ডাইনি হত্যা: নারী নিধনের প্রাচীন ঘৃণ্য কৌশল

Witch 2সারিতা আহমেদ: ডাইনি বা উইচ কী? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে এলিজাবেথান যুগে। যখন শেক্সপিয়ার অনেক নাটক লিখছেন এই ডাইনি চরিত্র নিয়ে।

সে সময় ‘ডাকিনীবিদ্যা’ নামক একটা কুসংস্কার বিদ্যার চর্চা হতো। এই নিয়ে অশিক্ষিত মহল্লাই শুধু নয়, সাহিত্যমহলও খুব উত্তেজিত ছিল। নানা রম্য রচনায়, কল্পনায় ডাকিনী দের ফুটিয়ে তুলেছেন কবি-সাহিত্যিক-নাট্যকারেরা।

এর পরে প্রাক আধুনিক যুগে এলো ‘The Great Witch Craze’ নামে একটা পর্ব, যাতে উত্তর আমেরিকার নব্য আধুনিক ইউরোপিয়ান কলোনিগুলোতে এর চর্চা শুরু হলো নতুন করে।

মূলত ক্রিশ্চিয়ান বিশ্বাসে স্যাটান বা শয়তানের উপাস্য হিসেবে এই ডাকিনীর প্রচলন। এরা নাকি ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদু টোনা-টোটকা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, মাঝে মাঝে নাকি নরহত্যাও করে।

এইভাবে ধর্ম নিয়ে এল শয়তান, ঈশ্বর ও তার মাঝে লটকে থাকা এক অদ্ভুত শক্তি ‘ডাইনি’ কে। এটা কিন্তু ওই বিদ্যের কোথাও পাওয়া যায় না যে, শুধুমাত্র মেয়েদেরকেই এরম উপাসনা করতে হবে ! যে কেউ ভগবান না মেনে শয়তান মানতে পারে, পূজা করতে পারে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্রথম থেকে মানে সেই পঞ্চদশ শতক থেকেই এই বিদ্যায় মেয়েদেরই ডাইনি হিসেবে প্রতিপন্ন করা হলো। আজ ২১ শতক চলছে। মাঝে কেটে গেছে এতগুলো শতক। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু সেই ১৫ শতকেই আটকে আছে মেয়েদের প্রতি। এখনো দেখা যায় , যে কোনো ভূতের চরিত্রে, সিনেমায়, নাটকে মেয়েদেরই সাদা শাড়ি পরিয়ে, জোম্বি মার্কা লুক দিয়ে পেত্নী বানানো হয়।

‘শয়তান ‘ শব্দটা পুংলিংগ শুনতে লাগলেও, ‘ডাইনি’ শব্দটা কি করে যেন স্ত্রী লিংগ হয়ে গেল। এর মধ্যে ফেমিনাইন কিছুই না থাকলেও সমাজ তার নিজের স্বার্থে একটা কুসংস্কারাছন্ন রিচ্যুয়ালকে দিব্যি মেয়েদের নিজস্ব বলে ট্যাগিয়ে দিল। ভূত-জীন-আত্মা সব কেন যেন মেয়েদের ঘাড়েই বসতে ভালবাসে !

June 2014, the U.N রিপোর্ট দিয়েছে একটি প্রশ্নের উত্তর সহ, ““Did you know violence and abuse against elderly women, the world’s fastest growing demographic group, range from sexual violence, property grabbing, financial abuse and increasingly, extreme violence against older women accused of witchcraft?”

— Witchcraft accusations that are used to justify extreme violence against older women are reported in 41 African and Asian countries…”

আফ্রিকা ও এশিয়াসহ সারা বিশ্বে ৪১টি দেশের মেয়েরা এই উইচ ক্রাফটের শিকার।

কাল্পনিক ডাকিনীবিদ্যা কি করে যেন সমাজ জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে গেল, বিশ্বের নানা প্রান্তে। যে আমেরিকা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই, সেখানে প্রথম শুরু হল ডাইনিরূপী মেয়েদের পুড়িয়ে মারার যজ্ঞ। আর ভারত তথা উপমহাদেশ, যেখানে নানা অনুভূতির চাষ হয়, নানারঙের বিশ্বাসের হাট বসে, লুফে নিল আমেরিকার উচ্ছিষ্ট এই কুবিদ্যা চর্চা।

এর শিকার হলো, বিধবা নিরিহ খেটে খাওয়া কাঠকুড়ানি শ্রেণির নারীরা। গ্রামের একপ্রান্তে যাদের বাস। ‘সভ্য’ গ্রামসভা এদের গ্রামছাড়া করতে উঠে পড়ে লাগলো, এবং মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ডাইরিয়া-কলেরা-হিস্টিরিয়া ইত্যাদি রোগকে এইসব নারীর সংস্পর্শের ফল হিসেবে মানতে শুরু করল। মেয়েদের পুড়িয়ে মারা শুরু হলো।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার ২০১২ রিপোর্টে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায় , ‘প্রায় ১৭০০ নারীকে হত্যা করা হয়েছে এই ডাইনি বিদ্যার শিকার হিসেবে গত ১০ বছরে (১৯৯১ থেকে ২০১০ এর মধ্যে)।’ এটা শুধুমাত্র ভারতের হিসেব (সংখ্যাটা যে আরো বেশি তা সহজবোধ্য ) । তাহলে সহজে অনুমেয় বিশ্বে এই সংখ্যাটা কত!

আল-জাজিরার ডকুমেন্টারি অনুযায়ী ভারতের প্রধানত রাজস্থান, ঝাড়খন্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে এই ডাইনিবিদ্যার সহজ বলি হয় মেয়েরা। এছাড়াও প্রায় ১১ টি রাজ্যে এই নারীনিধন যজ্ঞ চলে প্রতিবছর ।  পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর এসব জায়গায় নির্বিঘ্নে আজো চলছে এই নারীবিদ্বেষ প্রথা । নেট থেকে মানুষ খোঁজ নিচ্ছে ডাকিনি বিদ্যের হাল হকিকত, কি করে আজকের যুগে একে প্রয়োগ করা যায়, এসব প্রশ্নের উত্তরও গুগল দিচ্ছে ।

আন্তর্জালিকার দুনিয়াও তো মানুষেরই (নাকি পুরুষের !) বানানো।

গোবিন্দ কেলকর,  লেখক : ‘Gender Relations in Forest Societies in Asia’  এবং বরিষ্ঠ পরামর্শদাতা UN Women, South Asia office, New Delhi -র মতে,  “সেইসব মহিলা যারা একলা বিধবা জীবন কাটাচ্ছেন, স্বনির্ভরভাবে, হয়তো কিছু জমির মালিকানা আছে, সেইসব মেয়েরা খুব সহজে গ্রামের খেপ পঞ্চায়েতের নজরে পড়ে মূলত মানুষের লোভের শিকার হন। তার সাথে যুক্ত হয় প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস ও কুসংস্কার । সব মিলিয়ে পুরুষের কোপে পড়ে ওই মহিলারা ‘ডাইনি’ বলে  চিহ্নিত হন ।”

বস্তুতই, সমাজ মেয়েদের কেবল মিথ্যা আশ্বাস, মিথ্যাচারিতা আর মিথ্যের সংসার ছাড়া আর কি দিয়েছে ?

যেকোনো বিদ্যে যখন তার কোনো ইতিবাচক প্রভাবের প্রচার দরকার হয়, তখন মানুষ ‘এটা পুরুষের জন্য, পুরুষের দ্বারা ‘ বলে প্রচার করে । আর কোনো কিছু যখন নেতিবাচক প্রভাব প্রচারের দরকার পড়ে, তখন অবধারিত ভাবে তা ‘নারীদের দ্বারা ‘ বলে প্রচারিত হয় ।

অনেকে বলবে, এগুলো গ্রামেই হয় অশিক্ষিতদের সমাজে। কিন্তু ভায়া,  গ্রাম থেকেই তো শহর তৈরী হয়েছে ।

কুসংস্কার কি শহরে কম? আমার তো মনে হয় সবচেয়ে বেশি। পেটের চিন্তা গ্রামের লোকেদের তবু অন্যত্র ব্যস্ত করে রাখে , কিন্তু সুখি সভ্য শহুরে মস্তিষ্ক ‘শয়তানের কারখানা ‘ হিসেবে নানা অকাজ কুকাজে সর্বদা উৎসুক থাকে ।

সুতরাং ওইসব চিন্তাধারা আরবান জীবনেও ছড়াতে কি খুব বেশি সময় নেয় ? খারাপ জিনিসের প্রভাব ও ছড়ানোর গতিবেগ দুইই কিন্তু বেশি ।

Witch 3ঠিক যেমন আমেরিকার খারাপগুলো (ডাইনিবিদ্যাই শুধু না, অন্য অনেক কিছু) আমরা কত সহজে শিখে নিয়ে ব্যবহার করতে পারছি আমাদের সভ্যতায়।

সরকার এই নিয়ে অনেক কিছুই করছে, সচেতনতা বাড়নোর অনেক উদ্যোগ চলছে , কিন্তু ফলপ্রসু হচ্ছে কি? এই উইচক্রাফটের নামে নারী নিধন বাড়ছে। সম্পত্তির দখলের জন্য সাধারন নিরিহ মেয়েদের এভাবে পুং আচারের বলি হতে হচ্ছে। ইন্ধন যোগাচ্ছে শিক্ষিত মাথারা।

এর হাত ধরে, ধর্মানুভূতির আরেক সাইড-এফেক্ট ‘অনার কিলিং’ আসছে, যার বলিও অবধারিতভাবে নারীরাই।

মেয়েরা, সে নিম্নবর্গিয় হোক, উচ্চবর্গিয় হোক, মধ্যবিত্ত হোক, স্বাধীনভাবে একটি স্বনির্ভর জীবনযাপন করবে, স্বামী নামক প্রভুটির কোনো সাহারা ছাড়া – এটা বড্ড বিষ বিষ লাগে সমাজের তাবৎ অভিভাবকদের।

সুতরাং যে কোনোভাবেই হোক মেয়েটিকে নিচু দেখাও, খাটো দেখাও, অসৎ দেখাও, নইলে চরিত্রহীন দেখাও।

ধর্ম-বিশ্বাস, কুসংস্কার এর সাথে যদি নারী চরিত্রহীনতার চানাচুর মিশিয়ে দাওয়াই হিসেবে সমাজের মস্তিষ্কের কোষে কোষে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তা বেশ একটা চলনসই চিজ হয়।

এইজন্যই, আজকের এই পৃথিবীতেও হলিউড, বলিউড সব ‘উডে’র সিনেমাতেই মেয়েরাই সাদা কাপড়ের ভূতনী হয়। নায়কের মারামারি যতই শত্রুপক্ষের সাথে হোক, পেছনের আসল ভিলেন বানানো হয় একটি মেয়েকেই, যাকে ‘নায়িকা’ বলে। কল্পনার জগত তো বাস্তবের ছায়া থেকেই, আবার উল্টোটাও ঘটে।

তাই যতই শিক্ষিত হোক নারী শেষমেশ সে কিন্তু পুরুষের সমাজে পুরুষের হাতের কাঠপুতুল মাত্র। তার জন্ম থেকে, বড় হওয়া থেকে, শিক্ষাদীক্ষা থেকে, রাঁধাবাড়া থেকে, বিয়ে থেকে সংসার থেকে, মৃত্যু পর্যন্ত জীবনচক্রের প্রতিটা ধাপে লাটাইয়ের সুতো কিন্তু ধরে রাখে পুরুষকর্তা।

তাই পুরুষকে নয়, নারীকেই শুনতে হয়, ‘তুই হাজব্যান্ডের আন্ডারে, নাকি উনি তোর আন্ডারে ?’ উত্তর কিন্তু কিছুতেই সেকেন্ড অপশনের জন্য ভ্যালিড হয় না।

আমরা মেয়েরা সেই ‘সেকেন্ড সেক্স’ / ‘ অর্ধেক আকাশ’ হিসেবেই থেকে যাই, ইকুয়াল সেক্স হিসেবে নয়, খোলা আকাশের মুক্ত বিহঙ্গের মত নয় !

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.