মরুভূমির নারী

Woman-depressed-500x368রওশন আরা বেগম: চারিদিকে উৎসব চলছে। সেই উৎসবে আমিও আছি, তবে কি পরিচয়ে আমি এই সৌদি পরিবারের মধ্যে এসে পড়েছি তা ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আমি অতিথি হিসাবেই আমন্ত্রিত হয়েছি। এই বড় উৎসবে আমন্ত্রিত হওয়া বেশ সৌভাগ্যের ব্যাপার। একদিকে আস্ত গরু, অন্যদিকে খাসীগুলো বড় বড় ওভেনে রোস্ট করা হচ্ছে। আমি ঘুরে ঘুরে সেই দৃশ্যগুলো দেখছি। বাংলাদেশী অনেক সুন্দর সুন্দর নারী সেই উৎসবে পরিচারিকার কাজ করে যাচ্ছে।

আমাকে তারা দেখতে পেয়ে আমার কাছে আসার চেষ্টা করলো, কিন্তু সাহস পেলো না,পাছে চাকুরীটি থাকে কি না এই ভয়ে দূরে সরে গেল। আমি শুধু দূর থেকে তাকিয়ে এক টুকরো হাসি ছুঁড়ে দিলাম। সৌদি এই পরিবারটি এত ধনী তা আমার জানা ছিল না। চারিদিকে বিত্তের এত জৌলুস দেখে ভাবতে থাকি আমার দেশের মেয়েরা এখানে অনেক আরামে আছে। নিশ্চয় অনেক টাকা বেতন দিয়ে এইসব বাংলাদেশী পরিচারিকাদের আনা হয়েছে।

আরবী ভাষাটি আমি জানি না। ইংলিশেই কথা বলছি আর একজন বাংলাদেশী ছেলে সেটি আরবীতে অনুবাদ করে তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে। সব জায়গায় বাঙ্গালী ছেলে মেয়েদের দেখে খুব ভাল লাগছে। দেশে তারা টাকা পাঠাচ্ছে, দেশও ধনী হচ্ছে। সৌদি কোন পরিবারের সাথে আর আগে আমার তেমন কোন উঠা-বসা হয়নি। তাদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। আজ এই উৎসবে এসে সব জানা হচ্ছে।

কানাডায় অনেক ধনী পরিবারের সাথে আমি পরিচিত হয়েছি। এঁদের মধ্যে টরেন্টোর মারভিস পরিবারটি ছিল ইহুদী, তাদের প্রধান আয়ের উৎস হলো থিয়েটার বাণিজ্য। অনেকগুলো থিয়েটারের মালিক এই পরিবারটি। প্রথম জীবনে টেইলার ছিলেন। পরবর্তিতে ব্যবসা করে অনেক টাকার মালিক হন।

সৌদিদের এত ধনী হওয়ার পিছনে কি কারণ? তেল হলো এঁদের আয়ের প্রধান উৎস। ছেলে-মেয়েদের আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ভোজন শেষে একটা নাচের অনুষ্ঠান হলো। সেখানে একজন নর্তকী আনা হয়েছে। সেই নর্তকী খুব অল্প পোশাকে যে বেলি ড্যান্স দেখালো তা দেখে আমি বিস্মিত হলাম। সংস্কৃতির এই জায়গায় এত খোলামেলা রেখে আর নারীদেরকে একেবারেই ঢেকে রেখে বন্দি করা হয়েছে। দুটি পরস্পর বিপরীত মুখী।

যাই হোক রাত হবার পথে চারিদিকে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। কিসেই সেই আতঙ্ক প্রথমে তা বুঝতে পারি নাই। অবশেষে কোন এক পরিচারিকা আমার কাছে এসে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল। তখন সে আমাকে জানালো, এই রাতে আমাদের উপর এক দোজখের আগুন বয়ে যাবে। ঐ যে উৎসবটি হয়েছে, ওখানেই ঠিক হয়ে গেছে কে কার ঘরে যাবে। এই হচ্ছে আমাদের প্রবাস জীবনের চাকুরী।

আমি তার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যাই। এই বিত্তের মাঝে কি অন্ধকার বিরাজ করছে কেউ তা না জানলেও আমার তা জানা হয়ে গেল। অন্ধকারে চারিদিকে সবাই দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালালো কিন্তু ব্যর্থ হয়ে যে যার মত ঘরে চলে গেল। ভিতর থেকে ঘরটি বন্ধ হয়ে গেল। আমি বাইরে থেকে চিৎকার করতে থাকি। কেউ আমার সেই চিৎকার শুনতে পেলো না। শক্ত দরজায় বাঁধা পেয়ে সেই চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে নিজ কানে ফিরে এলো। হঠাৎ জেগে গিয়ে দেখি আমি তো বিছানায়। এই সব কি স্বপ্ন দেখছি?

এই স্বপ্নটি মনে হচ্ছে বাস্তব, ঘটে যাওয়া বাংলার দরিদ্র নারী জীবনের কিছু দুঃস্বপ্নের ভাবনা। ঘুমের মাঝে তাদের দুঃখের সাথে নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেছি ঘুম থেকে জেগে বসে বসে কাঁদছি।  জীবনের সামান্য স্বচ্ছলতা আনার জন্য চাকুরীর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরকে আমরা মরুভূমির দেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। এই মরুভূমিতে তারা কেমন আছে কেউ কি তা জানেন? আমিও জানি না, তবে জানা হয়ে যায় কিছু দুঃস্বপ্নের স্বপ্নের মাঝে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.