হায় সাংবাদিকতা, হায় নারী সাংবাদিক

manna
লেখক: আইরীন নিয়াজী মান্না

আইরীন নিয়াজী মান্না (উইমেন চ্যাপ্টার): সাংবাদিকরা মানুষের অধিকারের কথা বলে; সুযোগ-সুবিধার কথা বলে; মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরে পাঠকের সামনে অথচ তারা নিজেরাই বঞ্চিত। আর সে যদি হয় নারী সাংবাদিক তাহলে তো কথাই নেই!

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরেই বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে নারী সকল ক্ষেত্রেই নানা বৈষম্যের শিকার। আমাদের দেশে তা আরো ব্যাপক। সাংবাদিকতার জগৎটি এর ব্যতিক্রম হবে কোনো! এখানে বৈষম্য আরো অনেক বেশি। এজগতে প্রথমেই বুঝিয়ে দেওয়া হয় তুমি নারী, তাই তুমি দ্বিতীয় শ্রেণীর!

নারী সাংবাদিকদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে কথা বলতে হলে প্রথমেই বলতে হয় এদেশের সংবাদপত্র তথা মিডিয়া হাউজগুলোতে নারী-বান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। নানা প্রতিকূলতা মাড়িয়ে যেসব নারী এগিয়ে এসেছেন এ পেশায় তারাও যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছেন না। স্বীকৃতি পাচ্ছেন না যোগ্য কর্মীরা। পদোন্নতির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এসব কারণে অনেকে আবার পেশা থেকে ঝরে পড়ছেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী সাংবাদিকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি হচ্ছে না কথাটি দিবালোকের মত সত্য। নারী সাংবাদিকদের জন্য উপযুক্ত কাজের পরিবেশ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। শুধু বৈষম্য-বঞ্চনাই নয়, নারী সাংবাদিকরা অনেক সময় নানা ধরনের লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকারও হন। তাদের ওপর রয়েছে নানা ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নারীর পদচারণা শুরু হয় মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে। দীর্ঘ পথচলায় এখন টেলিভিশন, রেডিও অনলাইন কাগজ ও পত্রপত্রিকা মিলিয়ে দেড় শতাধিক সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন নারীরা। প্রতিনিয়তই সাংবাদিকতায় নতুন নারীর অংশগ্রহণ এবং চাকরি ছাড়ার ঘটনা ঘটায়, নারী সাংবাদিকের সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের মধ্যে নারীর সংখ্যা শতকরা মাত্র প্রায় সাত ভাগ বলে ধারণা করেছেন কর্মরত সাংবাদিকরা। আর পুরুষপ্রধান এই ক্ষেত্রটিতে পেশাগত, মনস্তাত্বিক, সামাজিক, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক নানা সমস্যা মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হচ্ছে নারীকে। সংবাদ মাধ্যমে প্রবেশ করতে যেমন তাদের বেগ পেতে হচ্ছে, তেমনি টিকে থাকার জন্য লড়ে যেতে হচ্ছে অদৃশ্য এক যুদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানে পেশা বৃত্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও মেধা এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারী নিজের আসন এখনও পাকা করতে পারেনি সাংবাদিকতার পুরুষপ্রধান ক্ষেত্রে। এ জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ। এসব কারণগুলো আলাচনা করার প্রয়োজন অনুভব করছি।

ক.
১. তৈল মর্দন এবং গ্র“পবাজি মিডিয়া হাউজগুলোর অন্যতম উপাদান। নিজের চাকরি বাঁচিয়ে রাখতে উর্ধ্বতন বসকে যে যত তৈল দিতে পারবে ততই তার জন্য মঙ্গল। এক্ষেত্রে তৈলের আবার প্রকারভেদ রয়েছে। আপনি যদি নারী সাংবাদিক হন এবং আপনার যদি ব্যক্তিত্ববোধ থাকে, আপনি যদি উচ্চকণ্ঠ, স্বচ্ছ, টনটনে ও নির্ভেজাল স্বভাবের হন এবং একই সঙ্গে হন মেধাবী তাহলে আপনি কোনো সুযোগই পাবেন না। আপনার পদোন্নতি হবে না, বেতন বাড়বে না; সর্বোপরি আপনি সবরকম সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হবেন। অজ্ঞাত কারণেই আপনার বিরুদ্ধে চলবে অকল্পনীয় ষড়যন্ত্র; যা আপনি জানতেই পারবেন না। আপনাকে কোণঠাসা করে ফেলা হবে এবং পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশে আপনাকে ফেলা হবে বিভিন্ন রকম বিপদে। আপনাকে দমিয়ে দিতে, আপনার প্রতিভাকে থামিয়ে দিতে এমনটি করা হবে। এছাড়াও কোনো কারণে একবার যদি আপনি আপনার বস বা বসদের কুদৃষ্টিতে পারেন, তাহলে আপনার কোনো নিউজই ছাপা হবে না। যতই অ্যাসাইনমেন্ট করেন না কোনো! আপনার জমা পড়া স্পেশাল নিউজগুলো বসের ড্রায়ারে পরে থেকে থেকে ডেড হবে আর আপনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে হবেন অকর্মণ্য। এ পরিস্থিতিতে আপনার চাকরি না গেলেও এক সময় অধৈর্য্য হয়ে আপনি নিজেই মান বাঁচাতে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।

২. বসের স্নেহদৃষ্টি আপনার ওপর না থাকলে আপনি কোনো ভালো অ্যাসাইনমেন্ট পাবেন না। ভালো নিউজ কাভারেজ তো পাবেনই না। প্রথম পাতা, দ্বিতীয় পাতা এমন কি তৃতীয় পাতায়ও আপনার স্থান হবে না। লিড করার কথাতো ভাবাই যায় না! ১৯/২০ পাতায় সিঙ্গেল কলামে সাদামাটা করে আপনার লেখা নিউজ যাবে কালেভদ্রে! বসের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ঘটনাপ্রবাহে তেমন সহনীয় ও সাবলীল হওয়ার সুযোগও কম। কারণ তাকে তৈল দান করার সুযোগও আপনার বিরল। শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে আপনি যখন-তখন তার সঙ্গে চা বা সিগারেট খেতে যেতে পারেন না। অফিসের পরে তার সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়াও আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। শোনা হয় না তার ক্ষোভ, যন্ত্রণা কিংবা ষড়যন্ত্রের কথাবার্তা। সুতরাং অন্যান্য পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় শুরু থেকেই তো আপনি অনেকটাই পিছিয়ে। এর বিপরীত চিত্রও আছে। পুরুষ সহকর্মী বা বসের সঙ্গে আপনি সহজভাবে মিশলেও রয়েছে বদনাম বা দুর্নাম হওয়ার অপার সম্ভবনা।

৩. কিছু কিছু হাউজ আছে যেখানে খোদ প্রধান ব্যক্তিটি তৈল এবং কানকথায় খুব বিশ্বাস করেন। কানকথায় বিশ্বাসী হয়ে তিনি তার অধস্তন অনেক মেধাবী ও যোগ্য কর্মীর প্রতি নেতিবাচক আচরণ করেন; এমন কি তার বা তাদের চাকরি পর্যন্ত খেয়ে বসে থাকেন। প্রধান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রকৃত অবস্থা যাচাই করেন না। তোষামদিদের বেষ্টনিতে তিনি আবদ্ধ হয়ে পড়েন অনেকটা স্বেচ্ছায়। সাংবাদিকতা করলেও তার ধমনীতে আমলাতান্ত্রিক প্রবাহ বহমান থাকে। এখানেও তৈলের চরম কার্যকারিতা রয়েছে। যারা তাকে তৈল মর্দন করেন না তাদের প্রতি তিনি নাখোশ থাকেন সকলক্ষেত্রেই।

৪. হালে প্রায় দেড় শতাধিক মিডিয়া হাউজ গড়ে উঠেছে খোদ রাজধানীতে। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দুয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ হাউজগুলোতে নারীবান্ধব পরিবেশ নেই। এমন কি অধিকাংশ হাউজেই নারীদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন, সুগমনপথ বিশিষ্ট টয়লেটই নেই। পুরুষ সহকর্মীদের টয়লেট ডিঙ্গিয়ে তাদের টয়লেটে যেতে হয়। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বড়ই উদাসীন! তারা পুরুষদের জন্য বিড়ি খাওয়ার একটি রুম পয়সা খরচ করে বানাতে প্রস্তুত কিন্তু নারীদের জন্য ভালো পরিবেশে একটি টয়লেট তৈরি করে দিতে তাদের মন চায় না।

৫. দেশে যৌন নির্যাতন বিরোধী নীতিমালা হয়েছে তা-ও প্রায় ৩/৪ বছর হতে চললো। কোর্ট থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি কর্মপ্রতিষ্ঠানে নারীদের কাজ করার সুস্থ ও সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করতে হবে। যাতে অন্তত দুই জন নারী সদস্য থাকবে। কিন্তু জানা মতে দেশের একটি মিডিয়া হাউজেও এ ধরনের কোনো কমিটি গড়ে তোলা হয়নি আজঅব্দি! জানা মতে মিডিয়া হাউজগুলো এ নীতিমালার বাইরে নয়।

৬. নারী কর্মীদের প্রসবকালীন ছুটি ছয় মাস সরকার নির্ধারণ করলেও বিশেষ দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ মিডিয়া হাউজই এই নিয়ম মানছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিন মাসের বেশি প্রসবকালীন ছুটি দেওয়া হচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ সময়ই অন্তঃসত্ত্বা হলে নারী সাংবাদিককে চাকরি ছেড়ে দিতে হচ্ছে বাধ্য হয়েই।

খ.
গত বছর ১৬ মে ২০১২ প্রথম আলোয় প্রকাশিত নারী সাংবাদিকদের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে রাইটিং রং অ্যাগেইনস্ট উইম্যান জার্নালিস্টস ইন বাংলাদেশ- শীর্ষক জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশে ৫২ শতাংশ নারী সাংবাদিক যৌন হয়রানির শিকার হন!

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর্টিকেল-১৯ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে আর্টিকেল-১৯-এর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক তাহমিনা রহমান ৫৫ জন নারী সাংবাদিকের ওপর চালানো জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন। সাক্ষাৎকারভিত্তিক জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ নারী সাংবাদিক বলেছেন, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হন। ৫২ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হন। যৌন হয়রানির শিকার ৪০ শতাংশ অবশ্য এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেননি। তবে এ কারণে অনেকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। ৪৭ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে অন্যান্য সমস্যার কথা বলেছেন। জরিপমতে, বেতন বৈষম্য, নিয়োগপত্র না থাকা, বিভিন্নভাবে শাসানোর মতো বিষয় নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে।

গত প্রায় দুই/তিন বছরে দেশে সব ধরনের গণমাধ্যমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন মাধ্যম আসছে। সাংবাদিকতার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ সুযোগ নিয়ে এসেছে। কিন্তু নারীর স্থান এখানে কতটা প্রসারিত হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। খোদ নারী সাংবাদিকরাই তাদের অবস্থান ও ভবিষ্যত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। অনেকেই কাজ করতে গিয়ে নানা রকম বৈষম্য ও সমস্যার শিকার হচ্ছেন। নারী সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একটি ইংরেজি দৈনিকের একজন নারী সিনিয়র রিপোর্টার অভিযোগ করে বলেছেন, প্রায় একযুগ চাকরি করার পর স্টাফ রিপোর্টার থেকে সিনিয়র রিপোর্টার হয়েছি। অনেক জুনিয়ররা আমারকে টপকে অনেক আগেই সিনিয়রিটি পেয়েছে। শিক্ষাগত এবং মেধার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি শুধুমাত্র আমি নারী বলে। সিনিয়র রিপোর্টারের পর আমাকে তারা আর কি পদ দেবে! দেবে না আমি নিশ্চিত। আমার চেয়ে মেধা এবং যোগ্যতায় অযোগ্য ব্যক্তিরা আমার বস হয়ে বসে আছে। তাদের পদগুলোতে তারা আমাকে যেতে দেবে না। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বেড়াজালে পড়ে আমি আর কোনো পদোন্নতি পাবো না বলেই আমার বিশ্বাস।

একটি বহুল প্রচারিত প্রথম সারির দৈনিকের একজন শিক্ষানবিশ নারী রিপোর্টার জানিয়েছেন, প্রথমে তার প্রতি একজন বার্তা সম্পাদকের অতি আগ্রহ এবং পরবর্তিতে ওই বার্ত সম্পাদকের নানা রকম মানসিক যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে তিনি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বিষয়টি তিনি নজরে আনতে চেয়েও কোনো ফল পাননি। পরে নিজেকে রক্ষা করতে চাকরিটি ছেড়ে দেন। বরং পরবর্তিতে রহস্যজনকভাবে ওই বার্তা সম্পাদকেরই পদোন্নতি হয়েছে। অভিযোগ আছে, ওই বার্তা সম্পাদক অযথাই নিজের রুমে ডেকে নিয়ে বসিয়ে রাখতেন মেয়েটিকে। প্রায়ই মধ্যরাতে অনাকাংখিতভাবে তাকে ফোন করে বলতেন, আমার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যাও, কিংবা তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে সামনে বসে থাকলে আমি কাজের ইন্সপিরেশান পাই, আমার বাসায় একদিন আসো, বাসায় কেউ নাই, মজা করে পিকনিক করা যাবে… ইত্যাদি আরো নানা কথা।

অন্য একটি প্রথম শ্রেণীর জাতীয় দৈনিকের একজন রিপোর্টার জানান, শুধুমাত্র বিভিন্ন মানসিক যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে প্রতিবাদ করায় এবং জুনিয়র নারী রিপোর্টারদের মানসিক সাপোর্ট দেওয়ার ফলে কোনো কারণ না দেখিয়েই তাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচটি বছর একই হাউজে কাজ করলেও তার ভাগ্যে জোটেনি সিনিয়রিটি। বেতন বাড়েনি এবং তিনি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। অথচ অনেক জুনিয়ার পুরুষ রিপোর্টারকে করা হয়েছে সিনিয়র। তৈল মর্দনের কারণে বার বার বিশেষ দুচারজনের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে লোক হাসিয়ে।

একজন নারী সাংবাদিক আলাপকালে জানান, তিনি এক স্বনামধন্য সম্পাদকের কাছে চাকরি চাইতে গেলে সেই সম্পাদক তাকে বলেন, তোমরা তো অ্যান্টিক হয়ে গেছো। আর কতো কাজ করবে? বিষয়টা এতোটাই হাস্যকর ওই নারী সাংবাদিকের বয়স চল্লিশের কিছু বেশি, আর যার কাছে তিনি চাকরি চাইতে গেছেন সেই পুরুষ সম্পাদকের বয়স পঁয়ষট্টিরও বেশি।

অপর এক নারী সাংবাদিকের বক্তব্য, নারী সাংবাদিকরা একটু বয়স হলেই বুড়ি হয়ে যায়; আর পুরুষ সাংবাদিকরা বয়স হলে হয় আরো শাণিত, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হয়। হায়; বিধাতা! নারীর মেধার সঙ্গে বয়সের কি সম্পর্ক তা আমার জানা নেই।

কোনো একটি জাতীয় দৈনিকের একজন প্রধান প্রতিবেদক তার রিপোর্টারকে নারী বিটের একটি ৫/৭ লাইনের রিপোর্টকে আরো ছোট করে আনতে বলেন। তার বক্তব্য, একেই তো নারী বিষয়ক সংবাদ; তার ওপর মহিলাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। নামিদামী মন্ত্রীরাই জায়গা পায় না; নারী প্রতিমন্ত্রীর খবর আবার কি ছাপা হবে? একজন প্রধান প্রতিবেদকের যদি এই মানসিকতা হয় তাহলে সুষ্ঠু ও ন্যায্য কাজটি হবে কিভাবে!

এতো মাত্র কয়েকটি ঘটনা। এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের নারী সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অধিকাংশ মিডিয়া হাউজগুলোর যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো জেনেও নীরব ভূমিকা পালন করছে।

গ.
আগেই বলা হয়েছে এখন সারাদেশে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এখন সাংবাদিকতা পেশায় সাহসী হয়ে অনেক নারী এগিয়ে আসছেন এটা যেমন সত্য। অন্যদিকে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের সংখ্যাও বেড়েছে। সাংবাদিকতা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। নারীর জন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা আরো কঠিন। কারণ গণমাধ্যমের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো। সমাজের পরতে পরতে ছড়ানো নারীর প্রতি অমর্যাদাকর দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে প্রতিনিয়তই এই জগতে প্রবেশ, টিকে থাকতে ও সমানে এগুতে বাধা দেয়। তবু প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নারীরা এগিয়ে আসছেন।

ঢাকায় কর্মরত নারী সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিচ্ছেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন, মেধা ও সৃজনশীলতায় ঘাটতি নেই; কিন্তু তারপরও অনেকেরই পদোন্নতি হচ্ছে না। রাতের শিফটে কাজ করতে পিছপা হন না নারীরা। কিন্তু তাদের গভীর রাতে বাড়িতে পৌঁছাতে গাড়ি দিতে অনেক পত্রিকা কর্তৃপক্ষ রাজি নয়। অধিকাংশ নারী সাংবাদিক এখনো ডেস্কে কাজ করছেন। দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের সুযোগও তাদের কম দেয়া হয়। কর্মের অনিশ্চয়তা, বেতন বৈষম্য তো আছেই। ডিপ্লোম্যাটিক, অপরাধ বিটে বর্তমানে কয়েকজন নারী সাংবাদিক কাজ করছেন। রাজনীতি বিটেও এখন অল্প কয়েকজন নারী রিপোর্টার কাজ করছেন। কিন্তু তারপরও তাদের অনেকের কণ্ঠেই হতাশার সুর!

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্যযোগ্য, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে একজন নারী সাংবাদিকের কাজের গুণগত মান নিয়ে আলোচনা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কথা হয় তার চালচলন, আচার-ব্যবহার, পোশাক-আশাক ইত্যাদি নিয়ে, যা কখনই কারও কাম্য নয়। গণমাধ্যম হাউজগুলো এইসব নিরসনে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রহণ করে না।

অন্যদিকে নারীদের প্রতি তথাকথিত ভরসা করতে না পারার মানসিকতাটি এখনো রয়ে গেছে মিডিয়া হাউজগুলোতে। এটি অতীতেও ছিলো বর্তমানে রয়েছে। রয়েছে ব্যাপকভাবে। নারী সাংবাদিকরা অনেক হার্ড নিউজ কাভার করার পরও অধিকাংশ কর্তাব্যক্তিই মনে করেন, নারী সাংবাদিকরা কাজ করতে পারেন না। তারা কাভার করবেন সফট্ স্টোরি। তাদের জন্য উপযুক্ত স্থান নারী শিশু বিট, সংস্কৃতি কিংবা পরিবেশ। যেসবের জায়গা পত্রিকার অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। হার্ড স্টোরি করার যোগ্যতা এখনো তাদের হয়নি। এবিষয়টি যেন পুরুষপ্রধান এজগতের মানুষগুলোর মনে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। যদিও অনেকেই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, নারী সাংবাদিকরা অনেক সময় পুরুষদের চাইতেও বেশি সচেতন, বিবেকবান, সৎ, অধ্যাবসায়ী ও পরিশ্রমী। যারা এরকম করে ভাবতে পারেন না তাদেরও হয়তো দোষ দেয়ার কিছু নেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব সময়ই মেয়েদের প্রতি এরকম দৃষ্টিভংগী পোষণ করা হয়। এরকম সমাজে মেয়েদের নিজেদেরই এ জায়গায় সংগ্রাম করে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। নারীকে শ্রদ্ধা আর সম্মানের জায়গাটা অর্জন করে নিতে হবে যোগ্যতা আর দক্ষতা দিয়ে।

ঘ.
আর্টিকেল-১৯ আয়োজিত ওই গোলটেবিল বৈঠকে আরো জানানো হয়, গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের সংখ্যা বাড়লেও তা এখনও মাত্র ৭ শতাংশ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।

প্রকৃত অর্থে মিডিয়া হাউজগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে আরো বেশিসংখ্যক নারী থাকা জরুরী। মিডিয়াজগতে নারীর পদচারণা পুরুষদের চেয়ে অনেক পরে শুরু হয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে এখনো তারা খুব বেশি সংখ্যায় আসতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রেই উপরের পদগুলোতে তাদের রাখা হয় এক ধরনের পরিকল্পনা করেই। অথচ যদি বেশি সংখ্যক নারী উপরের পদগুলোতে আসেন তাহলে হয়তো নারী সাংবাদিকদের এ বিপন্ন অবস্থার পরিবর্তন হলেও হতে পারে। পাশাপাশি অবশ্য এটাও দিবালোকের মতো সত্যি, আমাদের দেশে এখনো অনেক পুরুষই নারীকে উর্ধতন অবস্থানে মেনে নিতে পারেন না। ফলে নানারকম অসহযোগিতা করে নারী বসকে বিপদে ফেলতে পারলে তারা মহাখুশি হন। তারপরও বহুসংখ্যক মেয়ের উচ্চপদে উঠে আসা ছাড়া আপাততঃ নারী সাংবাদিকদের প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভংগী বদলানোর অন্য কোন বিকল্প পথ চোখে পড়ছে না। যদিও আমাদের সমাজে খুব কম সময়ই মেয়েরা তাদের যোগ্যতা বা দক্ষতা অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে পদোন্নতি পান। বেশির ভাগ সময় এসব ক্ষেত্রে এতো বেশি দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা থাকে যে যোগ্যতাসম্পন্নরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পদ পান না। অবশ্য এটি তো আমাদের জাতীয় প্রবণতা, এতে দুঃখিত বা হতাশ না হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতেই হবে।
কিন্তু কথা হলো এ যুদ্ধ আর কতদিন চলবে! নারী সাংবাকিদের চলার পথ কবে হবে মসৃণ?

লেখক পরিচিতি: আইরীন নিয়াজী মান্না
নারী বিষয়ক সম্পাদক : ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.