কন্যাশিশু মানেই ১১১টি গাছ, আর নিশ্চিত শিক্ষা

Women-with-saplings-West-Bengal-India.jpg.650x0_q85_crop-smart-638x428উইমেন চ্যাপ্টার: সংসারে সন্তান জন্মের পর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিভিন্ন রীতি পালন করা হয়। উন্নত বিশ্বে মেয়ে জন্মালে ঘর ভরে যায় গোলাপি রংয়ের পোশাক-আশাকে, আর ছেলে হলে আকাশি বা নীল রংয়ে। সেইসাথে অন্যান্য উপহার তো থাকেই। ভারতীয় উপমহাদেশে স্বর্ণের জিনিসের চলও ব্যাপক আর্থিক সঙ্গতির ওপর নির্ভর করে। তবে ভারতের রাজস্থান রাজ্যের একটি গ্রাম একেবারেই ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়েছে এক্ষেত্রে।

সেখানে একটি মেয়ের জন্মের পর তার নামে ১১১টি গাছ রোপন করা হয়। শুধু তাই নয়, রীতিমতো ঘটা করে  সেই গাছের যত্ন নিয়ে বড় করে তোলা হয়।

গ্রামটির নাম পিপলান্ত্রি। কোনো সংসারে যখনই কোন মেয়ে জন্মায়, তার নামে ১১১টি গাছ লাগানো হয়। মেয়েটি বড় হতে থাকে, সে জানে যে এই গাছগুলো তার। ভারতের অধিকাংশ গ্রামে যখন কন্যা সন্তান জন্মানোকে এখনও অভিশাপ হিসেবেই দেখা হয়, এখনও যখন গর্ভপাতের সংখ্যা অনেক বেশি, সেখানে এমন একটি উদ্যোগ সত্যিই নজর কাড়ে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে যৌতুক প্রথার কারণে মেয়েদের জীবন এখনও অভিশপ্ত হয়ে আছে। কোনো কারণে জন্মের পর প্রাণে বেঁচে গেলেও তারা যথাযথ লেখাপড়ার সুযোগ যেমন পায় না, তেমনি ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়।

নারী নির্যাতনের সংখ্যাও তাই অনেকগুণ বেশি।  সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত ‘ইন্ডিয়াস ডটার’ তথ্যচিত্রটি ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে ভারতে মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার কারণেই।  আইনপ্রণেতারাও যখন বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তৎপর, ঠিক সেই মূহূর্তে রাজস্থানের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে সমাজের এসব অসঙ্গতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে কন্যা শিশুদের প্রতি সম্মান দেখানোর ঘটনাও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, তাদের এই পদক্ষেপ সমাজে মেয়েদের অবস্থানকে পাল্টে দেবে। মেয়েদের প্রতি সমাজের যে চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি, তারও পরিবর্তন ঘটাবে।

গ্রামটির সাবেক নেতা শ্যামসুন্দর পালিওয়াল প্রথমে শুরু করেন এই প্রথার। অল্প বয়সে মারা যাওয়া তার মেয়ের প্রতি সম্মান জানাতেই তিনি এই উদ্যোগ নেন। পালিওয়াল এরপরে আর নেতা না থাকলেও তার এই উদ্যোগ অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং আস্তে আস্তে সবাই নিতে শুরু করে।

Treesগ্রামের যে কোনো পরিবারে কন্যাশিশু জন্মালে গ্রামবাসীরা সবাই মিলে তার জন্য একটি ‘নির্ভরতা আ আস্থার’ জায়গা গড়ে তোলেন। শিশুটির বাবা-মা ৩১ হাজার রুপি (৫০০ ডলার) এক-তৃতীয়াংশ অর্থ জমা দেন। এই অর্থ দিয়ে শিশু কন্যাটির নামে ২০ বছরের একটি তহবিল গড়ে তোলা হয়। মেয়েটি যাতে কোনভাবেই তার বাবা-মায়ের জন্য আর্থিক বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, সেজন্যই এই ব্যবস্থা।

এই ট্রাস্টের জন্য বাবা-মাকে একটি আইনী পদক্ষেপ নিতে হয়। তারা একটি অ্যাফিডেভিট চিঠিতে সই করেন, যাতে লেখা থাকে, ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত মেয়েটিকে তারা বিয়ে দিতে পারবেন না। সেইসাথে যথাযথ শিক্ষাও তাকে নিশ্চিত করতে হবে। এই অ্যাফিডেভিটে মেয়েটির নামে লাগানো ১১১টি গাছের যথাযথ যত্ন নেয়ার মুচলেকাও দেয়া হয়।

কন্যা শিশুর জন্মের সাথে সাথে গাছ লাগানোর এই অনুশীলনটি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সমর্থনে পরিবেশগত একটা দিকও নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি গ্রামটিতে মেয়েশিশুদের কেবল স্বাগত জানানোই হচ্ছে না, পরিবেশগত ভারসাম্যও গড়ে তোলা হচ্ছে একইসাথে।

গেহরিলাল বালাই নামের একজন বাবা, যিনি গত বছর ১১১টি গাছ লাগিয়েছেন, হিন্দুস্তান টাইমসকে তিনি বলছিলেন যে, গাছগুলোর দিকে তাকালে তার মনে হয় যেন তারই মেয়েটি ঘুমিয়ে আছে। এই গাছগুলো এই গ্রামে কন্যাশিশুদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। গ্রামবাসীরাও এগুলোকে রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি তারা  অ্যালোভেরা গাছও লাগাচ্ছেন।

গ্রামটির সামাজিক এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্যের এই সাযুজ্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখে পালিওয়ালের প্রবর্তিত এই প্রথা কমিউনিটি সদস্যদের জন্য একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যত গড়ে দিয়েছে।  গত ছয় বছরে পিপলান্ত্রি গ্রামটিতে প্রায় ২৫ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। গ্রামবাসীদের মতে, এই প্রথা তাদের কমিউনিটিতে নাটকীয়ভাবে অপরাধের মাত্রাও কমিয়ে দিয়েছে। আর কন্যাশিশুর প্রতি তাদের যে অনাগ্রহ ছিল অতীতে, তাও মিলিয়ে গিয়ে নতুন করে ভালবাসা, স্নেহ জায়গা করে নিয়েছে সেখানে। মেয়েরা আর গলগ্রহ বা বোঝা নয় গ্রামটিতে, বরং তারা অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী।

শেয়ার করুন:
  • 289
  •  
  •  
  •  
  •  
    289
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.