পোশাক নিয়ে কথা বলার তুমি কে?

Thoughtsঝর্ণা মনি: ডিআরইউ (ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি) থেকে হেঁটে হেঁটে বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিকেল এসোশিয়েশন) যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কানে এল, এক হুজুর কি যেন গজগজ করছে। আমি ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত। হুজুরকে পাত্তা দেয়ার কথা মাথায়ও আসেনি। তাকানোও হয়নি। এরই মাঝে হুজুরের সঙ্গের বোরকাওয়ালী আমার কানের কাছে বললো, ‘এ্যাই মেয়ে, এই দুনিয়া দুনিয়া না। মরার পরের দুনিয়া হলো আসল দুনিয়া। হুজুরের কথা শোন। আখেরাতে কাজ হইবো।’

আমি অবাক চোখে তাকালাম। এবার আমার কানে এল হুজুরের বয়ান, ‘এ্যাই মাইয়া, ছেলেগো লাহান জিন্স পড়ছে। ছেলেগো লাহান চুল কাটছে। আবর ফোনে কথা কইয়া কইয়া হাসতাছে। এ্যাই মাইয়া দোযখে যাইবো। এ্যাই মাইয়ার কবরে আজাব হইবো।’

হুজুরের কথা শেষ হওয়ার আগেই বোরকাওয়ালীর ঝাঁঝালো স্বর কানে বিঁধলো, ‘এইগুলান তোমারে বলতাছে। তুমি দোযখে যাইবা। তোমার কবরে আজাব হইবো। তুমি মাইয়া হওয়া সত্ত্বেও ব্যাটাছেলে গো মতোন ড্রেরেস পড়ছো, ব্যাটাছেলে সাজবার চাইছো, তোমার গুনার মাফ নাই। বুঝলা?’

বিস্ময় কাটিয়ে হুজুরকে ডাকলাম, হুজুর দোযখের টিকিটখানা দিয়ে যান। আমি নিজেই সেখানে চলে যাব।

বোরকাওয়ালীর তখন পল্টি খাওয়ার দশা।

‘আল্লা গো, এ কোন দুনিয়ায় আইন্যা ফালাইলা। হুজুর বুজরুক মানুষগো লইয়া বেগানা আওরত টিটকারি মারে! এর তো দোযখেও জায়গা হইবো না।’

ইচ্ছে করেই মশকরা করে বললাম, কি বলেন, এইমাত্র তো বললেন, আমার দোযখে আজাব হইবো, আবার বলছেন, দোযখেও জায়গা নাই, কোনটা বিশ্বাস করবো?

বোরকাওয়ালী মনে হয় একদলা থু থু গিলে ফেলল। তারস্বরে চিৎকার করে বলল, ‘তোমার কুথাও জায়গা হইবো না। বুঝলা?’

বললাম, ভুল বললেন চাচী। মরার পরে তো ঢাকা মেডিকেলে যাবো। সেখানে ছাত্ররা আমার বডি নিয়ে গবেষণা করবে।

বোরকাওয়ালী এইবার সত্যি সত্যিই চটলো। হুজুরের হাত ধরে বললো, ‘এইসব নাদান নাস্তিকগুলান আগুনে পুইড়া মরুক। এগো লগে কথা কওনও গুনা। তুমি কথা কইবা না।’

সত্যিই হাসি পেল। কি অদ্ভুত আমাদের সমাজ। আমি কি পড়বো, সেটা আমার বিষয়। অন্যের নয়। শুধু ওই হুজুর বা বোরকাওয়ালীই নয়, এটা বুঝতে চায় না শিক্ষিত সমাজও।

ছোটবেলা থেকেই যে প্রশ্নটি আমাকে বেশি শুনতে হচ্ছে, তা হচ্ছে, ছেলে না মেয়ে? কী আজব! আমি ছেলে না মেয়ে, তা দিয়ে তোদের কি বাপ? আমি তোদের খাই না পড়ি? তোদের এত সুড়সুড়ি কেন?

আর ড্রেস? এ নিয়ে কথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। বাঙালি মেয়ে হয়ে কেন সালোয়ার-কামিজ পরো না, কেন শার্ট-প্যান্ট পরো? কেন বয়কাট চুল? এসব প্রশ্ন আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। যেন আমার শার্ট-প্যান্ট পড়া আর বয়কাট চুল তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে?

আরে যন্ত্রণা, আমি কাউকে বলি না, তুমি কেন সালোয়ার কামিজ পরেছো, তুমি কেন আপাতমস্তক বোরকা পরেছো, তুমি কেন হিজাব পরেছো? ওই সালোয়ার-কামিজ তো পাকিস্তানি পোশাক। আর বোরকা? সেও তো সৌদি আরবের পোশাক। এগুলো তো বাংলাদেশি বা বাঙালি পোশাক নয়।

তাহলে? আমার জিন্স-ফতুয়া নিয়ে তুমি কথা বলার কে? কে দিয়েছে অধিকার? ও, পাকিস্তানি পোশাক বা সৌদির পোশাক পরলে তোমাদের সমস্যা নেই, ওয়েস্টার্ন পোশাক পরলেই সুড়সুড়ি লাগে?

যারা পোশাকের দোহাই দিয়ে নারীকে বন্দি রাখতে চায়, নারী স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়, কুপুরুষের কুরুচিকে জায়েজ করতে চায়, তাদের মুখে ওয়াক, থু। পহেলা বৈশাখে লাঞ্ছিত নারীর গায়ে তো বাঙালি পোশাক শাড়ি ছিল। তিনি তো বাঙালির প্রাণের উৎসব উৎযাপন করতে গিয়েছিলেন। তাকে কেন খুবলে খেল নারখাদকের দল? তবে কেন পোশাকের দোহাই?

আসলে কামুকদের কাছে, নারী মানেই মাংসপিণ্ড। সে যাতেই আবৃত থাকুক না কেন। নারী দেখলেই তাদের যৌন সুড়সুড়ি লাগে। সে বুড়িই হোক আর ছুড়িই হোক।

ওহে নরপশু, তোদের বলি, নারীকে মাংসপিণ্ড ভাবার দিন শেষ। এবার সময় প্রতিরোধের। জেগেছে নারী। জেগেছে মানুষ। জেগেছে প্রাণ। প্রতিবাদে আজ গর্জে ওঠেছে দেশ। তোদের বধ হবেই।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.