সীমন্ত কথা

Aparna 2প্রভাতী দাস: সে অনেক অনেক দিন আগের কথা…। একমাথা ঢেউ খেলানো এলো-চুলের বালিকাটি খেলায় মত্ত সারাবেলা, পুতুলের বিয়ে, রান্না বাটি, গোল্লাছুট, ছি-বুড়ি তো আছেই, সাথে সাথে সকালে সাথীদের সাথে নদীর পাড়ের কাশবনে, সন্ধ্যায় শীতলা খোলায় জোনাকির পিছনে ছুটোছুটি করে কেটে যায় তার। প্রাণের উচ্ছ্বাসে কাটে তার দিনরাত, চুল আঁচড়ানোর সময় পাবে কোথায়।

এলোমেলো চুলে একটি চোখ তার ঢেকেই থাকে প্রায় সবসময়। আদর করে তাই মামারা তাকে ডাকেন, ‘এক চোখা লক্ষ্মী’। বালিকা’র রাগ হয় খুব এমন নামে। কিন্তু দুই চোখ দেখিয়ে বেড়াবার মতো পরিপাটী করে চুল রাখবার মতো সময়, সামর্থ্য বা ইচ্ছে কোনটাই তার নেই।

তার ঠাম্মা তার চুলের যত্নে বসেন প্রতিদিন দুপুরে স্নানের পর; আস্তে আস্তে জট ছাড়ান, সিঁথি কেটে চুল আঁচড়ান। তারপর প্রায় প্রতিদিন-ই বালিকার দীর্ঘ সিঁথির দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে বলেন, ‘কোন দূরদেশে যে বিয়া অইবো তোর বইন, মায়ের মতোই এত্তো লম্বা সিঁথি’। বালিকার মা একটু দূরেই কাঠের চূলোয় দ্রুত হাতে রান্না শেষ করছিলেন। লাউয়ের খোসার চচ্চড়িতে ফোঁড়ন দিতে দিতে বা কই মাছের ঝোলে ধনেপাতা ছড়াতে ছড়াতে তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে অল্প হাসেন, কিছুটা বিষাদমিশ্রিত তাঁর স্মিত সেই হাসি। তাঁর মাথায়ও লম্বা সিঁথি, তিনি সেই চাঁদপুর থেকে ফরিদপুরে এসেছেন এই সিঁথির দৈর্ঘ্যে, মেয়ে তাঁর আরো কোন দূরদেশেই হয়তো যাবে।

মাকে ছেড়ে দূরদেশে একলা যাবার ভয়ে বালিকা প্রতিদিন আয়না হাতে নিয়ে চিরুনি দিয়ে সিঁথি বুজিয়ে ছোট্ট করে ফেলতে চেষ্টা করে কতো। ঠাম্মাকেও অনেক বলে, পারলে তার সিঁথিটাকে ছোট করে দিতে কোনভাবে। সে দূরদেশে যেতে চায় না…! কিন্তু সিঁথি তার দীর্ঘ-ই রয়ে যায়!

বালিকা কিশোরী হয়, কিশোরী তরুণী। তার সিঁথির দৈর্ঘ্য কমে না। ঠাম্মা তার গত হয়েছেন; মা এখনও মাঝে মাঝেই মেয়ের সিঁথির দিকে তাকিয়ে সেই আগের মতোই নিঃশ্বাসটা একটু গোপন করবার চেষ্টা করেন। মেয়ে হেসে ঠোঁট ওলটায়, সে আজকাল এইসব প্রমাণবিহীন অবৈজ্ঞানিক কথাবার্তায় বিশ্বাস করে না একটুও।

মেয়েটির বিয়ের কথা ঠিক হলে, সিঁথির দৈর্ঘ্য আবার তার মনের কোণে কোন এক মুহূর্তে একটু উঁকিঝুঁকি দিয়ে যায়; ফরিদপুর আর চট্টগ্রামের মধ্যে দূরত্ব একটু বেশীই। তারপর, চট্টগ্রামও তার চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, তাকে যেতে হবে আরো অনেক অনেক দূরে…; সাত সমুদ্র-তের নদীর পাড়ে। তবে বৈজ্ঞানিক এবং আধুনিকা মেয়েটি সেই মুহূর্তের ভাবনাকে তুড়ি মেরে এক নিমিষে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়; যত্তোসব সংস্কার, এসব দুর্বলের ভাবনা, এর কাছে নতি স্বীকার করতে নেই। আর দূরত্ব তো নিতান্তই আপেক্ষিক একটা ব্যাপার, ইচ্ছে থাকলে তাকে অতিক্রমণ কঠিন হতেই পারে না।

তরুণীর দিন গড়ায়, মাস গড়ায়, বছর গড়ায়…। সে আজ প্রথম বিশ্বের অধিবাসী। আই-ফোন, আই-প্যাড, কম্পিউটার-ইন্টারনেট-ওয়াইফাই-বিলিং সফটওয়্যার- রিমোট লগইন-অটো পে-ব্লু টুথ-হ্যান্ডস ফ্রি, জিপিএস, লোকেশন সার্ভিস, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার এসবে প্রযুক্তিময় তার জীবন। এর বাইরে সে নিজেকে খুঁজেও পাবে না আর।

আজ তার কন্যারা বালিকা এবং কিশোরী। তাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েদের মাথায়ও লম্বা সিঁথি। সে এখনও তার ঠাম্মা বা মায়ের সেই কথাকে সংস্কার বলেই উড়িয়ে দিতে ভালোবাসে, মেয়েদের তার সিঁথির দৈর্ঘ্য নিয়ে সেই গল্পটা বলাই হয় না। তবু উৎসবে আয়োজনে অথবা কোন কোন কুয়াশার সকালে, মেঘলা দুপুরে বা পাতা ঝরা বিকেলে হঠাৎ হঠাৎ অবচেতনেই কিছুটা বিবর্তন ঘটে যায় তার অনুভবে। তীব্র অনিচ্ছাতেও মেয়েটিকে মেনে নিতে হয়, এই একবিংশ শতাব্দীর সবটুকু প্রযুক্তি দিয়েও কখনও কখনও কিছু কিছু দূরত্বকে অতিক্রম করা যায় না। সেইসব বিশেষ ক্ষণে মেয়েটি তার দীর্ঘ সিঁথির দিকে তাকিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয় সামান্য; সিঁথির দৈর্ঘ্রযে সাথে বসবাসের দূরত্বের সত্যি সত্যি কি কোন সম্পর্ক থাকতে পারে, যেমন মা বা ঠাম্মা বিশ্বাস করতেন!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.