বিদেশি বাবা, দেশি বাবা

প্রভাতী দাস (উইমেন চ্যাপ্টার): উইক এন্ড কল করছি, একাই তিন হাসপাতাল সামলাতে হয় এসময়। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত। রুগী খুব বেশী না থাকলেও দূরত্বের জন্য ড্রাইভেই অনেক সময় লেগে যায়। তাই দিনের শেষে বিধ্বস্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরি, আজো তাই।
বাড়িতে দুই মেয়ে অধীর অপেক্ষায়, পাখির বাসায় ছানাদের মতো, মা এলে তবে রাতের খাওয়া, ঘুমোতে যাওয়া। আজ একটু তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হয়ে যাবে ভেবে আগেই বরকে ফোন করে বলেছিলাম, ফ্রিজ থেকে চিকেন নামিয়ে মেরিনেড করে রাখতে যাতে ফিরেই রান্না করতে পারি। বাবা-মেয়েদের অবশ্য ক্যারি আউট-এ আপত্তি নেই, কিন্তু সারাদিন বাইরে হাবিজাবি খেয়ে রাতে একটু দেশি খাবার না হলে আমারই গলা দিয়ে নামতে চায় না। তাই একান্ত অপারগ না হলে রান্না করে নেই কিছু না কিছু। আজও তাই করলাম, বিরিয়ানিটা দমে বসিয়ে স্নান করতে ঢুকেছি, কর্কশ শব্দে পেজার বাজা শুরু হলো। শনিবার সন্ধ্যায় এর আওয়াজ শুনলে রীতিমত কান্না পায়, কি জানি কখন না আবার কোন ইমারজেন্সি ‘র জন্য হাসপাতালে ফিরে যেতে হয় ! দ্রুত শাওয়ার শেষে বেরিয়ে আসার আগেই আরও দুবার পেজার বাজলো ! বুঝে গেলাম, এ নিশ্চিত কোন ইমারজেন্সি।
কল ব্যাক করতেই পরিচিত ইমারজেন্সি রুম চিকিৎসকের এর উৎকণ্ঠিত গলা। যা বলল তাতে বুঝলাম, একটা সতের বছরের কিশোর রুগী, শরীরে জল জমে ফুলে গেছে, ফুসফুসে অতিরিক্ত জল জমায় শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছিল, শ্বাসনালীতে টিউব ঢুকিয়ে কৃত্রিমভাবে শ্বাস দেয়া হচ্ছে। কিডনির অবস্থা খুব খারাপ, পটাসিয়াম অনেক হাই, ওকে বাঁচাতে দরকার ইমারজেন্সি ডায়ালাইসিস। এই বর্ণনা শোনার পরে আমার জিজ্ঞাস্য শুধু একটা, “ওর ব্লাড প্রেশার ঠিক আছে, ডায়ালাইসিস করা যাবে তো”? জানলাম, ছেলেটির ব্লাড প্রেশার অনেক হাই। ওকে বললাম,’আমাকে ডায়ালাইসিসের জন্য একটা ক্যাথেটার আর ওর পরিবারের থেকে কনসেন্ট জোগাড় করে দাও”। জানলাম যে ছেলেটির বাবা ওর সাথেই আছে কনসেন্ট এর কোন অসুবিধা নেই, ওকে ডায়ালাইসিসের কথা বলাও হয়েছে। আমার ঐ হাসপাতালে যেতে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে জানিয়ে ওকে বললাম, যতটুকু সম্ভব ম্যানেজ করতে আমি না যাওয়া পর্যন্ত।
ঝড়ের বেগে রেডি হয়ে বেরুবো, মেয়েদের মুখ শুকনো, ছোট মেয়ে কাঁদতে শুরু করলো ! ওকে একটু বললাম ছেলেটির কথা, সে কতো অসুস্থ, কেন মাকে যেতে হবে। ও সাথে সাথে কান্না থামিয়ে, আমাকে ‘বাই’ দিয়ে দিল। আমার পরিশ্রান্ত চেহারা দেখে মেয়েদের বাবার বোধ হয় খুব মায়া হচ্ছিল, ও জানতে চাইলো ওরাও আমার সাথে আসবে কিনা। তাহলে ও ড্রাইভ করবে, আমার একটু রেস্ট হবে। প্রস্তাবটা লোভনীয় হলেও মেয়েদের অনর্থক কষ্টের কথা ভেবে একাই বেরিয়ে গেলাম।
আমার কাজের এই জায়গাটা রুরাল আমেরিকা, যদিও ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ৭০ মাইলেরও কম দূরত্বে। স্থানীয়দের অনেকের-ই পড়ালেখা খুব কম, হাইস্কুল মাড়াননি। বেশীরভাগই চাষি, কিছু জেলে, চেসাপিক বে'(‘Chesapeake Bay) তে মাছ আর কাঁকড়া ধরে জীবন চালায়।
প্রথম প্রথম ভীষণ অবাক হতাম অনেকেই ওষুধের নাম বানান করে পড়তে পারত না বলে ! বেশকিছু গরীব লোকজনও আছে যারা ক্যান ফুড আর ফাস্টফুড খেয়ে কাটায়। হেলথ ইনস্যুরেন্স নেই, ওষুধ কিনবার টাকা নেই, তবুও সিগারেট আর অ্যালকোহল ছাড়া চলে না। আর সে কারণেই বিভিন্ন ক্যান্সার (বিশেষ করে লাংস/প্রস্টেট/ব্রেস্ট) ও খুব কমন। এখানে এখনো তামাক চাষ হয়, যদিও আগের তুলনায় সামান্য। তবু সব মিলিয়ে অসামান্য সুন্দর এ জায়গাটা, আটলান্টিক মহাসাগর এর চেসাপিক বে ঘেঁষে দিগন্ত বিস্তৃত চাষাবাদের জমি, ঘন সবুজ গাছপালা, বন। কাঠবেরালি, হরিণ, গাঙচিল আর বুনোহাঁস ঘুরে-উড়ে বেড়ায় যত্রতত্র, সহজ সরল সব মানুষ। কেমন জানি খুব সহজেই আমার আপন হয়ে গেছে। নিজের গ্রামের কিছুটা আমেজ পাই। এই ভালোলাগার মূল্যও দিতে হয়, যদিও দৃষ্টিনন্দন তবু বড় দীর্ঘ ড্রাইভ করে কাজে যেতে হয় প্রতিদিন। আজ অনেক রাত হয়ে গেছে, কিছুই দেখবার নেই। গাড়ি চালাতে চালাতে ছেলেটির কথাই ভাবছিলাম। এ পর্যন্ত যা হিস্ট্রি পেয়েছি তাতে জানলাম, বাড়িতে স্কুলিং করা এই ছেলে এবং তার বাবার আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে তীব্র অবিশ্বাস। তাই শৈশবকালীন কোন টিকাও নেয়া হয়নি তার, এতো অসুস্থ হলেও এরা বিভিন্ন রকম ফোক বা অল্টারনেটিভ মেডিসিন (ঝাড়/ফুক জাতীয়) ছাড়া আর কোন চিকিৎসা গ্রহণেই রাজী হয় না। আজ ছেলে যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে তখনই কেবল বাবা শরণাপন্ন হয়েছেন আধুনিক চিকিৎসার। এদেশেও এমন ঘটনা ঘটে !
ক্লান্ত-শ্রান্ত আমার রাগ হচ্ছিল প্রচণ্ড, শনিবার রাতে ৭০ মাইল ড্রাইভ করছি এক নির্বোধ পিতার নির্বুদ্ধিতার খেসারত দিতে, কে জানে ওকে প্রাণে বাঁচানো যাবে কিনা ! রাস্তা থেকে কল করে ডায়ালাইসিস নার্সকে বললাম এসে সব গুছিয়ে নিতে আমি আসার আগেই।
হাসপাতালে পৌঁছে আইসিইউ’তে ঢুকে টের পেলাম ছোট্ট এই শহরতলীর ছোট্ট হাসপাতালে এই ছেলেটিকে নিয়ে বেশ গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। রুগি আইসোলেশন-এ, মাস্ক, গাউন, গ্লাভস লাগিয়ে ঘরে ঢোকার পরও তীব্র দুর্গন্ধ নাকে লাগল। রুগি ১৭ বছরের কিশোর, শ্বাসনালীতে টিউব ঢুকিয়ে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। গায়ে অন্তত পঞ্চাশ কেজি জল জমে আছে, চামড়া চুইয়ে, চুইয়ে পড়ছে জল, সারা গায়ে দুর্গন্ধময় ক্ষত, কিডনি কাজ করছে না মোটেও। ছেলেটির বাবার খোঁজ করতেই নার্স জানালো, সে চার্চে প্রার্থনায়, আমার জন্যই অপেক্ষা করছে। কয়েক মিনিটেই বাবা এলেন, মধ্য পঞ্চাশের কাঁচাপাকা চুলের এক সাদা লোক, প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন মুখ। আমাকে দেখে যেন একটু স্বস্তি পেলেন। পরিচয় দিয়ে হিস্ট্রি নেয়া শুরু করলাম। প্রায় মধ্য রাতে এই বাবার সাথে কথা বলতে বলতে আমি পুরোই হতভম্ব ! বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, আমি একবিংশ শতাব্দীতে বসে এক আমেরিকান বাবার কথা শুনছি !
দুই বছর আগ হঠাৎ করেই প্যাট্রিক-এর প্রথম পায়ে জল জমতে শুরু করে, সেসময় ওরা হরিণ শিকার করে তার মাংস খাচ্ছিল খুব। বাবা এবং ছেলের চিরকালই আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রতি চরম অবিশ্বাস তাই ডাক্তার দেখায়নি। ওদের ধারনা কম সিদ্ধ হওয়া মাংস থেকে কিছু একটা জীবাণু ঢুকে গেছে ওর শরীরে। তাই তারা দুজনে মিলে শুরু করে বিভিন্ন দেহ পরিশোধন প্রণালী (ক্লিনজিং থেরাপি), নেট ঘাঁটাঘাঁটি আর ফোক চিকিৎসকদের কাছ থেকে নেয়া কিছু ক্লিনজিং টনিক এবং টোটকার নাম দেখালেন উনি আমাকে, সংখ্যায় ২০-২৫টি হবে। কিন্তু প্যাট্রিক-এর অবস্থার কোন উন্নতি হয় না। অবশেষে খুব বেশি জল জমে যাবার পর তারা একজন কার্ডিওলজিস্টের কাছে যায়, সেখান থেকে ডিসি’র একটা হাসপাতালে একজন নেফ্রলজিস্টকে দেখানো হয়। নেফ্রলজিস্ট জানান, ওর নেফ্রটিক সিনড্রোম হয়েছে, কিডনি বায়োপসি এবং ইমিউনো সাপ্রেসিভ ঔষধ দরকার। কিন্তু বাবা আর ছেলে ওসব নিয়ে অনেক পড়াশোনার পর ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সে চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আবারো তাদের টোটকায় ফিরে আসে। সেও প্রায় বছর খানেক আগের কথা। গত ছয়মাস ধরে ওর চামড়া ফেটে জল ঝরছে, বাবা প্রতিদিন ছেলেকে পরিষ্কার করে ড্রেসিং করেছেন। মাস তিনেক আগে থেকে ওর ঘা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। তারপরও প্রতিদিন তিনি নিজ হাতে করে গেছেন ছেলের ক্ষতের যত্ন আর ড্রেসিং, আরও কঠোর নিয়মে চলেছে ওর পরিশোধন থেরাপি। আজ সন্ধ্যায় প্যাট্রিক যখন প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট পেতে শুরু করে তখন বাবা ভয় পেয়ে এ্যাম্বুলেন্স ডাকেন !
আমি সত্যি সত্যি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম কয়েক মুহূর্ত। তারপর জানতে চাইলাম, “তুমি এতদিন সব চিকিৎসা এভাবে এড়িয়ে গেলে, আজ হঠাৎ করে কি এমন ঘটল যে তুমি ছেলেকে অ্যাম্বুল্যান্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে এলে”? বাবা জানান, “ছেলেটার আজ প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হল, ওর এমন দম যায় যায় অবস্থা, আমার মনে হচ্ছিল যে কোন মুহূর্তে ও মরে যাবে, আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। ও ছাড়া পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই, ওর চার বছর বয়সে ওর মা মারা যাবার পর থেকে ওকে আমি কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি। ওকে আমি হারাতে পারিনা, কিছুতেই না। ডাক্তার প্লিজ, ওকে বাঁচাও। আমাকে বলো, কোথায় সাইন করতে হবে, আমাকে কি কি করতে হবে……, তোমরা শুধু ওকে বাঁচাও”!! আমি ওর কাছ থেকে কনসেন্ট নিয়ে আক্ষেপ করে বললাম, “সেই তো এলেই, কিন্তু এত দেরি করলে কেন, কেন ছেলেটার অবস্থা চোখের সামনে এত খারাপ হতে দিলে”? ও কেবল বলল, “আমি ওকে শুধু আড়াল করতে চেয়েছি, ওকে ঐসব মারাত্মক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া’র হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছি, ওর কোন ক্ষতি হোক ওসব আমি কোনদিন চাইনি “! প্রতিশ্রুতি দিলাম, আমার সাধ্যমত চেষ্টা করবার।
ডায়ালাইসিস নির্বিঘ্নেই শুরু হলো, আমি বসে আছি প্রথম ৪৫ মিনিট কাটবার অপেক্ষায়, অর্ডার, নোট এসব শেষ করে। সেই মধ্যরাতে একা আইসিইউ তে বসে মনে পড়ছিল আমার বাবার কথা………।
ঘটনাটা ‘৮৭ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়, আমি উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে এ পড়ি। বড়দা বুয়েটে, ছোটভাই সদ্য এসএসসি পাশ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছে। আচমকা একদিন দুপুরে ছোটভাই ফোন করে জানাল, বড়দা প্রচণ্ড অসুস্থ, হরতালের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। এখনো ঠিক ডায়াগনসিস হয়নি, কিন্তু বেশ সিরিয়াস অবস্থা বলেই মনে হচ্ছে। মা ঠাকুরের সামনে বসে অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন, বাবার অস্থির পায়চারি, আর ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস, মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া মুখ। বাসায় রান্না খাওয়া সব বন্ধ, এক দমবদ্ধ পরিবেশ। আমি কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না, মাকে বোঝাতে চাই, কিন্তু কি বোঝাবো, নিজেও কাঁদছি ! বাবার সবচেয়ে বেশি অসহায়ত্ব, ছেলের এ অবস্থায় তাঁকে টাঙ্গাইলে আটকে থাকতে হচ্ছে। ভীষণ রকম কড়া হরতাল, গাড়ি দূরে থাক কোন ট্যাক্সি, এমনকি রিক্সাও চলেনি সেদিন। অবশেষে পৃথিবীর সবচাইতে দীর্ঘ সেই হরতাল ভাঙার সাথে সাথে গাড়ি নিয়ে ঢাকা রওনা হলাম আমরা। সারা রাস্তা সবাই চুপ, শুধু মাঝে মাঝে ধরা গলায় মাকে দেয়া বাবার আশ্বাস, “সব ঠিক হয়ে যাবে”।
ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউ তে বড়দা, শ্বাসনালীতে টিউব দেয়া, ততক্ষণে একটা ডায়াগনোসিস করেছেন ওয়ার্ডের এ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্টার, “গিয়ান ব্যারে সিন্ড্রম”(Guillian-Barre Syndrome)। মনে পড়ে বাবা সেদিন সেই এসিস্ট্যান্ট রেজিস্টার সাহেবের হাত ধরে ঠিক প্যাট্রিক এর বাবার মতো করেই বলেছিলেন, “ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলেকে বাঁচান”। উনি আমাদের আশ্বাসই শুধু দেননি, যথাযথ চিকিৎসাও করেছিলেন বড়দার। পরে মেডিকেল বোর্ড আর স্পাইনাল ফ্লুয়িড পরীক্ষা করে এ ডায়াগনোসিস কনফার্ম হয়। বড়দা সে যাত্রা বেঁচে যায় ! ওকে বাড়ি নিয়ে আসতে বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল, আমরা প্রতিদিন আইসিইউ এর সামনে বসে থাকতাম, আর বাবা আমাকে বোঝাতেন, ডাক্তার হলে এমনিভাবেই কতো মানুষের জীবন আমিও বাঁচাতে পারবো। সত্যি বলতে, ঐ ঘটনাটা সেই অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্টারকে রীতিমত এক দেবতার আসনে বসিয়ে দিয়েছিল আমাদের সবার মনে। বাবা-মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁর কথা ভোলেননি, প্রাণভরে তাঁকে আশীর্বাদ করেছেন ! বাবার প্রচণ্ড আগ্রহ আর অনুপ্রেরণাতেই আমি দু’বার না ভেবে ডাক্তারি পড়েছিলাম।
খুব রাগ করতে চাইছিলাম প্যাট্রিক এর বাবার উপর, ছেলেটা তো নিতান্তই বাচ্চা, কিন্তু তার বাবা কি করে এমন বুদ্ধিহীন হন! মনে পড়ল, স্টিভ জবস এর কথা, অ্যাপল এর সিইও, পৃথিবীর স্মার্টেস্ট মানুষদের একজন হয়েও যিনি প্যাঙ্ক্রিয়াটিক ক্যান্সার এর চিকিৎসার জন্য বেছে নিয়েছিলেন অল্টারনেটিভ মেডিসিনের; আর এতো অর্ধ-শিক্ষিত গ্রাম্য এক পিতা ! রাগ আর করা হয়না, কেন যেন এক অসহায় বাবার করুণ আর্তি কানে বাজতে থাকে বারবার…, “আমি ওকে শুধু আড়াল করতে চেয়েছি, ওর কোন ক্ষতি হোক ওসবে আমি কোনদিন চাইনি…, ওকে আমি হারাতে পারিনা……, কিছুতেই না। ডাক্তার প্লিজ, ওকে বাঁচাও, ও ছাড়া পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই……………”। ফিরে আসার আগে তাকে আবারো খুঁজে পাই আইসিইউ’র ওয়েটিং রুমে, হাতে বাইবেল নিয়ে চোখ বুঁজে ছেলের জন্য প্রার্থনা রত!
( প্যাট্রিক বেঁচে গেছে সে যাত্রা, পরের দিনই ওর শ্বাসনালীর টিউব খুলে দেয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ প্রতিদিন ডায়ালাইসিস করার পর ওর ফোলা কমে প্রায় স্বাভাবিক হলে বাড়ি ফিরে যায় ও। ওর কিডনি দুটো চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে গেছে, সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করতে আসে ও। নতুন প্রাণ পাওয়া সতের বছরের কিশোর, লাজুক হাসি দেয় আমাকে দেখলেই। ওর বাবার সাথে আর দেখা হয়নি আমার, তবে মাঝে মাঝে ছেলেকে দিতে ডায়ালাইসিস সেন্টারে আসেন শুনেছি। প্যাট্রিক ওর পূর্ব স্বভাবে ফিরে গেছে, ডায়ালাইসিস এ নিয়ম করে এলেও অনেক বোঝানো সত্ত্বেও কিডনি বায়োপ্সিতে কিছুতেই রাজী হয়নি। বিভিন্ন ওষুধসহ অনেক কিছুই নিতে রাজী হয় না, উত্তর চাইতে চাইতে আর বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত হয়ে আমিও ছেড়ে দিয়েছি আজকাল। ওর বরাবর মুচকি হেসে দেয়া একই উত্তর, “আগে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলো ভাল করে পরে নেই, পরে তোমাকে জানাব”।….. যেমন বাবার তেমন ছেলে…..!)
সবাইকে বিশ্ব বাবা দিবসের শুভেচ্ছা, Happy Father’s Day……………..!
( ঘটনার চরিত্রগুলো মূলত কাল্পনিক, জীবিত কারো সাথে কোনরকম মিল একেবারে কাকতালীয়)

[divider]
লেখক পরিচিতি: প্রভাতী দাসprovati

নেফ্রলজিস্ট, যুক্তরাষ্ট্র।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.