হিজাবিদের সেক্স অ্যাপিল কি কেবলই চুলে ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া

girls 3সুমন্দভাষিণী: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লুসিফার লায়লা একটা লেখা লিখেছেন হিজাবিদের সেক্স অ্যাপিল নিয়ে, আর সেটা ছাপা হওয়ার পর অনলাইনে প্রতিক্রিয়ার যে বন্যা বইছে, তাতে পজিটিভ-নেগেটিভ দুটোই উঠে এসেছে। কিন্তু নেতিবাচক দিকটিই বেশি। অনেকেই সহ্যই করতে পারছেন না হিজাব নিয়ে এই লেখাকে।

লেখক নিজে জানিয়েছেন, তাকে ইনবক্সে গালিগালাজ, হুমকি সবই শুনতে হচ্ছে এই লেখাটির জন্য। তবে সর্বাধিক পঠিত এবং সর্বাধিক মন্তব্যসম্বলিত এই লেখাটি আমার মতে, একটা সময়েরই প্রতিবিম্ব। যে সময় পচন, স্খলন, সংস্কৃতিহীন মানসিকতারই লালন করছে।

পজিটিভভাবে যারা মন্তব্য করেছেন, তারা লিখেছেন, অনেক শক্তিশালী, সময়োপযোগী এবং সুন্দর-সরল একটা লেখা। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে হিজাব নিয়ে ট্রেন্ড চালু হয়েছে, তাতে একটা পাল্টা আঘাত দেয়া গেছে এই লেখায়। বলেছেন, বাঙালী সংস্কৃতির কোথাও হিজাবের প্রচলন কোনদিনও ছিল না। মায়েরা শাড়ির আঁচল টেনে আর মেয়েরা ওড়না দিয়েই তাদের মাথা ঢাকতেন প্রয়োজনে, সেখানে বাড়তি কাপড়ের প্রয়োজন হতো না। ধর্ম-কর্মও যে হতো না তখন, তা নয়। তাহলে এখন কেন এই বাড়াবাড়ি রকমের হিজাব চর্চা চলছে দেশে? হঠাৎ কী এমন পরিবর্তন ঘটে গেল দেশে যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে ঢুকতে হচ্ছে উগ্র, ধর্মান্ধ এক খোলসে!

অধিকাংশই বলছেন, এটা স্ববিরোধী মন্তব্য। কারণ হিজাব নিয়ে কথা বলা মানেই মেয়েদের পোশাক নিয়ে সেই পুরনো কাসুন্দিই ঘাটানো। মেয়েদের পোশাক যে কখনই নিপীড়নের মূল কারণ নয়, তারই বিরোধিতা হয়েছে এই লেখায়। অনেকেই আবার হিজাব এবং ধর্মকে সমান্তরালে বসিয়ে একে আঘাত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

লেখাটি ছাপা হওয়ার পরপরই ভাইরাল হয়ে যায় অনলাইনে। এতোবার শেয়ার হয় এবং এতো এতো মানুষ লেখাটি পড়েন যে প্রতিক্রিয়ার সবগুলো একটা জায়গায় তুলে আনা সম্ভবপর হচ্ছে না।

কয়েকটি প্রতিক্রিয়া তুলে ধরছি, যেগুলো কিনা মেয়েরাই করেছে হিজাবিদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে। এখানে হিজাব এবং ওড়না পরাকে মারাত্মকভাবে মিশ্রণ ঘটিয়ে ফেলা হয়েছে।

একজন লিখেছেন, আমার উনার লেখার ভঙ্গি মোটেও ভালো লাগেনি। হিজাবিরা কেন হিজাব করবে, কিভাবে করবে, সম্পূর্ণ তাদের ব্যাপার। আমরা জাজ করার কেউ না। ধর্মীয় দৃষ্টিতে উনি যদি গুনাহগার হনও, সেটা আল্লাহর কাছে হবেন, আমার কাছে না। কেউ ফ্যাশন করে কম কাপড় পড়তে পারলে কেউ ফ্যাশন করে হিজাবও পড়তে পারে। হতে পারে সে ধর্মের জন্য পড়ছে না, হয়তো অন্য কারনে পড়ছে। সেটা আমি জানিনা এবং আমার জানার কথাও না। সেটা জিজ্ঞাসা করাও আমার মতে খুব একটা ভদ্র আচরনণনা। তবে হ্যাঁ, হিজাবের সাথে অনেক সাজসজ্জার প্রচলন আমাদের সোসাইটিতে আগে ছিলো না। তাই এখন অনেকেই একবার দেখলে আরেকবার কৌতূহলী হয়ে তাকায়। তবে কুজনের চোখ সব রকমের মানুষের উপরই। এখানে হিজাবি, নন হিজাবির ব্যাপার নাই।

অপর একজন লিখেছেন, লেখাটা পড়ে যা মনে হলো, একটা মেয়ে হিজাব পরে ঘুরুক আর বিকিনি পরে ঘুরুক, মেকাপ করুক অথবা না করুক, ওইটা তার প্রবলেম। একটা ছেলের যেমন এতো ত্যানা প্যাঁচানোর অধিকার নাই, একটা মেয়েরও নাই। পুরা জিনিসটা পরে মনে হয়েছে, ঊনার হিজাবিদের নিয়ে এলার্জি আছে। এখানে ধর্ম-হাদিস কেন টানা হলো বুঝলাম না। আর ঊনি যদি এতোই হাদিস-কোরআন পড়ে  থাকেন, তাহলে এটাও জানা উতি, পরচর্চা/পরনিন্দা একদমই ‘ফরবিডেন’। (এই কমেন্টে ৩৫টা লাইক পড়েছে, যা অন্য কমেন্টের তুলনায় বেশি)।

এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট থেকে: গত কয়েকদিন ধরে লেখাটা এত বেশী হোমপেজে ঘোরাঘুরি করছে যে কিছু কথা আর চেপে রাখতে পারলাম না…

“লেখিকা অভিযোগ এনেছেন বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে সাধারণ সাজের বা বড় গলার ব্লাউজ পরে যারা গিয়েছেন তাদের দিকে তেমন কেউ তাকায়নি, তাকিয়েছে হিজাবিদের দিকে!!! কারণ তারা ঠোঁটে-চোখে-গালে রঙ মেখে বিজ্ঞাপনের ছোট কাপড় পরা মেয়েটিকেও হার মানিয়ে #পহেলা_বৈশাখ উদযাপনে এসেছে !!! তারা বলতে চেয়েছে লুক এ্যট মি!!! ভেরী ব্যাড, ভেরী ব্যাড!!!

মাথায় এক টুকরা কাপড় পেঁচালেই যেমন হিজাব হয় না, হিজাবের সাথে আঁটসাঁট কাপড় পরলে যেমন হিজাবের অবমাননা হয়, ইসলাম যেমন শুধু চুল ঢাকাকেই পর্দা মনে করে না, তেমনি রূঢ়ভাবে কোনো কিছুর যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টাও কাউকে সচেতন প্রমাণ করে না….

#পহেলা_বৈশাখ আমাদের একটি সার্বজনীন উৎসব। এখন যদি স্পেসিফিকলী বৈশাখের কথা উল্লেখ করে কেউ এহেন বিশ্লেষনে যেতে চায় তাহলে সে পক্ষান্তরে তাদেরই সায় দিচ্ছেন যারা বৈশাখকে#বিধর্মীদের_উৎসব প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছে।  ভেবে দেখেন, এই মুসলমান মেয়েগুলো ঐদিন মৌলবাদকে পাত্তা না দিয়ে বাঙালী সেজে অংশগ্রহণ করেছিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে….টিএসসি’র ঘটনার প্রতিবাদে আপনারাই বলেছেন#পোশাকের_কারণে_যেন_কোনো_মেয়ে_হ্যারাসমেন্টের_শিকার_না_হয়… আপনাদের সাথে গলা মিলিয়ে একই প্রতিবাদ আমরাও করেছি…

যেই প্রতিবাদ করে এসে যখন লিখতে বসেছেন আপনার কি মনে হয় না সেই একই কাজ আপনিও সামান্য ভিন্নভাবে করলেন???

আপনার লেখায় প্রভাবিত হয়ে যদি কেউ এখন যার যার দৃষ্টিতে সেক্সি হিজাবিদের হ্যারাস করে তাহলে তার দায়ভার কে নেবে???

#নব্য_মুসলমানেরা যদি আপনার ধর্মবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে তাহলে আরও যেসব হারাম কাজ যেগুলো হয়তো আপনি নিজেও করেন সেগুলো কিভাবে আপনার ধর্মবোধকে অক্ষত রাখলো তা আমার বোধগম্য হয়নি…

যে যুগ বদলের কারণে আপনি বদলেছেন সে একই কারণে কি অন্যদের বদলানো অযৌক্তিক???

আপনার লেখা যুক্তিহীন না, অবশ্যই ইসলামিক পর্দাপ্রথা আর এখনকার পর্দাপ্রথার মিল খুবই সামান্য….

কিন্তু আপনি ভুল করেছেন সবাইকে এক পাল্লায় দাঁড় করিয়ে আর পহেলা বৈশাখকে টেনে এনে…কোনো এক ধর্ষকের উপর ক্ষোভ থেকে আমি যদি বিশ্বাস করে বসি সমগ্র পুরুষ জাতি ধর্ষক, তবে সেটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে” ???

কয়েকজন লিখেছেন,

“ লেখাটা পরে আমার ব্যক্তিগত মতামত… ঊনার লেখাতেও ঊনি ঘুরে-ফিরে পরোক্ষভাবে নারীর পোশাক কেই দায়ী করলে এই ঘটনার জন্য। হতে পারে ধর্মীয় দিক থেকে ঊনার এই লেখাটির গুরুত্বপূর্ণ মর্মার্থ আছে, কিন্তু এই সময়ে এই লেখাটা একেবারেই আগুনে ঘি ঢালার মতই। কেননা আমার ফ্রেন্ড লিস্টে অনে কেই দেখলাম এই লেখাটির সাপোর্ট করছে। আর এই যুক্তিকে এখন সাপোর্ট করা মানে অপরাধীদের ওপর যেই প্রেসারটা তৈরি হচ্ছে সেটা কমিয়ে আনা। আমি বুঝলাম না ঊনি একটা উন্নত দেশে অবস্থান করার পরেও কেন এরকম একটা যুক্তি দাঁড় করালেন…”!

“ওরা যদি স্টাইল করার জন্যই পরে, তাতে সমস্যা কি! মাথায় যেটা পেঁচায়, সেটা তো ওড়নারই আর একটা ফর্ম। যার খুশি ওড়না পরবে, যার খুশি পরবে না, যার খুশি মাথায় পেঁচায় রাখবে, যার খুশি গলায় ঝুলায় রাখবে, মন চাইলে কেউ যদি কোমরেও পেঁচায় রাখে, কার কি”?

“শ্যাশ ম্যাশ ঐ ওড়না…সবার এত এত কথা বলার থাকে এই ওড়না নিয়ে… আরে বাবা যার ইচ্ছা সে মাথায় দিবে যার ইচ্ছা সে পায়ে দিবে… মেকাপ করে/না করে দিবে… কার কি”!

“ফালতু জাজমেন্টাল লেখা………কোন মেয়ে কিভাবে মাথাটা ঢাকবে কি ঢাকবে না, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার…….এইভাবে বলার মানে হল সেই পোষাককেই দোষ দেওয়া”।

বিভিন্ন থ্রেডে প্রতিক্রিয়াকারীদের মধ্যে অনেকেই খুব ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা করেছেন লেখকের। যা শোভন, সৌজন্যবোধ, নীতিবোধ সবকিছুকেই ছাড়িয়ে অন্য এক বাংলাদেশের ইঙ্গিত দেয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.