হিজাব দিয়ে নারীকে রক্ষার চেষ্টা কতটা যৌক্তিক!

Hijabi nariমনোরমা বিশ্বাস: গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে মুসলিম মেয়েদের পোশাকে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে গেছে, সাধারণ শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের জায়গা করে নিয়েছে হিজাব ও বোরকা। এ পোশাক পছন্দ করেন না এমন অনেক বয়সী মানুষকে অনুযোগ করতে শুনি যে তাঁরা তাঁদের সময়ে এর তেমন প্রচলন দেখেননি অর্থাৎ খোদ মা-খালাদেরই এমন পোশাক পরতে দেখেননি, তারা যা এখন সন্তানদের পরতে দেখছেন। সম্ভবতঃ অনুযোগটি অমূলক নয়। বাঙ্গালী মেয়েদের পোশাক রীতিতে একটা বড়সড় পরিবর্তন সত্যি এসেছে।

ভালো নাকি মন্দ এ বিচারে যাবার আগে দেখে নেই কোন অসতর্কতায় আমাদের সমাজে এর প্রাদুর্ভাব ঘটলো। এর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ সমাজ মনোবিজ্ঞানীরা উদ্ঘাটন করুন এটা তাঁদের ব্যাপার, কিন্তু সাধারণভাবে দেখলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্রমবর্ধমান অশুভ ব্যাপ্তির সাথে পাল্লা দিয়ে যে হিজাব-বোরকা বেড়েছে তা বোধকরি কেউ অস্বীকার করবেন না। অনেকেই এতে খুশি, আবার অনেকে এতে খুশি তো নন, বরং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।

কিছুদিন আগে ভোলার কোন এক প্রত্যন্ত উপজেলার শ্রেণী কক্ষের এক ছবি অনলাইনে বিশেষতঃ ফেসবুকে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। অনেকে পরিহাস করে ছবির ক্যাপশনে লিখে দিয়েছিলেন বিরাট এক জিজ্ঞাসা, জানতে চেয়েছিলেন বলুন তো এ ছবি আফগানিস্তান নাকি পাকিস্তানের কোন প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের? এতটা তোলপাড় হয়েছিল কেন সেদিন? কারণ ঐ শ্রেণীকক্ষের দৃশ্যমান ছবিটিতে স্কুল বেঞ্চে বসে থাকা সমস্ত ছাত্রীর আপাদমস্তক পুরোপূরি বোরকাবৃত ছিল। বাংলাদেশে পটভূমিতে যা ঠিক স্বাভাবিক নয় এমনকি শোভনও নয়।

উন্নত সংস্কৃতির ইউরোপ আমেরিকার পোষাকের ধরণ তাঁদের মত এখানে মতভিন্নতা প্রকাশের সুযোগ নেই কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েদের পোশাক কোনকালে অশোভন ছিল এমন অভিযোগ নিশ্চয়ই কেউ করবেন না।

সাধারণভাবে কিশোরী-তরুণীদের সালোয়ার কামিজ বা বয়সী মেয়েদের শাড়ি ব্লাউজ পরিধান যুগ পরম্পরায় বাঙ্গালী মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হিসেবে সমাজে প্রচলিত এবং আদৃত ছিল এবং এখনো আছেন। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেয়ে এখনো এ পোশাকই নির্দ্বিধায় পরে আসছেন। কোন প্রশ্ন কোন সংশয় জাগেনি তাদে,র কিন্তু আজ সে ঐতিহ্য থেকে সরে গিয়ে কেন ভিনদেশি পোশাক প্রবর্তনের চেষ্টা? এ কারণ অনুসন্ধান আজ সময়ের দাবি।

আমাদের চিরকালীন ঐতিহ্যমন্ডিত পোশাক, যে পোশাকে আমরা অভ্যস্তও বটে, তাকে হটিয়ে দেবার চেষ্টা যে সংস্কৃতি বিরোধী চক্রান্ত বিশেষ তা বুঝে নেবার এবং প্রতিহত করার সর্বাত্বক উদ্যোগ তাই নিতে হবে দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই।

বোরকা বা হিজাবের পক্ষে বহুল প্রচারিত অথচ হাস্যকর যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয় তা হলো এ পোশাক মেয়েদের শ্লীলতাহানীর হাত থেকে বাঁচায়। কিন্তু আসলেই কি তাই? পুরুষের লম্পট প্রবৃত্তি কি মেয়েদের পোশাক দেখেই জাগ্রত হয়? সাধারণভাবে শাড়ি তো কোন অবস্থাতেই উত্তেজক নয়। আমরা যারা নির্বিবাদী নারী, এই ঝামেলা এড়ানোর জন্য নিজেকেই ঢেকে রাখি। কারণ পুরুষেরা অজুহাত খুঁজে বেড়ায় মেয়েদের পোশাকে। তাদের দেহের গঠন পুরুষকে সেক্সতাড়িত করে, তাই সে ধর্ষণ করে। পুরুষদের ভাষ্য, এখানে দোষ মেয়েদের, তারা কেন এভাবে চলাফেরা করবে? মেয়েরাও যুগের পর যুগ যেন এই দোষ স্বীকার করে নিয়েই জীবনযাপন করে আসছে।

এর কারণ হল, মেয়েরা শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল। মেয়েরা পুরুষের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। পুরুষদের তৈরি বিধান এরা মানতে বাধ্য। কিন্তু মেয়েরা হিজাব পরলেই কি পুরুষেরা তাদের বিকৃত যৌন-লালসা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে? না, তারা রাখছে না। আর রাখছে না বলেই বোরকা হিজাব যেমন বাড়ছে ধর্ষণের সংখ্যাও সমান তালে বাড়ছে। লালসা তাড়িত দানব যদি বাইরে ঘুরে বেড়ায়, তাহলে সেই দানবকে খাঁচায় বন্দি না করে নিজেকেই খাঁচার মধ্যে বন্দি করার কোনো মানে হয়? আমাদের সমাজে এটা একটা বড়

সমস্যা। এটা নিয়ে কেউ গবেষণা করছেন বলে মনে হয় না। সরকারের উচিত এ নিয়ে ভাবা।

সৌদি আরবের মেয়েরা হিজাব বোরকা পরিধান করে বলে কিম্বা কিছু ধর্মীয় অনুশাসনের দোহায় দিয়ে এটা এদেশে প্রচলনের পক্ষে বলা হয়। অথচ আমরা জানি এ পোশাক মোটেও ধর্মীয় পোষাক নয়। সেখানের পুরুষদের লম্বা জোব্বা বা মেয়েদের হিজাব সেখানে ধর্ম প্রবর্তিত হবার পূর্ব থেকেই ছিল। বালুকাময় মরু প্রান্তরে রৌদ্রের প্রখর তাপ কিম্বা মরু প্রান্তরে বালু ঝড় থেকে বাঁচতে ঐ অঞ্চলের মানুষ বরাবরই আজানুলম্বিত ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক পরে থাকে। এটা ওদের সংস্কৃতি বা খাদ্যাভাসের মতই একটা অভ্যাস মাত্র। এর সাথে বাংলার জল হাওয়ার, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত পোশাকের ধরণ মিলবে কেন আর

আমরা মেলাবোই বা কেন? সবচে বড় কথা লাম্পট্য ঠেকানোর ঠুনকো অজুহাতে যে পোশাক প্রবর্তনের চেষ্টা করছে ওরা, প্রবর্তিত আছে এমন দেশ কি তাদের পুরুষদের যৌন-লালসা রোধ করতে পারছে? বরং সৌদি আরবসব মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের সাধারণ লোকেদের লাম্পট্য তো জগৎ জোড়া বিপুল কুখ্যাতি কুড়াচ্ছে।

শুধু তাই নয় ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশ থেকে ব্যর্থ হয়ে তাদের কুৎসিত লালসা মেটানোর জন্য খোদ বাংলাদেশ থেকে প্রতিবাদের মুখে নারী শ্রমিক কেনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। আধুনিক সহজ যোগাযোগের যুগে এ খবর আর চাপা নেই। আফগানিস্তানে মেয়েরা ঘরে বন্দি, ছোট-ছোট বাচ্চা ছেলেদের মেয়ে সাজিয়ে পুরুষেরা নিজেদের বিকৃত যৌন-লালসা মেটায়, এটা এখন অজানা নয়। উদাহরণ তো ভূরি-ভূরি দেওয়া যায়।

এবার আমি পরিচিত একটা মুসলিম পরিবারের গল্প বলছি, যে পরিবার দারুণভাবে ইসলামী কেতায় অভ্যস্ত। বাড়ির মেয়েদের সার্বক্ষণিক হিজাব বোরকা দিয়ে আবৃত রাখে অথচ  পুরুষরা চূড়ান্তভাবে লম্পট। গল্পটি বলার উদ্দেশ্য একটাই ইসলামী কেতা বা ইসলামী মন নারীর সম্ভ্রমের প্রকৃত রক্ষা কবচ নয়। আমার বড় ছেলে অর্ককে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আমি অন্য মেয়েদের সাথে গল্প করতাম। তাদের মধ্যে এক মুসলিম ধর্মনিষ্ঠ নারী আমাকে তার ব্যক্তিগত কথা বলত। আমরা হাঁটতাম, আর গল্প করতাম। তিনি গল্প করতের প্রতিরাতে তার স্বামী কীভাবে তার উপর যৌন-নিগ্রহ চালাত। এরপর একদিন সে তার ননদের কাহিনী বলল।

এই কাহিনী আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেককে বলেছি। তার ননদ যৌথ পরিবারে থাকে। তার প্রথম বাচ্চা হল সিজারিয়ান। বাচ্চা হওয়ার পর ননদের স্বামী তো বউয়ের সাথে আর থাকতে পারে না। বউ-বাচ্চাকে দেখাশোনার নাম করে একজন মেয়ে নিয়ে এল বাসায়। সেই মেয়ে নিয়ে স্বামী খাটে ঘুমাত, আর বউ সদ্যোজাত বাচ্চা নিয়ে নীচে ঘুমাত। ননদের সাধ্য ছিল না স্বামীকে কিছু বলা। কারণ কী এ অনাচারের? কারণ তার বিকৃত লালসাকে সে অন্যায়ভাবে মেটাতে ধর্মীয় নীতিবোধ বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

তাহলে দেখুন এই মহিলা যতই হিজাব বা বোরকা পরে থাকুক না কেন, এরা কি এদের স্বামীদের ফেরাতে পারবে? এদের স্বামীদের কাছে অন্য মেয়েরাও কিন্তু নিরাপদ নয় তা তারা যতই ইসলামী লেবাস গায়ে চড়াক না কেন। আসলে আমি বলতে চাচ্ছি বোরকা বা হিজাব নয়, কোন মেয়ে কতটা খোলামেলা পোশাক পরলো বা না পরলো তাও নয়, ব্যক্তির লাম্পট্য উদ্ভুত যৌন অপরাধপ্রবণতা নির্ভর করে তার শিক্ষা, সমাজে পরিবারে বিদ্যমান মানবিক মূল্যবোধ, সুস্থ বিনোদন প্রাপ্তি, আইনের শাসন ইত্যাদির উপর। যে কোন নারী একটা সমাজে কতটা নিরাপদ তার দ্বারা নির্ণয় করা যায় সে সমাজ কতটা সভ্য কিম্বা কতটা অসভ্য। সুতরাং বাঙ্গালী সংস্কৃতি বিরোধী বোরকা প্রবর্তন করে পুণ্যার্জন বা নারীর শারীরিক সুরক্ষা নয়, নারীকে মর্যাদা দিন সমাজে, তার অধিকার তাকে ফিরিয়ে দিন, নিশ্চিত করুন আইনের শাসন, বোরকা হিজাবের প্রয়োজন হবে না ।

শেয়ার করুন:
  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
    21
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.