একজন আলোর পথের যাত্রীর প্রস্থান

Novera 2লুতফুন নাহার লতা: জীবন সম্পর্কে যিনি বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ নট ফেইলড সো ফার ইন লাইফ, পারহ্যাপস নেভার উইল।’ মৃত্যু সম্পর্কে নির্বিকার উদাসীন ছিলেন নভেরা । তিনি বলতেন, ‘যেখানে জীবন শেষ, বাঁচা শেষ সেখানেই মৃত্যু।’ গ্রেটা গার্বো বা ইনগ্রিড বার্গম্যানের চোখ যাকে বলে দিত ‘জীবনের পরিণতি আছে ট্র্যাজেডিতে।’

আর তাই বোধ করি এই বোহেমিয়ান নক্ষত্র শহীদ মিনারের প্রথম স্থপতি, ভাস্কর নভেরা আহমেদ বেছে নিয়েছিলেন চূড়ান্ত ট্র্যাজেডিপূর্ণ এক বিরল নির্জন জীবন।

যদ্দুর মনে পড়ে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ এর দিকে প্রথিতযশা লেখক হাসনাত আবদুল হাই এর লেখা ‘নভেরা’ প্রথমে আনন্দ বিচিত্রা ও পরে বই আকারে বের হলে, পড়ে তো আমি তখন পাগলপ্রায়।  দ্রোহে, প্রেমে, ভালো লাগায় , প্রজ্ঞায় , দৃঢ়তায়, দীপ্ত আমি। পাশাপাশি আবার কষ্টের অভিমানী সন্ধ্যা এসে আঁধার ছড়িয়ে দিয়ে গেছে মনে। আমার এমন হয়, যখনি কোন ভাল বই পড়ি সে বইয়ের সকল চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে উঠি যেন সেই গাছপালা , ঘরবাড়ী, আকাশ বাতাস , যেন নিখিলের সাথে আমি একাত্ম। বই পড়া শেষ করে তাই গাড়ি নিয়ে ছুটে গেছি পরিচয়ের সূত্র ধরে পুরানো এয়ারপোর্ট রোডে র‍্যাংসের রউফ চৌধুরীর বাড়ীতে। দেখে এসেছি নভেরার করা কিছু ভাস্কর্য !

ছুটে গেছি শহীদ মিনারে, সেখানে বসে থেকে অপলক চেয়ে চেয়ে ভেবেছি সেই ১৯৫২ – ৫৩ র কথা ! পরদিন গেছি জাতীয় যাদুঘরে, পাবলিক লাইব্রেরীতে চোখ দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছি না দেখা এক রহস্য ঘেরা মানবীকে !

‘নভেরা’ তে এক নিঃশ্বাসে পড়েছি অসামান্যা এই মানুষটির কথা! একটি একটি করে পাতা উলটে গেছি আর এই ঘূণে ধরা অন্ধকার সমাজের প্রতি আমার সমস্ত অন্তরভরা অভ্রভেদী দ্রোহ নিয়ে সমবেদনায় জড়িয়ে ধরেছি তাঁরে ! এই নারী সেই ১৯৩০ এর দিকে জন্ম নিয়েও কেবল নারী নয় একজন মানুষ হিসেবে বাঁচতে পেরেছিলেন ! তাঁর শিক্ষা তাঁর জীবনাচরণে এনে দিয়েছিল প্রচলিত সমাজ ভাঙ্গার বিপ্লব!

বেড়ে উঠেছেন কলকাতা, কুমিল্লা ,ও চট্টগ্রামে। শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হিসেবে মুক্ত মনে আত্মমর্যাদা নিয়ে বড় হয়েছিলেন আর তার ভেতরকার স্বাধীন চেতনা তাঁকে সমুন্নত মস্তকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সকল বিপরীত স্রোতের সামনে।

১৯৪৫ এর পরে পড়াশুনা করেছেন লন্ডন, ফ্লোরেন্স, ভিয়েনাসহ নানান দেশে। পরিচিত হয়েছেন এবং কাজ করেছেন অসাধারন সব পন্ডিত শিল্পী ও ভাস্করের সাথে । তিনি অনেক পশ্চিমা আধুনিক সেলিব্রিটি ভাস্কর শিল্পীর কাছে পেয়েছিলেন শিল্পের প্রতি অনুরাগ ও উতসাহ, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বৃটিশ ভাস্কর Jacob Epstein চেকোস্লোভাকিয়ার Karel Vogel, ফ্লোরেন্স ও ভিয়েনাতে Venturino Venturi আর তার প্রেরনার বড় উৎস ছিলেন Henry Moore.

Noveraবাংলাদেশে নভেরাকে চিনতেন, নভেরার গুণমুগ্ধ ছিলেন, বন্ধু ছিলেন যারা তাদের অনেকেই আজ আর নেই আমাদের মাঝে, তবু তাঁরা প্রত্যেকেই স্বনামধন্য , কিংবদন্তীতূল্য ! ভাস্কর হামিদুর রহমান, নাট্যজন অধ্যাপক সাঈদ আহমদ, খান আতা, কবি শামসুর রাহমান, নাজির আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, মূর্তজা বশির, জয়নুল আবেদিন, সুচরিত চৌধুরী, মাহবুব, আহমেদুল কবির, কবির চৌধুরী আরো আরো অনেকেই ।
১৯৯৫ -৯৬ এর দিকে বাংলাদেশে নির্বাচন শেষ হয়েছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করেছে ! দেশে আনন্দ বইছে কিন্তু নানাবিধ কারণে তখন বড় মনকষ্টের সময় আমার। ঠিক যেমন ভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম তেমন্টি কিছুতেই হচ্ছিল না। একটি জানা বা জানাতে চাইনা এমন, শিরোনামহীন কষ্ট আর বুকভরা অভিমান নিয়ে ভাবছি দেশ ছেড়ে যাব। ভাবছি জানা অজানা আত্মীয় বন্ধু , পরিবার পরিজন সব ছেড়ে চলে যাব ! ছেড়ে যাব আমার ঢাকা , ছেড়ে যাব ক্রিসেন্ট লেকের জল , আকাশ আলো করা কৃষ্ণচূড়া , শান্তিনগর , বেইলি রোড , ছেড়ে যাব মহিলা সমিতি , পুরানো ঢাকা , বই মেলা , শহিদ মিনার ! কেবল বুকের ভেতর এমনতর যাই যাই হারানোর সুর বেজে চলেছে !

তখন বৈশাখের এক দুপুরে শিল্পকলা একাডেমীতে বসে আছি অধ্যাপক সাঈদ আহম্মদ এর রুমে অথবা তিনি সেখানে এসেছিলেন ,ভালো করে মনে আজ করতে পারছি না ! অধ্যাপক সাঈদ আহমদ ছিলেন ভাস্কর হামিদুর রহমানের ভাই। ওনারা ছিলেন অনেক গুলো ভাই ! বইতে এতোবছর আগে যা পড়েছিলাম, অস্পষ্ট মনে পড়ছে ওনাদের বাসা ছিল সম্ভবত পুরানো ঢাকার আশেক লেন, আওলাদ হোসেন রোড এইসব দিকে।

সেখানে নভেরা আর হামিদ এসে ছিলেন। লন্ডন থেকে দেশে ফিরে কাজ কর্ম করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন কিন্তু কিছু কিছু কাজ তখন কমিশনের ভিত্তিতে করলেও ঠিক যেভাবে নভেরা চেয়েছিলেন তা হয় নি । তিনি চেয়েছিলেন আর্ট কলেজে একটি আলাদা বিভাগ খুলে পড়াবে কিন্তু সেটাও সম্ভব হয় নি ।

Novera 3সাঈদ আহমদের মুখে শুনছি নভেরার কথা ! আর প্রচণ্ড কৌতুহলে জানতে চাইছি সাঈদ আহম্মদের মায়ের কথা! যিনি সেই সময়ের পুরান ঢাকার সমাজকে তোয়াক্কা না করে দৃঢ়তার সাথে ছেলে ভাস্কর হামিদ ও নভেরাকে একসাথে থাকতে দিয়েছিলেন। নভেরার স্লিভলেস ব্লাউজ পরা, বা হামিদের সাথে একত্র বসবাস করা, স্বাধীনচেতা ওই মেয়েটিকে মেনে নিতে সেই ১৯৪৫-৫০ সালে যে মায়ের সংস্কারমুক্ত মনে কোনো প্রশ্ন আনেনি ! আমার ইচ্ছে হয়েছিল কেবল নভেরা নয়, সাঈদ আহম্মদ বা হামিদূর রহমানের মায়ের পায়েও মাথা ঠেকাই। উনি আজ আর নেই তবু কথা ছিল ওনার সাথে একদিন যাবো ওনাদের পুরানো ঢাকার বাড়ী দেখতে। সে আর হয়নি আমার নিজের দেশ ছাড়ার কারণে!
কিন্তু কতজনাকে যে বলেছি এই অসাধারণ বইটি পড়তে। কত আত্মীয়-স্বজনকে বলেছি, তাদের বাচ্চাদেরকে ছোট্টবেলায় মাটির পুতুল বানানো শেখাতে যেমনটি শেখাতেন নভেরার মা নভেরাকে। কত বাচ্চাকে নাম রাখতে চেয়েছি নভেরা ! আর সেই যে ১৯৫৯ -৬০ এর দিকে সে দেশান্তরী হল কাউকে, আর জানালো না তাঁর অভিমান ! সেই বেদনায় কত না রাত কেঁদেছি আমিও ! আমারো দেশান্তরী হবার পেছনে সেই রকম একটা অভিমান কাজ করেনি কি ! আমিও কি দেশ ছাড়ার আগে নভেরা পড়িনি!

আজ সেই পলাতকা, আজ সেই আলো হাতে আঁধারের যাত্রী চলে গেলেন চিরঅন্ধকারে! বিশ্বাস করিনি বলে কেবল নিউজের লিংকটি খুঁজছিলাম ! গেলো বছর প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের সামনে থেকে দিনের শেষে চন্দ্রালোকে সেই নৌকা বা বাতোমুশ ভ্রমণের সময় মনে মনে বলিনি কি নভেরার নাম ! পারিসের দিনগুলোতে আমার দু’ চোখ কতবার যে খুঁজেছে তাঁকে ! আজ কেবল মনে হচ্ছে কোথায় হারিয়ে গেলে ‘ও আলোর পথ যাত্রী !!!

লেখক পরিচিতি: নাট্যকর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.