গলা ছেড়ে চিৎকার করো নারী

Deepika n My Choiseরায়হানা রহমান (নীলা): পহেলা বৈশাখের ঘটনা আবারো মনে করায় নারীর জন্মই যেন বিভৎসতার সাথে সংগ্রামের জন্য। অথচ আমরাই দাবী করি আমরা সভ্য সমাজের, সুশীল সমাজের অধিবাসী। কিন্তু বাস্তবতা বড় ভিন্ন। আমরা সভ্যতার মুখোশের আড়ালে বর্বর এক জাতি, যার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী পুলিশ বাহিনীর কাছে গিয়ে নিরাপত্তা চাইতেও আমাদের ভয়, কখন তারাই না আবার ভয়ানক জন্তু হিসেবে ধরা দেয়!

হায়রে পুরুষ! বর্বর তোমরা পুরো বাংলাদেশকে বানাতে চাও তোমাদের লালসার জমি, যেখানে যখন খুশি তোমরা যৌনতার লাঙ্গল চালাবে। রাস্তায়, বাসে, শপিং মলে মেয়েদের দেখলে তোমাদের মাংসপিণ্ড বলে মনে হয়, যাকে টিপেটুপে দেখতে ইচ্ছে করে। পাশাপাশি চলার সময় তোমাদের মনের ভুলেই হাত চলে যায় নারী দেহের দিকে, যাকে তোমরা মানুষ বলে মানতে নারাজ; একখণ্ড মাংসপিণ্ড ব্যতীত।

তোমরা ভুলে যাও কোন নারীই তোমাকে দশ মাস তাঁর গর্ভে রেখে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে, তোমার হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছে, তোমাকে সকল বিপদ থেকে তাঁর আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছে। আবার যখন তুমি কৈশোর পেরিয়ে পুরুষ হয়েছো, অন্য কোন নারীর হাত ধরেছো, তাকে তোমার সন্তান ধারণ করিয়েছো। তারপরও নারী তোমাদের চোখে মাংসপিণ্ড ব্যতীত মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। আর কত অবমাননা করবে তুমি তাঁর? লালসার আগুনে আর কত পোড়াবে তুমি তাকে?

পহেলা বৈশাখের ঘটনার পর পত্র পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল সব জায়গায় যখন কলমের মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তখন সেই প্রতিবাদী লেখাগুলোতে মন্তব্য পাওয়া যায়, নাভীর নিচে শাড়ী পড়া বাংলাদেশের কোন্ সংস্কৃতি তা নিয়ে প্রশ্ন করতে।

কিন্তু অবাক করা বিষয়, এই সভ্য-সংস্কৃতিবান ব্যক্তিরাই যখন ইউরো-আমেরিকায় যান, মিনি-স্কার্ট পড়া বা সৈকতের ধারের বিকিনি পড়া নারীদের দিকে লালসার দৃষ্টিতে তাকাতে ভয় পান বা তাদেরকে মাংসপিণ্ড ভেবে চেখে দেখার সাহস করেন না। কারণ, এদেশের মতো সেদেশে তারা রেহাই পাবেন না যে! তাই তারা নারীর শাড়ি পরাকেই যৌন হয়রানির মূল কারণ হিসেবে দেখতে চান।

আবার কখনো, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনকে হিন্দুয়ানি হিসেবে আখ্যায়িত করে সেই উৎসবে বেগানা নারীর অংশগ্রহণকে শিরক বা হারাম হিসেবে উপস্থাপন করে এক শ্রেণির মানুষকে উজ্জীবিত করার পাঁয়তারা করেন। কিন্তু সেইসব জ্ঞানী ব্যক্তিদের জানাতে চাই, একমাত্র পহেলা বৈশাখই আমাদের নিজেদের উৎসব, যা সার্বজনীনভাবে পালন করা হয়। আশেপাশের কোন হিন্দু রাষ্ট্রে এরকমভাবে বাংলা নববর্ষ পালিত হয় না। তাই একে হিন্দুদের উৎসব বলার কোন অবকাশ নেই।

আজকের এই ঘটনা কালকেই অন্য কোন ঘটনায় চাপা পড়ে যাবে বা বলা যায়, ইচ্ছাকৃত চাপা দেয়া হবে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের প্ররোচনায়। প্রায় দশ বছর পর আজকের বর্বরতায় যেমন বাঁধনের ঘটনার দৃশ্যপট এক নিমেষে সবার চোখের সামনে চলে এসেছে, তেমনি আরো অনেক পরে অন্য কোন বর্বরতায় আজকের ঘটনা চোখের সামনে চলে আসবে। এটাই এখন এদেশের সংস্কৃতি।

তাই বলি, নারী এবার তোমার সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। তোমাকে একাই রক্ষা করতে হবে নিজেকে। তাই প্রস্তুত হও। গলা উঁচু করো। চিৎকার করো যতো জোরে পার। তুমি সর্বজয়া। তুমিই পুরুষকে পৃথিবীর আলো দেখাও, তাই তোমাকেই সেই বর্বর পুরুষের আলো কেড়ে নিতে হবে। যে তোমাকে একখণ্ড মাংসপিণ্ড ভাবে, তাকে তোমার মর্যাদার ছুড়িতে ছিন্নভিন্ন করে দাও। যে চোখে শুধু লালসার দৃষ্টি, তোমার আঙ্গুলের দাপটে গেলে দাও সে চোখ।

গলা ছেড়ে চিৎকার করো তুমি নারী!

রায়হানা রহমান (নীলা)

২০.০৪.২০১৫

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.