‘কালের কলঙ্ক ভুলে চলে পথ’

mens-world-3সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: জীবনে প্রথমবার যখন স্থানচ্যুত হলাম বাড়ির পাশের মাঠের ঘাসগুলোর জন্যও কান্না পেত তখন। যে মাঠের ধুলোয় ঘাসে লেপ্টে ছিল আমার পুরোটা শৈশব। জীবনের প্রথম পা পাতানো তো আমার এই ঘাস-ধুলায়।  আমগাছটার ঝোলানো ডালটাকে জড়িয়ে ধরে বুকটা হু হু করে উঠতো। পিছনের বাঁশঝাড়ের পাশে মেঠোপথ, পানিয়েল গাছ, তেতুলতলা, শালুক কুড়ানো দোলাবিল যতই চোখের আড়াল হতে থাকতো ততই শূন্য হতে থাকতো আমার নিজসত্ত্বা। আপন ও পরিচিত মানুষগুলোর জন্য যতটা না খারাপ লাগতো, তার চেয়ে বেশি মনে পড়তো চেনা সন্ধ্যার আকাশ, ভোরের হাওয়া ও দুপুরের তপ্তময়তা! পুকুর পাড়ের সজনে গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে মুখআঁধারী সাঁঝের ঝিঁঝিঁ পোকাদের একটানা গেয়ে চলা সমবেত সংগীত শোনার জন্য ব্যাকুল হতো প্রাণ। আহা! এমন আপন কোথাও কি আছে? আমি ভুলতে চাইনি আমার এই শৈশব। কিন্তু ক্রমে মলিন হতে হতে  ঝাপসা হয়ে গেছে সেই অতীত।

তারপর শুরু হলো জীবনের আদিম লড়াই! ভিন্ন কোন গ্রহে। এখানেও সূর্য ওঠার সাথে সকাল হয়। সূর্যকে ডুবিয়ে দিয়ে সন্ধ্যা নামে। কিন্তু কোথায় সেই আপনাপন?  স্বর্গ থেকে বিতাড়িত আদম সন্তানের মতো পেলাম অনুর্বর একখণ্ড পাথুরে জমিন। তার ফাঁকে ফাঁকে হাজার শ্বাপদ লুকিয়ে ছিল ছোবল মারার জন্য। ছোট্ট শরীরের সামান্য শক্তিতে কোদাল ধরে পাথর ভাঙ্গতে থাকি রোজ। গায়ের সবটুকু জোড়ে যতটা না পাথরের জমিনে ক্ষত হয়, বেশী বিক্ষত হয় আপন হাতের জমিন। রোদ, বৃষ্টিতে ভিজে সে জমিনে ফলাই ফসল, গাছ পালা। আমার অপরিপক্ষ শরীরে আবাস গেড়ে যেমন সন্তান বাড়তে থাকে, তেমন নরম হাতেও ফোসকা পড়ে পড়ে পোক্ত হতে থাকে সেই জমিনের উপযুক্ততা।

আমার হাতে রচিত হলো আমার এক পৃথিবী। সেই ছেড়ে আসা মাঠের ঘাস-ধুলা না থাক, পানিয়েল, তেতুল, সজনে গাছ না থাক, বড় আমগাছটার ঝোলানো ডাল না থাক কচি কচি চারাগাছ থেকে বৃক্ষ হতে থাকলো আপন হাতের রচনায়। কোন ঘাসটি আগাছা আর কোন গাছটি আপন গাছা ঠিক করে করে পুততে থাকলাম মাটিতে। এর মধ্যে পাখি বসতে শুরু করে গাছে। বিকেলে মিষ্টি বাতাস এসে কানে কানে আলাপন জুড়ে দেয়। ঘেমে নেয়ে নেতিয়ে ওঠা শরীর শীতল করে সাঁঝের কুহেলিকা। গাছে ফল ধরে , ফসলের ক্ষেত ভরে যায় সোনায় সোনায়।

ঘরে বাহিরে তখন আমি এক আদিম কৃষানী। ধান থেকে চাল করতে হবে। কিন্তু কিভাবে? কিছুই জানা নেই। দেখিওনি আগে। শুধু অনুমানে নিজহাতে গাছ কেটে বানিয়ে নিলাম ঢেঁকি। জীবনের প্রথম ব্যবহার্য আসবাব ও বন্ধু বলব ঢেঁকিটিকে। কারণ এই ঢেঁকিতে আমি রোজ একটু একটু করে ধান থেকে চাল করতাম।  আর ঢেঁকির পাড়ের ঘষায় কিচির কিচির শব্দ হলে, নিজের মনের হাজার প্রশ্নের জবাব খুঁজে নিতাম সেই যন্ত্রণায়। আবার সেই চালে ভাত রেঁধে ঢেঁকির শরীরে বসে ক্ষুধা মিটাতাম। খেতে খেতেও ঢেঁকির সাথে আপনমনে কথা বলতাম। ঢেঁকিও যেন আমার সব কথা ঢোক গিলে মেনে নিতো বন্ধু ভেবে।

আপন হাতে ভাঙ্গা পাথর যখন মাটি হলো আবার একদিন সময় হলো স্থানচ্যুত হবার। এবার আমার মাথার ওপরের আকাশ, ছোট ছোট ফলবতি গাছ, আমার ধান মাড়াইয়ের উঠান, আমার বন্ধু ঢেঁকি,  কচি কচি গাছের চারা আমাকে কাঁদালো। আমি ভুলতে চাইনি আমার সেই আপন পৃথিবীকে।  কিন্তু রাজ্যদখলের মতো আমার পৃথিবী হারিয়ে গেল অন্য কারো দখলে। আমি ভুলতে চাইনি তাকেও। কিন্তু ক্রমে মলিন হয়ে গেল আমার সেই সৃষ্টিস্মৃতি।

আমি শহরে এলাম। শহরে এসে একটু সভ্য হওয়ার বাসনা আমার তীব্র হলো। বসতি গড়লাম। শহরে জীবন, পরিবেশ, শিক্ষা আধুনিক করতে গিয়ে আমার ঢেঁকি বন্ধুকে সবার আগে ভুলে গেলাম। যদিও সেই বেদখল হওয়া পৃথিবীর মায়া কাটাতে  আমার অনেক সময় কেটেছে।  কিন্তু মোটেও সভ্য হতে পারিনি আমি। বরং শহর আমার সংগ্রামের শক্তি কেড়েছে, ভালবাসার মন কেড়েছে। ঘরের চার দেয়ালের বাইরে আমার কোন আপন জগৎ রাখেনি। আমি নিজের ভিতর নিজের বন্দিশালা নির্মান করে নির্বাসন নিয়েছি তার অন্দরে। শহর  আমাকে অসভ্যই করে দিয়েছে।

এবার আমি স্বেচ্ছায় স্থানচ্যুত হতে চাই। ভিন্ন কোন মানচিত্রে। এদেশের বাতাস, এদেশের মানুষ আর এদেশে মরে যাওয়া আমার স্বপ্নের শোক ভুলতে আমি নির্বাসন চাই অন্য কোন বন্দিশালায়। আমি ভুলে যেতে চাই আমার শৈশব, যৌবন ও জীবনকালের সকল কথকথার।

সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন:
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
    13
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.