“মননে মৌলবাদ পুষে নারীর ক্ষমতায়ন হয় না”

সাব্বির খান: বর্ষবরণ উৎসবের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে ছাত্র ইউনিয়নের ‘ডিএমপি’ কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি বাধা দিতে গিয়ে পুলিশের ঢালাও লাঠিপেটায় আহত হয়েছেন অনেকেই, যার মধ্যে রয়েছেন একাধিক নারী। সাংবাদিকদের ক্যামেরায় বন্দী হয়েছে এমন একটি নারী নির্যাতনের ছবি, যা দেখে যেকোন সভ্যতাই স্থবির হবে।

Nari BCU“মাটিতে লুটিয়ে আছেন একজন নারী। তাকে ঘিরে আছে বন্দুকবাহী বুট পরা একদল পুরুষ পুলিশ। মেয়েটিকে সবাই লাঠি পেটা করছে একসাথে। অন্য আর একটি ছবিতে দেখা গেল, সেই একই মেয়েকে চুলের ঝুঁটি চেপে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক পুরুষ পুলিশ।”

ছবিটিকে যেভাবেই পর্যালোচনা করা হোক না কেন, পুলিশ কতৃক নারী নির্যাতনের চিত্রটি কোনভাবেই ঢেকে রাখার মত নয়। বিশেষ করে আন্দোলনের ব্যানারেই যখন লেখা ছিল ‘নারীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি, তখন সেই আন্দোলনকে বাধা দিতে আর এক নারীকে মাটিতে শুইয়ে নির্যাতন করা কোন সুস্থ্য রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। বিশেষ করে সেই রাষ্ট্রের প্রধান যখন নারী।

পুলিশ কোন সম্প্রদায়ের নাম নয়। এদের সাথে সরাসরি কারো বিরোধ নেই বা থাকার কথা নয়। রাস্তাঘাটে আমরা যারা প্রতিনিয়ত বিচরন করি, পুলিশ তাঁদেরই বাবা, ভাই, চাচা, বোন বা ক্ষেত্রবিশেষে মা। অথচ কোন এক অলীক যাদুমন্ত্রের বলে এই আত্মার আত্মীয়রাই তাঁর সন্তানদের উপর কি নির্মম পাশবিক ভাবে ঝাপিয়ে পড়েন! পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন, অপমান আর লাঞ্ছনা করেন।

আর এই জঘন্য আক্রমনের ভুক্তভোগী যদি হন কোন নারী, তাহলে আমি, আপনি বা আমরাই শুধু নই; লজ্জিত হয় সারা জাতি। স্তব্ধ হয় বিবেক।

Nari BCU 2ছবিটি বলছে- “দেখো, রাষ্ট্রযন্ত্রের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে বিংশ শতাব্দির আর এক ‘ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী’।“ আবার স্মরণ করতে হয় একাত্তরের সেই দিনগুলো, যেদিন একই ভাবে বাংলার মাটিতে অপমানিত হয়েছিল এদেশেরই মা-বোনেরা।

হয়তো এই নারী আইনের দৃষ্টিতে কোন অন্যায় করেছিলেন। অন্যায় কি হয়েছিল বা কে করেছিল- অনেক সময় ক্ষেত্রবিশেষে তা বিবেচ্য নয়, যখন ভুক্তভোগী হন একজন নারী। এই উপমহাদেশের অসংখ্য আন্দোলনে নারীর ভূমিকা অপরিসীম, যা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। একটি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধী নেতা, সংসদের উপনেতা, স্পিকার যেখানে নারী, সেই দেশের পুলিশের অন্তত এই শিক্ষাটা থাকা উচিত ছিল যে, কোন নারী যদি অপরাধীও হন, তার সাথে সম্মানজনক ব্যবহার করা উচিত।

মৌলবাদের হিংস্র পশুদের দেখেছি হাজার মানুষের সামনে সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনকে মাথায় আঘাত করে ভূলুন্ঠিত করতে। দেখেছি সাংবাদিক জাকিয়া আহমেদকে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে মৌলবাদিদের অসম্মানজন কটুকথায় অপমানিত হতে। দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর নারীজাতির বিরুদ্ধে নোংরা অপমানজনক ওয়াজের ক্যাসেট এখনো নিষিদ্ধ করা হয়নি বাংলাদেশে। প্রথাবিরোধী লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফিরতে না দেয়ার পেছনেও এই মৌলবাদীদের অবদান আজ কারো অজানা নয়। এসবই আজ স্বাধীন বাংলাদেশে নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা।

একটি দেশ তাঁর সংস্কৃতির ভাষায়ই পরিচিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের গৌরবের বাংলা ভাষায় যোগ হয়েছে আর এক অদৃশ্য মৌলবাদের ভাষা, যার চর্চা আজ সমাজে নীচু থেকে উচু তলায় সমান। আমরা আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে লালন করছি মৌলবাদের বিষবাস্প। প্রতিটা ক্ষেত্রেই তার চূড়ান্ত অনুশীলন আজ দৃশ্যমান।

আদি থেকেই মৌলবাদের মূল টার্গেট নারী। কিন্তু খালি চোখে তা কখনোই দেখা যায়নি। কখনো কমিউনিষ্টদের বলা হয়েছে মৌলবাদের প্রতিপক্ষ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা কখনো আবার অমুসলিমদের। ২০১৩ সালে হেফাজতের ঐতিহাসিক নেক্কারজনক ১৩ দফার প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল নারীর বিরুদ্ধে বিষোদগার। সেই হেফাজত বর্তমানে ধর্মীয় উপদেষ্টার মত বাংলাদেশ সরকারকে হুমকী-ধামকী দিয়ে শরিয়তের বিধান মতে দেশ শাসন করায়। নাস্তিক উপাধী দিয়ে জেলে পাঠায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও দেখেছি, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ভিআইপি বন্দীও যুদ্ধাপরাধীদের মতো এতো সমাদর পায়নি। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের নারীদের যৌন নিপীড়নের জন্য প্রাথমিক তদন্তে যেই নোংড়া মৌলবাদের স্পর্শ খুজে পাওয়া গিয়েছিল, সেই একই মৌলবাদী কায়দায় আজ আবারো নির্যাতিত হলো বাংলার আর এক বিচারপ্রার্থী নারী। এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়তবা। কিন্তু সংস্কৃতির ভাষাটা এক এবং অদ্বিতীয়।

মনণশীল মৌলবাদের থাবায় জর্জরিত বাংলাদেশের প্রতিটি অফিস-আদালত, প্রশাসন আর স্কুল-কলেজ। সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রেও যে মৌলবাদের উপস্থিতির ছাপ স্পষ্ট, তা আজ ঢাকায় নারীর উপর সভ্যতাবর্জিত নির্যাতনই প্রমান করে। সরকারকে সতর্ক এখনই হতে হবে। জামায়াত-হেফাজত কখনো বাঙ্গালীর বন্ধু হতে পারে না। এই মহাসত্যটা যদি সরকারের উপলব্ধিতে না আসে,  তাহলে এমন একটা সময় আসবে, যখন ঘাড় ফিরিয়ে দেখবেন পাশে কেউ নেই। তখন সবার হৃদয় শকুনের খাবারে পরিণত হবে।

লেখক: সাব্বির খান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.