নারীর জন্য নিরাপদ স্বদেশ চাই

Kalo haatকানিজ আকলিমা সুলতানা: ভিডিও ফুটেজে পহেলা বৈশাখে নারীদের উপর আক্রমণকারীদের চেহারা দেখলাম। ওরা দেখতে ঠিক ওদের পিতামহ, পিতা, বড় ভাইদের মতোই। ‘৪৭ এ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে যাওয়ার পথে হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করেছিল ওদের পিতামহ, ওদের পিতা ধর্ষণ করেছিল ‘৭১ এ, ওদের ভাই ২০০১ সালে ধর্ষণ করেছে পূর্ণিমাদের, ২০০৩ সালে গোঁসাই বাড়িতে সদ্য প্রসূতী মা আর তার আত্মীয়াদের। ওদের পিতা আর ভাই মিলিত হয়ে ধর্ষণ করে পাহাড়ি নারীদের।

যুগে যুগে দেশের সামাজিক রাজনৈতিক ভৌগলিক সব পরিবর্তনে নারীর উপর চলে যৌন হামলা। সাতচল্লিশ থেকে আজ অবধি যৌন হামলারকারীর পরিচয়ে কোনো ভিন্নতা নেই। একাত্তরে লক্ষ লক্ষ নারীর উপর যৌন নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি ম্লান হওয়ার আগেই পঁচাত্তরে বদলে গেলো নারীর জগত। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে ছিয়াত্তরে সালের পুরোটা জুড়ে রাস্তা ঘাটে নারীদেরকে নানা  অবমাননা সইতে হয়েছে।

সামরিক শাসনের হাত ধরে জামাতের পুন:প্রতিষ্ঠা লগ্নে রাস্তায় পাহারা থাকা সিপাইরা রিকশা থেকে নারীদের নামিয়ে মাথায় ঘোমটা দিতে বাধ্য করতো। শাড়ি পরলে পেট দেখা যায় এই অজুহাতে একদল মানুষ মার্কেট  এলাকায় নারীদের জাপটে ধরে তাদের পেটে আলকাতরা মাখিয়ে দিতো। সাথে উচ্চারণ করতো অকথ্য অশালীন শব্দ। সঙ্গী পুরুষকে তারা কান ধরে উঠবস করাতো। বাক্যে আচরণে অপমানিত আতংকিত নারীরা যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘরে ফিরতো তখন।

১৯৮৪ সালে আরও একবার বদলালো রাজনীতির ধারা। সামরিক শাসক ইসলামের নামে টিকে থাকার ব্যবস্থা করতে নারীদের ভাগ্যে আবার জুটিয়ে দিলো নতুন  অভিজ্ঞতা, নতুন অপমান। নারীদের ঘরে আটকে রাখার ব্যবস্থা হিসেবে অফিস আদালতে লোকারণ্যে উৎসবে নারীরা লাঞ্ছিত হতে থাকলো। বাংলা একাডেমীর বইমেলায় সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হতে লাগলো নারীরা। ওড়না, আঁচল কষে টেনে রাখলেও শরীরের নিস্তার নেই।

পহেলা বৈশাখে বাংলা একাডেমীর গেইট দিয়ে ঢোকা এবং বের হওয়া নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলো। সেই সময়ে শাসকদলের নেতাদের যৌন  নির্যাতন থেকে  রক্ষা পেতে বহু প্রগতিশীল নারী ও নারী সাংস্কৃতিক কর্মী প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখতে বাধ্য হয়েছে।

এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৪ এর নির্বাচনোত্তর সংখ্যালঘু পরিবারের নারীদের লাঞ্ছনায় পিষে ফেলার উন্মত্ত কাহিনী আমরা সবাই জানি। বছরের পর বছর ভিন্ন ভিন্ন কারণে একই লাঞ্ছনার শিকার হয়ে চলেছে পাহাড়ি নারীরা। কোথায় এর শেষ?

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার নামে অপসংস্কৃতির চাষে সমাজে বেড়ে উঠেছে বিপথগামী আগাছা। এই আগাছারা এখন যুদ্ধাপরাধীদের দল জামাতের অনলাইন অফলাইনের বেতনভুক হাতিয়ার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামাত এবং জামাতি নেতাদের অপরাধ  প্রমাণিত হওয়ায় রাজনৈতিক ভাবে জামাত দেউলিয়া হয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। জামাতি নেতার প্রাপ্ত শাস্তির রায় কার্যকর করার প্রতিশোধ নিতে এইবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চালায় জামাতের ক্যাডাররা। বলাইবাহুল্য এই প্রচারণা ছিল ইসলামের খোলসে।

২০০৫ সালের সারাদেশে এক সাথে বোমা হামলার আরেক রূপ এবারের পহেলা বৈশাখের মেলায় নারীদের উপর আক্রমণ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ই নয়, দেশের নানা স্থান থেকে এই ধরণের আক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।  প্রশাসনের  উচিত ছিল আগে থেকেই এই ঘটনা মোকাবেলা করার প্রস্তুতি গ্রহন করা।   অপপ্রচারকারী কারা, তাদের উদ্দেশ্য কি এবং ওরা কতদূর যেতে পারে সেটা  প্রশাসনের না জানার কথা নয়।

ভিডিও ফুটেজে পাওয়া চিত্র বলে বাংলা নববর্ষের দিনে  মেয়েদেরকে এমন অসহায়ভাবে নির্যাতিত করা হয়েছে শুধুমাত্র যৌন বিকৃতিতে নয়। উদ্দেশ্য বাঙালির  সার্বজনীন উৎসবটিকে আতংকময় করে তোলা। জামাতিদের এই পরিকল্পিত  আক্রমণ থেকে কেন রাষ্ট্র ও সমাজ নারীদের রক্ষা করতে পারলোনা? প্রশাসনের এই দায়িত্বহীনতার জবাব কে দিবে? অপরাধীরা ধরা পরবেতো? রাষ্ট্র এই  উন্মত্ত অপশক্তিকে রুখবেতো?
নারীদের উপর সকল আক্রমণ সর্বকালে বিচার বহির্ভূত থেকেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অত্যাচার হলে নারী লাঞ্ছনাকারী ও ধর্ষণকারীর সাত খুন মাফ হয়ে যায়। কিন্তু এভাবেতো আর চলতে দেয়া যায়না।
আজ আমরা বিচার চাই। ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিলের নারী লাঞ্ছনাকারী সহ সকল লাঞ্ছনাকারী ও ধর্ষণকারীর শাস্তি চাই। নারীর জন্য নিরাপদ স্বদেশ চাই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.