাবী করছি। আইন প্রণয়নে কথা বলেছি, বলছি। যে আইন প্রকৃতভাবে নারীকে নিরাপত্তা দেবে ও যার প্রয়োগ হবে।

নারীর উপর সব ধরনের সন্ত্রাস বন্ধ করার অনুরোধ করে আসছি। আপনি নারী হয়ে কি টের পান না? নাকি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন বলে আম-নারীর সমস্যা আপনার ধাতব্যের মধ্যেই পরে না।

ইসমতের উপর পুলিশি বুটের আঘাত আপনার আমার উপরে কি পড়ে না? আপনার কর্মকাণ্ডতে মনে হয় আপনাকে দিয়ে নারী বিরোধী কাজ কেউ ধীরে ধীরে করিয়ে নিচ্ছে আর আপনি টেরও পাচ্ছেন না। আমাদের মুক্তভাবে কথা বলার গনতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। নারীর পায়ে শৃংখল পরানোর পন্থা নেয়া হচ্ছে। নারীর প্রগতি-প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আপনিও অবস্থান নিচ্ছেন।

প্রাজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী, আপনার দীর্ঘ রাজনীতিক জীবন কি বলে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেয়া নাকি এর প্রতিকারের কঠোর অবস্থান নেবার? যে দেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধিদলের প্রধান, সংসদের স্পিকার নারীর সেই দেশে নারীর উপর যৌন সন্ত্রাস আর সহিংসতা কি করে সম্ভব? একজন নারীমাত্রই জানে নারীর জন্য কি প্রয়োজন আর আপনারা দেশের সর্বোচ্চ পদে বসেও জানেন না বা কিছু করছেন না তাতে অবাকই লাগে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় নারী। সেই নারীর প্রতি এমন বিমাতা সুল্ভ আচরণ নারীরা আর কতদিন সইবে? একদিন না একদিন এই অবহেলিত নারী ক্ষোভে ফেটে পড়বে যদি না আপনাদের এহেন আচরণ বন্ধ না করেন।

দোষী পুলিশদের কি করবেন? পুরস্কৃত করবেন না তাঁদের সাসপেন্ডের নামে অন্য স্থানে পাঠাবেন নাকি একটা পুলিশকে বহিষ্কারের করে পরিস্থিতি সামলানোর চেস্টা করবেন? নাকি মন থেকে পদক্ষেপ নেবেন যাতে নারীর উপর কোন ধরনের সন্ত্রাস আর না হয়। সেই সাথে পুলিশের আচরণ পরিবর্তনে ভূমিকা নেবেন। সবই আপনাদের ইচ্ছের উপর। আপনার ইচ্ছায় হেফাজতিদের হেফাজত হয়, আপনার ইচ্ছায় শতকোটি টাকা মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসারে বিনিয়োগ হয়। আপনার ইচ্ছায় যুদ্ধাপরাধী প্রধান জঙ্গি নেতার নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে গ্র্যান্ড জানাজা হয়, আর আমাদের পুলিশের উপস্থিতিতে যৌন সন্ত্রাসের কবলে পড়তে হয়। আপনাদের ইচ্ছায় ইসলামী জঙ্গিরা দিন দিন বেড়ে চলেছে, আর আমাদের রাজপথে ফেলে বুটের নীচে পেষা হচ্ছে।

আপনাদের ইচ্ছায় ৫০০ নতুন মসজিদ হবে, সেখান থেকে আপনাদের পতনের ডাক আসবে অচিরেই। সবই আপনাদেরই ইচ্ছায়।
একটা কথা জানতে খুব ইচ্ছে করছে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী, ছবিতে প্রায় দেখি, আপনি একজন মমতাময়ী মা, খালা। জনগণের খুব কাছের মানুষ। তাহলে কাল ইসমতের জায়গায় আপনার মেয়ে বা নাতনী আর ছাত্রদের জায়গায় আপনার পুত্র আর নাতীকে পুলিশ বুট দিয়ে পিষলে বা নির্মমভাবে পেটালে আপনি কি চুপ করে থাকতেন? আপনার মেয়ে-বউ এর উপর যৌন সন্ত্রাস হলে কি এমন নিরবতা পালন করতেন? প্লিজ মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী আপনার অনুভূতি কি বলে? কি করতেন একটু কি জানাবেন?

লেখক ও সাংবাদিক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.