যে হাত আমাকে স্পর্শ করছে, সেগুলো ভেঙে দিতে চাই

Draupodi 1মীর ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা: ২০১৩ সনের ২১ ফেব্রুয়ারী কড়া সূর্যের সে দিনে ৩টার কিছু পরে নিজের তিন বোনকে নিয়ে হাজির হলাম। টিএসসি থেকে শাহবাগ মোড়ের প্রজন্ম চত্বরের দিকে চার নারী নির্বিঘ্নে ভিড় ঠেলে এগোতে শুরু করলাম।

হঠাৎ শহীদ ডাক্তার মিলন চত্বরে আসবার সাথে সাথে আমরা চার নারী উপলব্ধি করলাম এক লাইনে আমরা দাঁড়ানো আর আমাদের ঘিরে রেখেছে ২৫/৩০ জন পুরুষ। তারপরেও আমি ভয় পাই না, কারণ এটাতো প্রজন্ম চত্বর! ভিড় আরো বাড়তে থাকে, আমাদের চারপাশ থেকে প্রবল চাপ আসতে থাকে। হঠাৎ চিরচেনা শাহবাগ, এমনকি চিরচেনা শহুরে ঢাকা তার সমস্ত পাবলিক পুরুষালী চৈতন্য নিয়ে আমার সামনে হাজির হয়।

ঠিক আমার পেছনে কোন একজন পুরুষ ক্রমাগত তার হাত বাড়িয়ে চার নারীকে রক্ষা করতে চাইবার ভ্রান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন, আর চারপাশ থেকে প্রচণ্ড চাপে শরীরের সমূহ জায়গায় আমরা চার নারী খুব চেনা সহিংস পুরুষালী হাত টের পেতে শুরু করলাম। চিৎকার করছি, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি, ভয়ংকরভাবে বাড়ছে চারপাশের হাত দেয়া, পরনে শাড়ী, পেছন ফিরে কোন পুরুষকে সজোরে আঘাত করবো এমন ফুরসত পাচ্ছি না। ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’ এই স্লোগান চারপাশে যতো সজোরে হচ্ছে, ততো হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চারজনের প্রতিবাদ। জোরে চিৎকার করছি, ২০/২৫ জনের সেই চক্রের বাইরের চক্রে ক্রমান্বয়ে বাজানো হচ্ছে ভয়ঙ্করদর্শী ভুভুজেলা।

একটা সময় আমাদের সেই গোল চক্করের মধ্যে কীভাবে এক বৃদ্ধ চলে আসলেন, তার সাথে শিশু কোলে করা এক মা। চাপের চোটে বাচ্চাটা কোল থেকে পড়ে গেলো, মনে হলো পায়ের চাপে এখনই পিষ্ট হয়ে যাবে সে, আমাদের চিৎকারের সাথে পেছনের সামনের পুরুষগুলো বলতে শুরু করলো ‘এই ভিড়ে আসছেন কেন?’ আমি শুনতে পেলাম যারা শরীরে হাত দিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা জোর গলায় খেঁকিয়ে উঠছেন ‘বেয়াদপ মেয়ে! কে কখন হাত দিলো?’।

আমার বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেলো, মনে হচ্ছিলো আমার বোনগুলো এবং আমার শরীর ভাগ হয়ে যাচ্ছে চাপে, ভেঙ্গে যাচ্ছে প্রত্যেকটা জয়েন্ট। চারপাশের চাপ আমাদের নিয়ে কেমন গোলাকার মাংসপিণ্ডের মতো জাদুঘর পর্যন্ত চলে গেলো। পিষে যাচ্ছি, দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফিরে কোন দিকে ঘুরে কোথাও কোন পাশে বাঁকবার কোন উপায় নেই।

ধাক্কা হুড়মুড় চাপ আর শিশুর হঠাৎ পড়ে যাওয়াতে বৃদ্ধ ভদ্রলোক আর পেছনে থাকা আরেক পুরুষের সহায়তায় হাসফাঁস করতে করতে সেই গোল জমায়েত থেকে আমরা এক শিশু সহ পাঁচজন নারী বের হয়ে আসলাম। জাদুঘরের উল্টো পাশে থাকা চটপটির দোকানগুলোর চেয়ার আমাদের কাছে নিরাপদ মনে হলো, তখনও সে পুরুষগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে, আবার কখন আমরা ভিড়ের মধ্যে মিশবো সে অপক্ষায় আছে, আমার এই হাস্যরত পুরুষগুলো খুব চেনা মনে হলো, মনে হলো টিভিতে দেখা লাইভ বিশ্বজিৎ এর রক্তাক্ত শরীরে যেসব পুরুষালী সন্ত্রাসীদের চাপাতি উৎসব পষ্ট দৃশ্যমান, তাদের সাথে এদের আসলে তেমন কোন বিরোধ নেই ।

মজার বিষয় হলো, চটপটিওয়ালারা আমাদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে বসতে দিলো। আমার জীবনের আর সব পরিচিত জায়গার মতো, আর সব পরিচিত দিনের মতো, আর সব পরিচিত পাবলিক বাস বা পাবলিক পরিসরের মতো আজন্ম অনিরাপদ নারীত্ব নিয়ে আমাকে আবার ভীত হতে হলে, সন্ধ্যা হওয়ার আগে এই ভিড়ের থেকে বের হতে হবে। অন্তত কিছুটা ‘নিরাপদ’ থাকতে হবে।

আমি উন্মাদের মতো ফোন করতে লাগলাম, চরম হট্টেগোলে ফোন কেউ শুনতে পারছিলেন না, ছবির হাটে থাকা আমার এক পুরুষ বন্ধুকে স্মরণ করতে হলো। চেনা শাহবাগ মোড়ে পুরুষ সে বন্ধু তার সাঙ্গপাঙ্গ এনে ভিড় ঠেলে আমরা চার নারীকে চেনা পুরুষালী হাত থেকে উদ্ধারের কাজে নামতে বাধ্য হলেন। জাদুঘরের সামনে থেকে ছবির হাট পর্যন্ত যেতে উদ্ধারকারী এক পুরুষের মোবাইল আর মানিব্যাগ এবং আমাদের একজনের মোবাইল পকেট কেটে নেওয়া হয়ে গেলো।

ভাগ্যিস! ২০১৩ তে আমার শাড়িটা খুলে নেয়নি!

২০০০ সনে এইচএসসি পাশ করবার পর ভর্তি পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া শুরু করেছি। মধ্যবিত্ত মেয়ে আমি, খানিক সুবিধা প্রাপ্ত জীবনই সেসময়। তিন বান্ধবী মিলে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম নিই। ঢাকা শহর আমরা কম চিনি, বাসার গাড়ি করে যাতায়াত করি। আজিমপুর রাস্তায় গাড়ি রেখে খানিক হেঁটে হোম ইকোনমিকস কলেজে যাচ্ছি। সারি সারি রিকশা দাঁড়ানো, আমাদের তিনজনের মধ্যকার একজনকে দেখে সার বাঁধা রিকশা থেকে এক রিকশাওয়ালা এগিয়ে এসে লুঙ্গি উঁচু করে দাঁড়িয়ে তার শিশ্ন তুলে দেখিয়ে বললেন যার খানিক আমি শুনলাম “আপা আপ্নাকে দেখে দাঁড়ায়ে গেছে” আমি আমার তিন বান্ধবী দৌড়ে হোম ইকোনমিকস কলেজের গেইটে চলে আসলাম। আমি কলেজের ভেতরে প্রবেশ করতে পারলাম না, সামনে বসেই হড়হড় করে বমি করে দিলাম।

ক ও ঘ ইউনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমি ভর্তি হইনি। বলিওনি কেন হয়নি। যে বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে এরকম ভয়ংকর হয়রানি করা হয়েছিলো তিনি কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েননি।

মিলন চত্বর মিলিনিয়াম বাঁধন আমার মাথার মধ্যে দগদগে হয়ে আছে। কিন্তু সে দগদগটা হীনতার নয় বরং ক্রোধের খানিক স্পর্ধার এমনকি ধ্বংসের। এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে আজকের এই কথাগুলোর ইতি টানি।

২০০৯ সনের মাঝামাঝি সেসময় আমি সদ্য স্নাতকোত্তর পাশ দিয়ে একটি গবেষণা সংস্থায় কর্মরত রয়েছি। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণা কাজ করেছি যৌনতা, নারী শরীর ও পর্দা নিয়ে। আমার গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক মানস চৌধুরীর সাথে নারীর নিপীড়ন অভিজ্ঞতা, আত্মকথন ইত্যাদি প্রসঙ্গে কথা বলবার এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন “শুভ্রা, আপনার কী মনে হয় না আপনার ধর্ষণের কথা স্মরণ করা এবং এই সংক্রান্ত আপনার কষ্ট জ্বরজ্বর অবস্থাটা একটা এপিক্যাল বিষয়? মানে ধরেন, ধর্ষণ কিংবা নিপীড়নের একটা শারীরিক আঘাতের বিষয় থাকতে পারে সে নিয়ে ক্রোধ হতে পারে, কিন্তু এই যে বেদনা সেটি কি নিপীড়ন নিয়ে [সামাজিক] ‘রোমান্স’ থেকে আসে না?”

আমি আমার শিক্ষকের এহেন মন্তব্যে অসম্ভব মর্মাহত হলাম এবং আমি উনার উপর ক্রুব্ধ হলাম এতোটাই ক্রুব্ধ যে স্যারের সাথে একটা দীর্ঘ সময় আমি নিপীড়ন কেন্দ্রিক কোন অভিজ্ঞতা সহভাগ তো দূর এই বিষয়ক কোন প্রসঙ্গে আসতে পারে এমন আলোচনাই এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। আর এই এড়িয়ে চলবার সাথে সাথে আমি উনার এই প্রশ্নটার উত্তর জানতে শুরু করলাম নিপীড়ন বেদনা কখন কীভাবে কোথায় কেমন করে রোম্যান্টিক হয়ে দাঁড়ায়?

নিপীড়ন নারী শরীরের উপর আরো বড় পরিসরে বললে মানুষের শরীরের উপর ক্ষমতা ফলানোর জায়গা। যৌন হয়রানি অসম্মতির অনুপ্রবেশ সে যে রকমই হোক না কেন। যৌন হয়রানি করে পুরুষ শত্রু হয় এই পুরুষালী মতাদর্শে আবার যৌন হয়রানি থেকে উদ্ধার করে নারীর মিত্র হয় পুরুষ। নারী ক্ষেত্রই থেকে যায়। নারীর শরীর আর তার নিপীড়নের সাথে লেগে থাকে হয়রানি-ইজ্জত-সম্মান-মান-সম্ভ্রম ইত্যাদি নানা জিনিস।

মানস স্যার যে প্রশ্ন করেছিলেন তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে ধর্ষণ যৌন নিপীড়নকে মোকাবেলা করতে পারে না এমন নমনীয় নয় কোন নারীই কিংবা কোন মানুষই। যে সামাজিক কারণে নারী নিপীড়নকে মোকাবেলা করতে পারে না সে সামাজিক কারণেই সে ওড়না ধরে টান মারলে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে। সে মানসিক কারণেই ধর্ষণ ঘটনাকে সে খুনের ঘটনার মতো বয়ান করতে পারে না, তার সাথে সম্মানহানির সম্পর্ক যুক্ত হয়। যে সামাজিক প্রক্রিয়া নারীকে কোমলমতি করে লাফ দিয়ে গাছে উঠতে দেয় না, পুতুপুতু অশক্ত নরম বানায় সে সামাজিক প্রক্রিয়াতেই ভঙ্গুর নারী বাইকে কাইত হয়ে বসে সেই সামাজিক প্রক্রিয়াতেই সেই পুরুষালী মতাদর্শেই নেংটা হয়ে গেলে অজ্ঞান হয়ে যেতে হয়।

এমন সময় আসুক, আমি যখন মনে করতে পারবো যে শালা কাপড় নিছে তো নিছে, দুইটা চড় মাইরা আসছি, কইষা লাথি দিয়ে ডইলা আসছি। আমি বীভৎস কর্তনের পক্ষে, যে হাত আমার সমস্ত শরীরকে স্পর্শ করেছে আমার অসম্মতিতে ভিডিও করলেও আমি সেই হাত গুলো মুচড়ায়ে ভেঙ্গে দেওয়ার পক্ষে।

শারীরিক আঘাত প্রতিরোধে শারীরিক আঘাত। আত্মপ্রতিরোধ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.