প্রতিবাদ কি কেবল কথায়, চর্চায় নয়?

Talk Show 1লীনা পারভীন: সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদমুখর হয়েছে যে ইস্যুটি নিয়ে তা হচ্ছে বৈশাখী আয়োজনে নারীর উপর আক্রমণ বা নারীকে অপমান করা। সারাদেশেই সরব দেখেছি এর বিরুদ্ধে। এমনকি আমাদের মিডিয়াতেও বিষয়টি নিয়ে এখনো চলছে আলোচনা, সমালোচনা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধের ঘোষণা।

কিছু কিছু চ্যানেলতো রীতিমতো ঘোষণা দিয়েছে এধরনের ঘটনাকে প্রতিহত করার। এটি খুবই একটি ইতিবাচক দিক এবং এই প্রতিবাদী চরিত্রের জন্যই আমরা বাংলাদেশীরা গর্বিত। কোন ঘটনাই প্রতিবাদহীনতায় আমরা ছাড়ি না। এই যে প্রতিবাদী চরিত্র, এটিই জাতি হিসাবে আমাদেরকে দিয়েছে অনেক অর্জনের ইতিহাস। সমাজবিরোধীরা যতই চেষ্টা করুক, সফলতা দিন শেষে সাধারণ কিন্তু সচেতন ও প্রতিবাদীদেরই হয়েছে।

কিন্তু এর মধ্যেও একটি বিষয় খুবই লক্ষ্য করার প্রয়োজন রয়েছে। সেটি হচ্ছে আমাদের দেশের এখন সবচেয়ে বেশি দর্শকনন্দিত এবং ব্যবসা সফল টেলিভিশন প্রোগ্রাম হচ্ছে, টক শো। এমনকি এক সময়কার সবচেয়ে সফল প্যাকেজ নাটকের চেয়েও বেশী জনপ্রিয়তা এই অনুষ্ঠানের। আমি এটিকে সমাজের অগ্রগতির জন্য খুবই ইতিবাচক বলে মনে করি।

এই অনুষ্ঠানে আমরা পেয়েছি অনেক পরিচিত অপরিচিত মুখের সন্ধান, তাদের চিন্তা-চেতনার সাথে আমাদের পরিচিতি ঘটেছে। চিনেছি কে, কোন এঙ্গেলে চিন্তা করছে বা কে অগ্রগতির সৈনিক আর কে অগ্রগতিকে টেনে ধরতে চায়।

বিপদজনক যে ব্যাপারটি তা হচ্ছে, এইসব অনুষ্ঠানের আলোচক নির্ধারণে এসব ব্যক্তির পিছনের ইতিহাস কেউ বিবেচনা করে না।

যে লোকটিকে দিয়ে আমি সমাজের মানুষকে নীতিবাক্য শোনানোর চেষ্টা করছি, সে ব্যক্তিগত জীবনে কেমন! তাঁর চারিত্রিক কোন দিকটি, কিভাবে অনুকরণীয়? আমি এই ব্যাপারে সন্দেহের দৃষ্টি রাখতে বাধ্য হচ্ছি।

আমরা আশা করি, আমাদের চ্যানেলগুলি কাজ করবে সমাজের অগ্রগতির জন্য, দেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি  ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে কাজ করবে। কারণ আমরা অন্যের কথাতে খুব অল্পতেই প্রভাবিত হই।

অনেকে হয়তো ভাবছেন, আমিতো কোনো বুদ্ধিজীবী না, বা আমার কথার কোন প্রভাব তো সমাজে নেই, তাই আমিই বা এসব নিয়ে কথা বলার কে? আমার কথার মূল্যই বা কার কাছে আছে!

আমি লিখছি নিজের বিবেকের তাড়নায়, কেউ মানুক আর না মানুক।

আমাদের দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলি সবসময় দেশের যেকোনো নেতিবাচক ঘটনায় সোচ্চার থাকে। যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঘোষণা করে তাদের লড়াই এর কথা বা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা। আশাবাদী কথা, কিন্তু তাদেরকেও বিবেচনা করতে হবে এ শুধু ঘোষণা দেবার বিষয় নয়, এর প্রকাশ হতে হবে দৈনন্দিন চর্চায়।

এমনই একজন টকশো আলোচক হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তিনি নিয়মিত প্রায় প্রতিটি চ্যানেলেই কথা বলে থাকেন। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এই শিক্ষক এক সময় যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তা ছিলো প্রমাণিত। সেই অভিযোগে তাকে বরখাস্ত (সাসপেন্ড) (সেই সময়কার খবরের কাগজ খুঁজলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে) করা হয়েছিল।

শুধু তাই নয়, তিনি বিশ্ববিদ্যলয়ে একজন জামাতী লবির শিক্ষক বলে পরিচিত এবং তিনি খুবই সোচ্চারও এই বিষয়ে। তাহলে আমার প্রশ্ন, এরকম একজন ব্যক্তিকে কি আমরা সমাজে আদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি?

আমি জানিনা এর উত্তর কি হবে! কিন্তু এটি কি আপনাদের ঘোষিত আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক নয়? একজন প্রমাণিত যৌন নিপীড়ক, যে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাস করে না, তাকে কেমন করে প্রতিদিন টেলিভিশনে দেখানো হয়?

সম্প্রতি দেখলাম তিনি তার স্বরূপে প্রকাশিত হয়ে টকশোতে হাতাহাতির মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন। আদর্শ বিবর্জিত ব্যক্তিদের যখন সমাজের আইকন হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় তখন কিন্তু পরিণতি এমনই হবার কথা।

প্রগতির কথা কেবল মুখে বলার ব্যাপার নয়, প্রমাণ করে দিতে আপনার নিত্য কাজের মধ্যেও আপনি সেটি চর্চা করেন।

একজন সাধারণ দর্শক হিসাবে আমাদের প্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কাছে প্রত্যাশা আপনারা যাকে তাকে বক্তা করে দিবেন না প্লিজ। যাকে তাকে ডেকে এনে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে দিবেন না। আমাদের দেশে এখন আপনারা একটি ইন্সটিটিউশন, যারা সমাজে মতামত গঠন করে, রাষ্ট্রকে গঠনমূলক পথে চলতে সাহায্য করে। তাই আপনাদের কথা ও কাজে আমরা চাই একটি ইতিবাচক যোগসূত্র।

লীনা পারভীন, উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.