পুরুষের বড় অপরাধ

women wealthতামান্না কদর: পুরুষদের অপরাধ নিয়ে যখনই প্রতিবাদ করা হয় তখনই একদল পুরুষ বলতে শুরু করে- ‘নারী কোনো দোষ করে না, নারী কোনো অন্যায় করে না, নারী প্রতারণা করে না? তখন তাদের কী বলবে যখন পুরুষ অপরাধ করলে পুরুষকে আচ্ছামতো বকে দাও?’

হ্যাঁ নারী অন্যায় করে, প্রতারণা করে, দোষও করে। কিন্তু এগুলো একান্তই নারীর একান্ত ব্যক্তিগত। এটা নারীজাতির সামষ্টিক কোনো অপরাধ নয়। পুরুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে নারী কোনো অলৌকিক গ্রন্থ, কোনো আইন, কোনো প্রথা চালু করেনি।

অতএব, উপরোক্ত কথাগুলো বলে যারা নারীপুরুষের অপরাধকে এক পাল্লায় মাপতে চান তারা হয় সচেতনভাবেই নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করেন, অথবা তারা বুঝেই না সমাজের পুরুষবাদ তথা লিঙ্গবাদ, পুরুষতন্ত্র-নারীবাদ এই বিষয়গুলো।

এ সমাজে পুরুষ একমুখি নির্যাতনের শিকার, নারী দ্বিমুখি নির্যাতনের শিকার। নারী শুধু তার লিঙ্গচিহ্নটি বহন করার কারণেই এক ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে পুরুষ দ্বারা অথবা পুরুষ মগজ-জাত নারী দ্বারা। শরীরে নারী হয়েও যখন কোনো নারী-পুরুষের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-কানুন দ্বারা অন্য নারীকে মাপতে চায়, তখনই সে পুরুষ মগজজাত নারী।

পুরুষ কি বলতে পারে কেবল একটা ৩-৬ ইঞ্চি লিঙ্গ বহন করার দায়ে নারী তাকে কোনোরকম নির্যাতন করে? একজন পুরুষকে কি বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে চিন্তা করতে হয় নারী দ্বারা ঘটিত কোনো দুর্যোগের, একজন পুরুষকে কি বাড়ি থেকে সন্ধ্যায় বের হওয়ার সময় কোনো নির্দেশনা শুনতে হয় পরিবার থেকে, রাতে বাড়ি ফেরা নিয়ে পুরুষের উপর কোনোরকম নিষেধাজ্ঞা আছে কি, কেমন পোশাক পুরুষ পরবে তা নিয়ে নারী কোনো নির্দেশনা দেয় কি?

একটি বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে তার মা-বাবা কখনো উদ্বিগ্ন থাকে কি এই ভেবে যে কখন আবার কোন্ নারী দ্বারা বলাৎকার বা ধর্ষণের শিকার হয়? কোনো যুবকের অভিভাবক যুবককে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে কখন কী হয় নারী দ্বারা? দূরে কোথাও গেলে মেয়ের অভিভাবকের মতো ছেলের অভিভাবক একই রকম উদ্বিগ্ন থাকে?

থাকে না। এই দুই অভিভাবকের উদ্বেগের প্রকার ভিন্ন। অনেকে বলবেন- ‘প্রকার তো ভিন্ন হবেই, কারণ দুজনের শরীরের প্রকার ভিন্ন।’ অর্থাৎ এই শ্রেণির মানুষেরা(!) নারীকে খাদ্য আর পুরুষকে খাদক মনে করে থাকে। আমাদের আপত্তিটা ঠিক এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই।

একই সমাজের মানুষ হয়ে, একই মানুষের গর্ভজাত হয়ে দুই লিঙ্গের বাচ্চাদের প্রতি, মানুষের প্রতি উদ্বেগের প্রকার ভিন্ন। তাহলে নারীর অপরাধ আর পুরুষের অপরাধ কি একই পাল্লায় মাপা উচিত? আমরা এমন একটি সমাজব্যবস্থা চাই, যেখানে শুধু লিঙ্গচিহ্নটির কারণে মানুষে মানুষে বিভাজন হবে না তার অধিকার প্রাপ্তির বেলায় এবং সমাজের- প্রকৃতির আনন্দ উপভোগের বেলায়।

একজন ৩০ বছরের নারী কখনো কি কল্পনা করতে পারে একটি ১৩ বছরের কিশোর হেঁটে যাচ্ছে আর তাকে সুযোগ পেয়ে দূরে কোথাও নিয়ে ব্যবহার করছে? এখন কেউ যদি বলে নারী ধর্ষণে অক্ষম, তাহলে বলবো যৌনতা নিয়ে তাকে আরো পড়তে হবে। নারীর এ ধরনের অপরাধ অপ্রবণতার কারণ জৈবিক বলে দিলেই হয়ে গেলো না শুধু, এটা-সামাজিক-সাংস্কৃতিক।

যদি কোনো নারী এ ধরনের অপরাধের সাথে কখনও জড়িত হয়ে পড়ে তাহলে তার শাস্তি কোনো আইনের মাধ্যমে দেয়ার দরকার পড়বে না, তার আগেই সমাজ এই নারীকে শায়েস্তা করে দেবে। অর্থাৎ নারী আগেই অবগত আছে যে এ ধরনের অপরাধ করে টিকে থাকা যাবে না, আবার অন্যদিকে ছেলেরা, যুবকেরা, প্রৌঢ়রা, বৃদ্ধরা সুযোগ পেলেই এই অপরাধগুলি করে ফেলছে কারণ তারা অবগত হয়ে আছে আইন, সমাজ কোনোটাই তার কিছু ক্ষতি করতে পারবে না, বরং এবেলাতেও অপরাধী পুরুষ নয়, নির্যাতিত নারীরই আরেকপ্রকার মানসিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রিক বা আইনগত হেনস্থার শিকার হতে হবে। এ সমাজ, আইন ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড লিঙ্গবাদী, পুরুষের স্বার্থ সুরক্ষা তার অন্যতম নীতি।

খেয়াল রাখতে হবে, নারীর অপরাধ আর পুরুষের অপরাধের মধ্যে পার্থক্যটি গুলিয়ে ফেলা যাবে না। পুরুষের সবচে বড়ো অপরাধ- সে নারীর জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা পোষণ করে এবং সে লক্ষ্যে নানারকম গ্রন্থ এনেছে, আইন বানিয়েছে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.