পর্নোগ্রাফি- নারীর বিনির্মাণে ভয়ংকর এক যৌন সন্ত্রাস

Draupodi 1শামীমা মিতু: বাংলা পর্নোগ্রাফিতে পুরুষের সঙ্গে একাধিক নারীর সঙ্গে একই সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হতে দেখা যায়। পুরুষ চাইছে বলেই একাধিক নারী আসছে, কিন্তু নারীর সঙ্গে একাধিক পুরুষ একই সঙ্গে যৌনক্রিয়া করছে সাধারণত বাংলা পর্নোগ্রাফিতে দেখা পাওয়া যাবে না (কদাচিৎ দেখা যেতে পারে, তবে তা পাশ্চাত্যের অনুকরণে, যেখানে নারীর স্বাধীন জীবনযাপন বহুলাংশে প্রতিষ্ঠিত।) পুরুষতন্ত্রী বাঙ্গালী গর্ব করে বলে, নারীরা সাধারণত ঈর্ষাপরায়ণ। সেই নারীরাই কেন পরস্পরকে ঈর্ষা করছে না পর্নোগ্রাফিতে?

তার কারণ পুরুষ এটির কেন্দ্রীয় দৃষ্টি। সে দেখছে এবং চাইছে নিজের আনন্দদান। সেই আনন্দের জন্যই আমদানি ঘটাচ্ছে একাধিক নারীর। এখানে নারীর আনন্দ লাভ মুখ্য নয়, পুরুষের আনন্দলাভই মুখ্য। যেহেতু পুরুষরাই পর্নোগ্রাফির লেখক এবং পাঠক। পুরুষরাই পর্নোগ্রাফির লেখক-পাঠক বলে এর কোনো নারীতান্ত্রিক দিক তৈরি হয়নি বাংলা ভাষায়। তাই মেয়েদের জন্য বাংলায় কোনো পর্নোগ্রাফি নেই, কোনো নারী পর্নোগ্রাফি লেখেনও না।

পর্নোগ্রাফিতে নারীকে দেখার ভঙ্গী অসত্য, অবাস্তব বা অতিবাস্তব হলেও অবলোকনটি ভয়াবহ এবং সত্যি। পুরুষেরা মেয়েদের ‘দেখে’, ‘মাপে’, ‘মাল’ বলে। মানে ‘জিনিস’ বলে। আর এভাবেই শুরু হয় নারীর ‘শরীরের’ বিনির্মাণ। নারীর ‘ইমেজের’ বিনির্মাণ।

এসব বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে যখন বাস্তবের নারীর পথচলা, তখন পুরুষের চোখে উনিশ শতকে সে ছিল গৃহশোভা, বিংশ শতাব্দিতে সে হয়ে উঠছে বিছানার শোভা!

পর্নোগ্রাফি দেখায় পৃথিবীটা একটা সেক্সের মুক্তাঙ্গন। যেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য কামাতুর নারী পুরুষ যাদের একমাত্র প্রায়োরিটি কামের চরিতার্থ । বিশেষ করে প্রতিটি নারীই মানুষ খেকো, উত্তপ্ত, শরীর থেকে পদ্ম ঝরে, অসম্ভব আকর্ষক। নারী বিষয়ক যেসব তথ্য পর্নোগ্রাফিতে পেশ করা হয় সেগুলো অবাস্তব, ধোয়াটে ও অবৈজ্ঞানিক।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, আশপাশের ১৫-২০ জন যুবকের মাথা খাওয়া বউদির কাহিনী, বৃদ্ধের সঙ্গে বালিকার, বাবা-মেয়ে, মা-ছেলে, ভাই- বোন, শ্বশুর-বউমা, শাশুড়ি-জামাইয়ের যৌন সম্পর্ক। যা ভয়ংকর পুরুষতন্ত্রের দানবীয় প্রকাশ।

পর্নোগ্রাফি আমাদেরকে তথাকথিত “বেশ্যা” এর নয়া ডেফিনিশন এবং ডাইমেনশন দেখিয়েছে। পর্নোগ্রাফির জনরা, সাব-জনরাই মা-বাপ থেকে স্কুল গার্ল, সেলস গার্ল, আর্মি থেকে আমলা কোনো নারীই বাদ যায় না। পর্নোগ্রাফি এই ফ্যান্টাসির জন্ম দেয় যে, রাস্তায় যেতে যেতে, অফিসে বসে বসে, বাড়িতে শুয়ে শুয়ে হঠাৎ করে অজানা অচেনা মানুষের সাথে যৌনতা শুরু করে দেওয়া যায়।

নারী সে কর্পোরেট চাকুরে হোক, জজ হোক, ডাক্তার হোক বা আর যাই হোক না কেন, তার কতিপয় বিশেষ ভঙ্গিমাই তাকে বেশ্যায় রূপান্তর করতে যথেষ্ট। নো ম্যাটার হোয়াট শি উইয়ারস, ইট ইজ দ্য ইনটেনশন হুইচ ইজ ফোকাসড ইন ইচ পর্ন ফিল্ম। ওখানে বিকিনি আর আর্মির ইউনিফর্ম একাকার হয়ে যায়, একাকার হয়ে যায় মিনি স্কার্ট থেকে বোরকা। চরম কাল্পনিক রাজ্যের ওইসব নারীরা তাই জামা গায়েও যেমন, জামা ছাড়াও তেমন, বিশেষ পার্থক্য নাই।

ধর্ষনের ‘পোশাকতত্ত্ব’র মতো পর্নোগ্রাফির পুরুষ লেখক পাঠকদের নৈতিকতায় সোপর্দ করে এভাবে, যেন সে খারাপ মেয়েমানুষের ধ্বংস করছে অথচ নিজের পবিত্রতা বাচিয়ে রাখছে। তাছাড়া প্রতিপন্ন করতে চাইছে যে নারীর বারংবার থেকে থেকে অর্গাজম হয়। অতএব মেয়েমানুষ একের পর পুরুষের ধর্ষনের যোগ্য, যে পুরুষের অর্গাজম কেবল একবার ক্ষণিকের তরে হয়। তাই মহামূল্যবান!

Mitu
শামীমা মিতু

৬০ এর দশকের এন্টি পর্নোগ্রাফি মুভমেন্টের অন্যতম মুখপাত্র আন্ড্রিয়া ডোরকিন বলছেন, ‘ ‘পর্নোগ্রাফিতে যে ছবিগুলো তৈরি করা হয় তার মাধ্যমে যৌন বস্তু হিসেবে নারীকে হস্তগত করার পিতৃতান্ত্রিক প্রোপাগান্ডাটি আশ্রয় পায়। আর তাতে কব্জা করার কায়দা হিসেবে প্রয়োগ করা হয় যতরকমের যৌন সন্ত্রাস সম্ভব সবই।

খবরের কাগজে প্রতিবেদক যাকে পাশবিক অত্যাচার নামে ঢাকা দিতে চায়, তা পিতৃতান্ত্রিক অত্যাচার, যাকে শ্লীলতাহানি বলে ঢাকা দিতে চায় তা পুরুষতান্ত্রিক সন্ত্রাস। পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে যে বার্তাটি পাচার করা হয় তা হল, নারী আঘাত পেতে ভালোবাসে, চায় যে তার সঙ্গে জোরজবরদস্তি করা হক, তার দেহের অপব্যবহার হোক, পর্নোগ্রাফি জানায় যে, নারী ধর্ষিত, আহত, হৃত, বন্দি, আক্রান্ত হতে চায়, পর্নোগ্রাফি বলে যে, নারী অপমানিত, লজ্জিত, বদনাম হতে ভালোবাসে, নারী যদি বলে না তাহলে বুঝতে হবে হ্যাঁ। যাতনা পাবার জন্য হ্যাঁ, কষ্ট পাবার জন্য হ্যাঁ।’

পর্নোগ্রাফি প্রতিপন্ন করে নারী যেহেতু যৌনবস্তু তাই লজ্জা তার ভূষণ। পুরুষ ঐ মালের মোড়ক খুলে বস্তুটি পাবে। মালের মতন নারীও হাতবদলযোগ্য। এবং এটার অতীব ক্ষতিকর বার্তা হলো যে, নারী একটি স্বাভাবিক যৌন লুন্ঠনযোগ্য শিকার এবং সে তা ভালোবাসে।

পর্নোগ্রাফিতে চরিত্র থাকে না। লেখকের নাম গৌন, যৌনতা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না। বারবার বারবার বারবার যৌন যথেচ্ছাচার সত্বেও পুরুষ অশুচি হয় না কেননা পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় কেবল মৃত্যুতেই পুরুষের অশুচি ঘটতে পারে।

অন্যদিকে, নারীর অশুচিতার কেন্দ্র হলো তার দেহ, বিশেষ করে তার যোনি। অতএব নারীসত্বা বলে কিছু নেই। নেই বলে পুরুষের দায় কেবল নারীর দেহের প্রতি। নারীদেহের তথাকথিত শুচিতা নষ্ট হলেই পুরুষের অধিকার আছে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। পর্নোগ্রাফিতে নারীদেহের শুচিতা নষ্ট করার নানারকম খেলা হয় আর পাঠক/দর্শকরা সেসব খেলায় অংশগ্রহণ করে। পাঠক/দর্শকরা কিন্তু বিশুদ্ধ ও পবিত্র থেকে যায়। কারণ সেখানে নষ্ট, ভ্রষ্ট, অশুচি নারীর সম্মান, আত্মগরিমা ভুলুন্ঠিত হয়।

পর্নোগ্রাফিকে নিষিদ্ধ করার আইনগুলিও পুরুষের শুচিতা রক্ষার উদ্যেশ্যে প্রণীত, নারীর আত্মপরিচয়, গরিমা, ও সম্মান রক্ষার জন্য নয়। পর্নোগ্রাফিতে তাই পুরুষের উত্তরণ ঘটে কিন্তু নারীর মুক্তির সম্ভাবনাকে তছনছ করা হয়।

উপন্যাস বা সিনেমায় পর্নোগ্রাফি ঢুকিয়ে তাকে শিল্পের তকমা দেয়াতেও লিঙ্গবাদী পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ কাজ করে। শিল্পের নামে চালানো ওই সমস্থ উপন্যাস সিনেমা বানায় পুরুষ। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্টা তাকে নান্দনিকতার তকমা দেয় কেননা ক্ষমতার মসনদের মালিক হলো পুরুষ।

নারীর প্রতি যে ব্যবহার পর্নোগ্রাফিতে করা হয় হুবহ একই জিনিস পাওয়া যাবে নরম্যান মেইলার, হেনরি মিলারের উপন্যাসে কিংবা পাসোলিনির ‘সালো’ কিংবা ওশিমার ‘এম্পায়ার অব দি সেনসেস’ চলচ্চিত্রে। যেসব গ্রন্থে বা সিনেমায় নান্দনিকতা আরোপের দরুন নারীকে নষ্ট ও ধ্বংস করার দার্শনিকতাটি সামাজিক বৈধতা পেয়ে যায়। নামকরা লেখক বা চলচ্চিত্রকারের পর্নোগ্রাফি বেরোলেই ততোধিক নামকরা আলোচকরা প্রশস্তির আলোড়ন তোলেন যাতে নারীকে ‘অপর’ মনে করার চিরাচরিত দাবি বজায় থাকে। এই আলোচকরা একটি তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তা হলো, একমাত্র পুরুষই যৌনতা নিয়ে অহং করতে পারে এবং ‘নিশ্চিহ্ন’ হবার মধ্যেই নারীর উত্তরণ।

ইউরোপে সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পর্নোগ্রাফির প্রচলন হয়। পর্নোগ্রাফির রাজ্যে লিঙ্গ হলো আধিপত্যবাদী শাসক আর নারীর দেহ বিভিন্ন উপনিবেশ। পুরুষের লিঙ্গ এই গ্রন্থের নায়ক এবং সে বেরোয় এডভেঞ্চারে, যেভাবে সাম্রাজ্যবাদী দেশের নায়করা এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা আবিস্কারের এডভেঞ্চার চালাতো, নির্মম লুটতরাজ করতো ওই সমস্থ দেশের কৌমার্যে। এইচ রাইডার হ্যাগার্ড, এল স্টিভেনসন প্রমুখের রচনাবলীতে দেখা যায় উপনিবেশ নিসর্গপ্রকৃতির বর্ণনায় উপমা দেয়া হচ্ছে নারীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের, যেগুলোর উপর অত্যাচার চালাবে পরবর্তী প্রজন্মের পুঁজিবাদী কোম্পানি।

পর্নোগ্রাফিতে যে সন্ত্রাস চিত্রিত হয় তা রাজনৈতিক, কেননা এই সন্ত্রাস কোনো ব্যাক্তিপুরুষের ক্রোধ ও ক্ষোভ থেকে প্রসুত নয় বরং তা সমবেত। সাংস্কৃতিক নারী বিদ্বেষ। যা পুরুষের যৌথ ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য জরুরি।

পর্নোগ্রাফির ভাবাদর্শে পুরুষ মনে করে, যেকোনো নারীর যৌনতা তার জন্য অবারিত। তাই সে পথচলতি নারীকে উদেশ্য করে বাজে কথা বলে, ভিড়ে ধাক্কা দেয়, ফ্লেক্সিলোডের দোকান থেকে নম্বর সংগ্রহ করে ফোন দেয়, শরীরের যেখানে-সেখানে হাত চালায়।

যৌন সন্ত্রাসের ভীতি নারীর স্বাধীনতা খর্ব করে। সমাজ চায় নারী নিজেই নিজেকে সন্ত্রাস থেকে বাঁচাবে, অথচ সমাজ বলতে বোঝায় পুরুষ। নারী সন্ত্রাস ভীতিতে ভুগবে, অশুচি হবার ভীতিতে ভুগবে, এই ভয়ের দ্বারাই স্বতসিদ্ধ হয়ে যাবে পুরুষের নারীখাদক প্রবৃত্তি, খুবই স্বাভাবিক!

লেখক: সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.