ক্রীড়া পাতায় কতভাগ থাকে নারী খেলাধুলা ?

monija
লেখক: মনিজা রহমান

মনিজা রহমান (উইমেন চ্যাপ্টার): ওই যে খেলার মাঠে নারী ! কই কোথায় দেখছি না তো ! কেন ওই যে চিয়ার্স গার্ল আছে না ? ওরা তো মেয়েই। মাঠে খেলছে পুরুষরা। সবার মুখে তুমুল আলোচনা পুরুষ খেলোয়াড়দের স্কিল-এক্সিলেন্স নিয়ে। সেখানে এক কোনায় নেচে গেয়ে বেড়াচ্ছে একদল মেয়ে। কারণ ? বিরতির সময় দর্শকদের বিনোদন দেয়াটা তাদের কাজ।
বর্তমান বিশ্বকে বলা হয় করপোরেট দুনিয়া। সেখানে মেয়ে মানে গুড প্রডাক্ট। খেলাধুলার অনুষ্ঠানে নারী উপস্থাপকরা কখনও খেলাধুলা জগতের কেউ হন না। সুন্দর মুখের কাউকে দিয়েই অনুষ্ঠানের গ্ল্যামার বৃদ্ধি হয়।
নারী খেলোয়াড়রা করবে উপস্থাপনা ? আরে ওরা তো জরিনা-মর্জিনা। কিন্তু আপনার মেয়ে কিংবা আপনার বোনকে কি খেলাধুলায় দিয়েছেন ? নাতো। আরে ওদের লেখা পড়া আছে না ? ক্যারিয়ার আছে না ? তাছাড়া রোদে-বৃষ্টিতে মাঠে দৌড়ালে চেহারা নষ্ট হয়ে যাবে। তখন ওকে বিয়ে করবে কে ?
এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীর। এদেশে নারী খেলোয়াড়রা না হয় এখনও অনেক পিছিয়ে আছে, কিন্তু উন্নত দেশেও এমন মানসিকতার কারণ কি ?
পৃথিবীর কয়েকজন গ্রেট নারী ক্রীড়াবিদের নাম উচ্চারণ করলে প্রথমেই আসবে অস্ট্রেলিয়ার সুসি ও’ নীলের নাম। আর ? ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিক গেমসে বঞ্চিত স্বজাতির পতাকা হাতে নিয়ে সবার আলোচনার মধ্যমনি ছিল যে মেয়েটি। তার নাম ক্যাথি ফ্রিম্যান। আদিবাসী এক সংগ্রামী নারী। অথচ অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়ায় মাত্র আট ভাগ থাকে নারীদের খেলাধুলা।
ইংল্যান্ডে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ নারী। অথচ সেখানে এই হার আরো অনেক কম ৫ ভাগ। আমেরিকান মিডিয়ায় নারীদের খেলাধুলার খবর থাকে শতকরা ৯ ভাগ। এই আমেরিকায় পুরুষ ফুটবল ম্যাচের চেয়ে নারী ফুটবল ম্যাচে দর্শক সংখ্যা বেশী হয়।
নারী খেলোয়াড়দের নিয়ে লেখাতেও কেমন যেন একটা গন্ধ থাকে। কিম ক্লিস্টার্স গ্র্যান্ডস্লাম জিতলে লেখা হয় চ্যাম্পিয়ন মাম। অথচ রজার ফেদেরার বাবা হবার পরে সেটা লেখা হয় না।
সেদিক থেকে রক্ষণশীল দেশ হিসেবে পরিচিত ইরান অনেক এগিয়ে। শুনলে অবাক হতে হয় যে, ইরানের মিডিয়ায় নারীদের খেলাধুলার খবর থাকে শতকরা ৪০ ভাগ। এটা খুব বিস্ময়কর। কারণ ইরানী মেয়েরা এখনও আহামরি কিছু করে বসেনি বিশ্ব ক্রীড়ায়।
মেয়েদের স্কিল-পারফরমেন্সের চেয়ে গ্ল্যামারের খবরটাই ঘুরে ফিরে বেশী আসে মিডিয়ায়। ভারতের কথাই ধরুন। সানিয়া মীর্জা যাই করুক, মিডিয়ার শিরোনাম। কখনও মাঠের খবর দিয়ে, কখনও মাঠের বাইরের খবর দিয়ে। সানিয়া মীর্জা আন্তর্জাতিক টেনিস সার্কিটে সাফল্য পেয়েছেন, কিন্তু তার চেয়েও অনেক সফল খেলোয়াড় ভারতে আছে। এ্যাথলেটিক্সে পিটি ঊষা, অঞ্জু ববি জর্জ, ব্যাডমিন্টনে সায়না নেহাল, বক্সিংয়ে মেরি কম, ভারত্তোলনে মালেশ্বরী…… কই তাদের কথা কতবার লেখা হয়।
বাংলাদেশের মিডিয়া এখনও নিজ দেশের সানিয়া মীর্জা খুঁজে পায়নি। তাই পরের দেশের খবরই ফলাও করে লেখে। গ্র্যান্ডস্লামের কোন আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে পর্যন্ত না খেললেও আন্না কুর্নিকোভা ক্যামেরার সামনে পোজ দেয়ায় সবার চেয়ে এগিয়ে। খেলা থাকুক না থাকুক, থাকবে মারিয়া সারাপোভার খবর। পুরুষ বীচ ভলিবলের কোন খবর বা ছবি কোনদিন ছাপা হয় না। তবে মেয়েদেরটা বিশাল ছবি দিয়ে।
মিডিয়ার কর্তাব্যাক্তিরা ধরেই নেন, তাদের সমস্ত দর্শক কেবল পুরুষ। আর রিপোর্টাররাও বেশীরভাগ পুরুষই হন। তারাও মেয়েদের বাইরের রূপটাই খোঁজেন। মেয়েটার সাফল্যের পিছনে ত্যাগতীতিক্ষা-সংগ্রাম পুরুষ রিপোর্টারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে খুব কমই।
আমি একটি পত্রিকার নীতি নির্ধারককে জানি। তিনি নিয়মিত তার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদককে নির্দেশ দেন, খেলার পাতায় কোন নারীর খোলামেলা ছবি ছাপানোর জন্য। দৈনিক পাতায় নিয়মিত খবরের ভিড়ে জায়গা না করতে পারলে অবশ্যই সাপ্তাহিক খেলার ফিচার পাতায়। সমাজের এই সমস্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যাক্তিরাই বয়ে বেড়ান এরকম বিকৃত মানসিকতা !

লেখক পরিচিতি: ক্রীড়া সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.