সময় এসেছে এবার তাদের বিবস্ত্র করার

We can do itকিশোয়ার লায়লা: গত ক’দিন ধরে পনেরো বছর আগের একটা দিনের কথা খুব মনে পড়ছে। অনার্স শেষ বর্ষে তখন আমরা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল টেস্ট স্ট্যাটাস পেলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ করতে গিয়ে এ খবর পেলাম।

শুরু হয় আনন্দ উল্লাস। অপরাজেয় বাংলার চারপাশ ঘিরে একটা দুটো আনন্দ মিছিলও বেরুলো। মাঝপথে ক্লাশ বন্ধ করে সব বিভাগের শিক্ষার্থীরা যোগ দিল সেই মিছিলগুলোতে। তখন ক্রিকেট খুব একটা বুঝি না। সোজা কথায় বন্ধুরা বোঝালো, এখন থেকে বিশ্বকাপ আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে বাংলাদেশ দল।

মিষ্টি, রং খেলা সবই আস্তে আস্তে শুরু হয়। আর তখনই ঘটে বিপর্যয়। যা ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে মহাবিপর্যয়ে রূপ নেয়। আঘাত আসতে থাকে মেয়ে শিক্ষার্থীদের গায়ে রং মারার নামে ছেলেদের বীভৎস আচরণ দিয়ে। মূহূর্তের মধ্যে আতংকপুরি হয়ে যায় প্রিয় ক্যাম্পাস। মধ্যবেলা পর্যন্ত চলতে থাকে বীভৎসতা। নিজস্ব বিভাগের নানা জায়গায় লুকিয়ে লুকিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করেছি আমরা মেয়েরা। অনেকেই পারেনি।

পরে শুনেছিলাম, রাস্তায়, হলের সামনে, রিক্শা করে যাওয়া- কোন নারী সেদিন হয়রানির হাত থেকে বাঁচেনি। এমনকি বয়স্ক নারীরাও ছেলেদের পশুরূপী আচরণের শিকার হয়েছেন।

আর আমরা বারবারই বলাবলি করছিলাম, এসব ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে? মেয়েদের এরা সামান্য সম্মানটুকু দেখাতে পারছে না? মনে আছে সেদিন একপর্যায়ে মনের দুঃখে অভিশাপের সুরে বলেছিলাম, বাংলাদেশ যেনো কখনো বিশ্বকাপ জয় করতে না পারে।

সেদিন দিনে-দুপুরে ঘটেছিল আনন্দ-উল্লাসের নামে মেয়েদের যৌন হয়রানি। সেই কালো দিনটা আবার মনে করিয়ে দিল এবারের পয়লা বৈশাখ। আনন্দে প্রকাশের নামে নোংরা খেলায় নামে কিছু নপুংশক। ছেলেগুলো কোন দলের বা কোন শ্রেণীর, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাই বা কতটুকু, তা মুখ্য নয়।

মুখ্য হলো, সমাজে বাস করা মানুষ এরা। আমাদের চারপাশেই তাদের চলাফেরা। যাদের একটি পরিবার আছে। তাদের নিজেদেরও মা আছে, বোন আছে। হয়তো কয়েকজনের বিয়ে করা বউও আছে। এ ধরনের কাজ করার আগে কি সেসব সম্পর্কের কথা বিন্দুমাত্র মনে পড়ে না তাদের? মূহূর্তেই পশু হয়ে উঠতে এতটুকু বাধে না তাদের? জানি, আমি উলো বনে মুক্তা ছাড়ানো ডায়লগ দিচ্ছি। এসব বলে আসলেই লাভ নেই। তাই এখন নারীদের কঠোর হতে হবে।

পয়লা বৈশাখের ঘটনার পরপরই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। আমরা সবাই কলম ধরছি যে যার মতো করে। অনেকেই বলছেন, আর চুপ থাকার সময় নেই। এবার কঠোর প্রতিবাদী হতে হবে। আন্দোলনের মাত্রা কঠিনতর করা হবে। আমি নিশ্চিত, সবাই কিছু না কিছু ভাবছেন। আনন্দ প্রকাশের অধিকার নিশ্চয়ই পুরুষের একার নয়।

ওরা যদি একটি মেয়েকে ভরা মজলিশে বিবস্ত্র করে মজা নিতে চায়, আমরাও এখন ভরা মজলিশে একটি ছেলেকে বিবস্ত্র করে মজা নিতে চাই। এখন সময় এসেছে পুরুষদের বিবস্ত্র করার। দেয়ালে এমনভাবে পিঠ ঠেকেছে যে, হার্ডলাইন ছাড়া এখন কোন উপায় নেই। এখন মেয়েদের একজোট হয়ে ছেলেদের হেনস্তা করতে হবে। ইংরেজিতে কথা আছে না, টিট ফর ট্যাট। অনেক চুপ থেকেছি। আর নয়। আমাদের শরীর কী শুধুই তাদের আনন্দের খোরাক হয়ে থাকবে? আনন্দ মানেই কী নারীর শরীরের ওপর আক্রমণ?

ধর্ষণের প্রতিবাদে যেমন স্যানিটারি ন্যাপকিন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, তেমনি কঠিন কিছু ভাবতে হবে আমাদেরও।

কিশোয়ার লায়লা, সাংবাদিক, টরন্টো

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.