যৌন মর্ষকাম, বাংলাদেশ ও ভারত

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়:  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কয়েকজন নারীর শ্লীলতাহানির অপচেষ্টা দিয়ে যে ঘটনার শুরু বলে আজ একটা উত্তাল প্রতিবাদ ক্রমশ সংগঠিত হচ্ছে, আসলে তার সূত্রপাত কিন্তু আগেই হয়েছিল।

 যৌন মর্ষকাম, বাংলাদেশ ও ভারতসপ্তাহ দুই আগে বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে চোখে পড়ছিল, খোলা যানবাহনে , রিক্সা কিংবা অটোয় করে যাওয়ার সময় নারীদের গায়ে জলীয় পদার্থ বা নোংরা কিছু ছুঁড়ে মেরে কিছু দুষ্কৃতি ভিড়ে গা ঢাকা দিচ্ছে। শংকিত হয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটলো, সেটা তার পরের পর্ব। এবারে শুরু হয়েছে মেয়েদেরকে শারীরিক আঘাত করে রক্তাক্ত করার পালা। যৌন উদ্দেশ্য তো রয়েইছে।

তার সঙ্গে জুড়েছে, কয়েকজন মিলে দল বেঁধে এ ধরনের হামলা এবং সেটা ঘটছে প্রকাশ্যে। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে। বিষয়টা আশপাশের মানুষ বুঝে ওঠার আগেই দুষ্কৃতকারীরা ভিড়ে মিশে যাচ্ছে। এধরনের ঘটনাকে নেহায়েত ‘বিকৃতি’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বসে থাকার অবসর আর নেই।

নেপথ্যে রাজনীতি

এর নেপথ্যে যা দেখা যাচ্ছে, তাহল স্পষ্ট পরিকল্পিত রাজনৈতিক ছক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ( প্রতিবেশী সমাজের দিকে নাক গলানো মনে হলেও, মার্জনা চেয়ে নিয়েই বলি) আমার বিশ্বাস, উগ্র ইসলামপন্থী মতবাদ এবং স্বাধীনতা ও মানবতা বিরোধী জোটের কাজ এসব। তারা সমাজে একটা ভীতি, আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করতে চাইছে। যার মাধ্যমে সহজেই আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিকে অকর্মণ্য প্রতিপন্ন করা সম্ভব। কারণ বিশ্বের কোনো দেশেই শুধুমাত্র পুলিশী সুরক্ষায় সভ্যতা বাঁচিয়ে রাখা যায় না। সভ্যতা ও নিরাপত্তা নির্ভর করে নাগরিকদের শুভবোধের ওপর। পারস্পরিক আস্থার ওপর। যে আস্থা আর বিশ্বাস নামের দুটি পায়ের ওপর ভর করে সাধারণ মানুষ পথে বেরোতে পারেন। বিশেষ করে মেয়েরা। এই জাতীয় ক্লীব আক্রমণের মাধ্যমে একটা সার্বজনীন ভীতি ও অনাস্থা তৈরি করা অতীব সহজ। আর সেই চেষ্টাটা যদি সাংগঠনিক হয়, তবে দুর্ভাগ্যবশত সাফল্য দ্রুত আসতে বাধ্য। ঘটনাবলীর পরম্পরা এবং দল বেঁধে অপকীর্তির দ্রুতি দেখে এই বিশ্বাস দৃঢ়মূল হচ্ছে , এগুলির নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক পরিকল্পনা।

মেয়েরা সফট অ্যান্ড সিকিওরড টার্গেট

কোনো সন্দেহ তাতে নেই! বাংলাদেশের পথেঘাটে নারীরা স্বাভাবিকভাবেই বের হয়ে থাকেন। যারা পরিকল্পনা করে এ কাজটি করছে, তারা অস্থিতি তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। এতদিন যানবাহনে পেট্রল বোমা ব্যবহার হচ্ছিল, সে চেষ্টা চলতে চলতেই এই নতুন উদ্যোগ দেখে বিশ্বাস হচ্ছে, এটা হল পরের ধাপ। সফট টার্গেট হিসেবে মেয়েদের বেছে নেওয়া। এরপরের ধাপে বীভৎসতার মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছোটোখাটো অস্ত্র, যেমন ব্লেড বা ছোট ছুরি দিয়ে রক্তপাত ঘটানো, কিংবা ময়লা ভর্তি প্যাকেট বা ঠোঙা ব্যবহার করা নারীদের ওপর ( যা ইতোমধ্যেই ঘটছে), এগুলো বাড়বে বলেই আশংকা।

ভারত আরও বড়ো আশংকায়

কথাটা বলতে দ্বিধা নেই এবং অপরাধ বিজ্ঞানের তত্ব বলছে, ইতোমধ্যেই প্রমাণিত ভারতের ধর্ষণপ্রবণ ( ভারতে প্রতি তেরো মিনিটে একজন করে নারী যৌন অপরাধের শিকার) সমাজে বাংলাদেশের এই ঘটনাবলীর একটা প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। অপরাধমনস্কতা সহজেই ঢেউয়ের মতো সীমান্ত টপকায়।

মর্ষকামের পোয়াবারো

যারা প্রকাশ্য পথেঘাটে গোপনে মেয়েদের শরীর স্পর্শ করে বিকৃতি চরিতার্থ করে, তারা বাংলাদেশের এই ঘটনাগুলির মাধ্যমে ইন্ধনলাভ করবে। মর্ষকামীর সংখ্যাবৃদ্ধি সমাজে তখনই হয় যখন প্রথমে নারী পুরুষের অনুপাত বিসদৃশভাবে সংকুল হয়ে ওঠে।

কন্যাভ্রুণ হত্যা ও মর্ষকাম

হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ, ভারতের এই কয়েকটি রাজ্যে বিগত প্রায় দুই দশক ধরে ব্যাপকহারে কন্যাভ্রুণ হত্যার ফলে এই রাজ্যগুলিতে নারী পুরুষের অনুপাতে কন্যাদের সংখ্যা লক্ষ্যণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। হরিয়ানা সর্বাগ্রে রয়েছে এই পরিসংখ্যানে। এই লিঙ্গবৈষম্য সমাজের অভ্যন্তরে যে পঙ্কিলতার জন্ম দেওয়ার তা স্বভাবতই দিয়েছে। এমন ঘটনার কথাও আমরা জানি, যেখানে এক একটি জনপদে তরুণী কিশোরী প্রায় নেই!

এমতাবস্থায় বিবাহের জন্য আড়কাঠি মারফৎ অাসাম, পশ্চিমবঙ্গ এমনকি বাংলাদেশ বা মিয়ানমার থেকে দরিদ্র ঘরের মেয়েদের কিনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একটি পরিবারে তিন ভাই একজন নারীকে বিয়ে করেছে এমন দুচারটি ঘটনাও সংবাদে আসতে চোখে পড়েছে। এই ভয়ংকর অসাম্য একধরনের নব্য বিকৃতির জন্ম দিচ্ছে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নারী কেবল পণ্য এবং শরীর ব্যতীত আর কিছু ভাবনাই কাজ করে না সেইসব অর্দ্ধ বা অশিক্ষিত মানসিকতায়। তথাকথিত শিক্ষিত যারা, তাদের মধ্যেও এই ভাবনার বিশেষ ব্যত্যয় নেই। কারণ, আবাল্য চেতনার মধ্যে নারীকে ‘মানুষ’ ভাবার প্রয়োজনীয়তা এইসব না – মানুষদের পড়েনি। শিক্ষা তো কেবলমাত্র পুঁথিতে হয় না! পারিপার্শ্বও শিক্ষা তৈরি করে! সম্প্রতি কয়েকজন পেশাদার শিক্ষকের, এমনকি দু চারটি প্রাক্তন শিক্ষকের সন্ধান পেয়েছি, যাঁদের মধ্যে সমগ্র নারীজাতি বিষয়ে এমত ধারণা পূর্ণমাত্রায় হাজির !!

যৌন সংবাদমাধ্যম

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমের সমাজগঠনে একটি বড় ভূমিকা ছিল। নব্য শতাব্দি আসার পর থেকে ক্রমশ বাণিজ্যিক মানসিকতার কাছে বিকিয়ে গিয়ে তারা শুধুই বিনোদনে আর সস্তা রাজনৈতিক তোষণের কাজ শুরু করার পর থেকে যৌনতা হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রধান পণ্য। যা সহজেই বিক্রি হয়। প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় নিদেনপক্ষে একটি করে যৌন ভাবনার খবর এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে পলিসি ম্যাটার। যাতে নারীদেহ বা নারীকেন্দ্রিক কিছু থাকে। ক্রমশ সেটা অভ্যাসে পরিণত হওয়ার কুফল হল, নারীকে পণ্যা এবংশুধুই শরীর বলে ভাবার প্রচার । তলিয়ে ভাবার অভ্যাস ( যা গড়পড়তা পাঠকের থাকার কথাই নয়, নেইও) না থাকলে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। হয়েওছে তাই। এই কথাটির সত্যতা আগামী আরও বেশী করে সপ্রমাণ করবে।

সমাপতন

সমাপতন তাহলে আশংকাই? কিন্তু সচেতনতা যদি না তৈরি করা যায় ‘ শত নাগরিকের মোমবাতি প্রতিবাদ ‘ পর্যন্তই বিযয়টি থেমে যাবে। নারীরা ক্রমশ আরও আক্রান্ত হবেন। কে কি পোষাক পরেছেন, কিভাবে উস্কানি দিয়েছেন, এই ক্ষুদ্র ভাবনাতেই আমরা থেমে থাকবো। তারপর একটা সময় আসবে যখন আমাদের ঘরের মেয়েরা পথে বেরোতে পারবেন না। যেমন পরিস্থিতি বিশ্বের কয়েকটি দেশের ইতোমধ্যেই ঘটছে! দুর্ভাগ্য যে সেটা আধুনিক সময়ে। মধ্যযুগে নয়! অপরাধপ্রবণ না – মানুষেরা কিন্তু এইটুকু জানে, ভয় এক মজ্জাগত অভ্যাস। আর একবার ভয় ডানা মেললে কে না জানে যে চারদিককে সে আঁধারে ছেয়ে ফেলে?

বন্ধু, হাত বাড়ান। চারপাশের সমাজ বিষয়ে সচেতন হোন

সচেতন করুন । সুস্থতাই আমাদের একমাত্র গন্তব্য হোক ।।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.