হাজী সেলিমের বক্তব্য ও আমাদের প্রতিবাদহীন নিষ্ক্রিয়তা

talakউইমেন চ্যাপ্টার: একেবারেই প্রতিবাদহীনভাবে চাপা পড়ে গেল স্বতন্ত্র সাংসদ কাম আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিমের একটি মন্তব্য। কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদে পুরুষ নির্যাতন (বিরোধী) আইন করার প্রস্তাব রেখেছেন তিনি। তার এই প্রস্তাবের পিছনে তিনি যেসব কারণ জুড়ে দিয়েছেন, তার পক্ষে বা বিপক্ষে কোন আলোচনা-সমালোচনাও চোখে পড়েনি অনলাইন জগতে। শুধুমাত্র কিছু পুরুষবন্ধু এ নিয়ে হাসাহাসি করে তাদের নির্যাতিত হওয়ার দিন শেষ হয়ে এলো বলে গভীর নি:শ্বাস ফেলেছেন। ব্যস, এইটুকুই।

নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যখন খোদ প্রধানমন্ত্রীও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তখন একে হাস্যরসে রূপান্তর করে অপরাপর একটি আইন করার প্রস্তাব করলেন আওয়ামী লীগেরই একজন নেতা। সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে কলামিস্ট সোহরাব হাসানের একটি নিবন্ধ চোখে পড়লো। তিনি যথার্থই বলেছেন যে, হাজী সেলিমের এই মন্তব্যের কোনো প্রতিবাদ কোন সংগঠন এমনকি খোদ নারী সংগঠনগুলো থেকেও আসেনি।

সোহরাব ভাইকে বলছি, নারী সংগঠনগুলো এখন এমন অনেক কিছুতেই প্রতিবাদ জানায় না আজকাল। তার কারণ জানেন তো? তারা আসলে সরকারের বিরাগভাজন হতে চায় না, আর সব সংগঠনই কোন না কোনভাবে সরকারের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে আছে। তাই প্রতিবাদের মোক্ষম ইস্যুতেও তারা চুপ করে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আর এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও আদায় করে নেয়। বিদেশ যাত্রা থেকে শুরু করে নানা ধরনের তহবিলের প্রশ্ন তো আছেই। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগও পেয়ে থাকেন অনেকে। তাই হাজী সেলিমের এ ধরনের মন্তব্যকে তারা এড়িয়ে যান বেশ সযতনেই। নারী অধিকার আন্দোলনে এখন শ্রেণীবৈষম্যটা প্রকট। হতদরিদ্র নির্যাতিত নারীদের জন্য এই দেশে এখন আর জোরালো আন্দোলন গড়ে উঠে না, যতটা হয় মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তদের বেলায়। কাজেই হাজী সেলিমের বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ না হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়?

খবরটি ছিল এরকম: গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে হাজি মো. সেলিম বলেছেন, “নারীদের হাত থেকে পুরুষদের রক্ষার একটি আইন করার দাবি জানাচ্ছি। আমি চাই পুরুষ নির্যাতনের বিষয়ে একটি আইন হোক। তিনি বলেন, প্রিয় সহকর্মী ভাই ও বোনেরা হয়তো আমি দু-এক দিন সংসদে আছি। সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আমি সিটি করপোরেশন নির্বাচন করব। তার আগে নারীদের হাত থেকে পুরুষদের রক্ষার জন্য এ আইনটি করার দাবি জানাচ্ছি। আমি চাই পুরুষ নির্যাতনের বিষয়ে একটি আইন হোক। বর্তমানে দেশে শুধু নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন আছে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীও ভয়ংকর হন। তাঁরা ওই আইনের অপব্যবহার করে পুরুষদের হয়রানি করেন”।

প্রস্তাবিত আইনের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে হাজী সেলিম বলেছেন, নারী-পুরুষ এখন ফিফটি ফিফটি মিলিয়ে এক শ। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে পুরুষ নির্যাতন আইন করা দরকার। কিন্তু আইনটি কি এই কারণে হয়েছিল? যতদূর মনে পড়ে, নারী নির্যাতন রোধ করতেই এই আইনের উৎপত্তি।

হাজী সেলিম যখন প্রস্তাবটি রাখেন তখন সংসদ পরিচালনা করছিলেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনিও এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। তাহলে ধরে নেবো, স্পিকারও সযতনেই এড়িয়ে গেছেন এমন প্রস্তাব? নাকি নিজের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হওয়ায় তিনি আর এদিকে পা মাড়াতেই চাইছেন না, পাছে গদি টলে যায় ভয়ে!

খবরেই জেনেছি, ‘স্বতন্ত্র সাংসদ হাজি সেলিম যখন এসব কুৎসিত মন্তব্য করেন, তখন নাকি সংসদের অনেক পুরুষ সদস্য টেবিল চাপড়ে তাঁর প্রতি সমর্থন জানান। আর পেছনের সারিতে বসা সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদেরা হইচই করে প্রতিবাদ জানান।’ কিন্তু সেই নারী সদস্যদের প্রতিবাদও কেন চাপা পড়ে গেল বাহ্বা ধ্বনির পিছনে? অথবা স্পিকার থেকে শুরু করে অন্য নারী যারা বিশেষভাবে ক্ষমতায়িত হয়ে আছেন, তারাই বা কেন আমলে আনলেন না নারী সাংসদদের এই প্রতিবাদকে। বিষয়টি কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার মতোন নয়। বরং একে বাহ্বা দেয়ার পিছনে গভীর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবই ফুটে উঠেছে।

সোহরাব ভাই প্রশ্ন তুলেছেন, “যে দেশে ঘরে-বাইরে নিয়ত নারী নির্যাতন, হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হন, যে দেশে নারী নির্যাতনবিরোধী আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই, সেই দেশের একজন সাংসদ এ ধরনের আইন আনার কথা বলতে পারেন কীভাবে? হাজি সেলিমের পড়াশোনা, কতটি মামলা তাঁর বিরুদ্ধে আছে বা ছিল কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি কোথায় পালিয়ে ছিলেন, সে বিষয়ে আমরা কিছু বলতে চাই না। কিন্তু আমাদের উদ্বেগের বিষয় হলো, নারীর বিরুদ্ধে একজন পুরুষ সাংসদের অবস্থান।

আসলে এটি হলো মূল্যবোধ, মানসিকতা, রুচি ও সংস্কৃতির প্রশ্ন। ভোটে জয়ী হয়ে সাংসদ হওয়া যায়, কিন্তু মনোজগতের অন্ধকার দূর করা যায় না। বর্তমান বাংলাদেশে হাজারটা সমস্যা থাকতে তিনি কেন পুরুষ নির্যাতনবিরোধী আইন করতে চাইলেন, আমরা বুঝতে অপারগ”।

আমাদের মনেও প্রশ্ন জাগতে পেরে যে, হাজী সেলিম কী সিরিয়াসলি এই কথা বলেছেন? তিনি নিজে নির্যাতিত পুরুষ হিসেবে অধিকার চাইছেন? নাকি কেবল ফাঁকা বুলি হিসেবেই সংসদে হাসি-ঠাট্টা-তামাশার জন্যই বলেছেন? এই সংসদে তো কম রং-তামাশা হয় না, ঝগড়া হয়, বিবাদ হয়, খিস্তি-খেউড় হয়, আবার প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে গানও হয়।

তো, হাজী সেলিম কোন অর্থে এমন একটি প্রস্তাব দিলেন, তা কিছুটা হলেও বিচার-বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ এক, নির্যাতন রোধে দেশে যেখানে অনেক আইন বিদ্যমান আছে, সেখানে আলাদা করে পুরুষ-নির্যাতনবিরোধী আইনের প্রয়োজন পড়লো কেন হঠাৎ? দুই, নারী নির্যাতনের মাত্রার কারণেই আলাদাভাবে আইন করা, সেটাকে এই প্রস্তাবের মাধ্যমে অনেকটাই হেয় করলে বলে আমার মনে হয়েছে। কটাক্ষ করা হয়েছে।

দেশে নারী নির্যাতনের মতোন শক্ত আইন থাকা সত্ত্বেও আমরা কি কমাতে পেরেছি নির্যাতন? প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে। এটা সত্য যে, আইনের অপপ্রয়োগ হয়। সেটা যেকোনো আইনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি রাষ্ট্রের আইন যখন নিজস্ব গতিতে চলতে পারে না, যখন সেখানে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থাকে, প্রভাবশালীদের প্রভাব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন নারী নির্যাতন বিরোধী আইনও এ্রর বাইরে থাকে না। গুম-খুন-অপহরণ বাণিজ্য যে দেশে বহুল জনপ্রিয় এই মূহূর্তে, সেখানে নারীকে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে রেখে, তাকেও দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে শোষক আর অত্যাচারির দয়ার উপর নির্ভরশীল করে রাখার ঘটনা অহরহই ঘটছে।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাতেও এর নজির মেলে। রুবেল-হ্যাপির ঘটনা সবাই জানে। হ্যাপি প্রেমে প্রতারিত হয়ে প্রতারণার মামলা দিতে গিয়েছিলেন। সেখানে একজন সবে কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়ে, যে কিনা মেকি-জগতের হাতছানিতে ভূগছে, তাকে পুলিশ কিভাবে ব্যবহার করলো, সেটাও কি এক ধরনের নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে না? নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রতারণার অভিযোগ না থাকায় তাকে দিয়ে ধর্ষণ মামলা সাজানো হলো। যা হালে তো টিকলোই না, বরং এ নিয়ে কেলেংকারির শেষ নেই। মেয়েটা বার বার আত্মহত্যার পথ খুঁজছে। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিয়ের কথা বলে দৈহিক সম্পর্কে যাওয়া এবং পরে তা অস্বীকার করা, খুবই মামুলি বিষয়। রুবেল বিশ্বকাপে গিয়ে ভাল করেছে, কাজেই সে সাধু পুরুষ হয়ে গেছে। আর হ্যাপিও তার দৃঢ়তা বজায় রাখতে পারলো না সমাজের চাপেই হোক বা নিজের ক্ষুদ্রবুদ্ধির কারণেই হোক। সে যেন এই মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিজেও অব্যাহতি চাইলো। কিন্তু চাইলেই কি সব হয় এই দেশে? তার এই ঘটনা তাকে তাড়িয়ে বেড়াবে জীবনভর। আমরা এমনই এক জাতি, হ্যাপিকে অসুস্থ বানাতে সদা তৎপর হয়ে আছি। আর রুবেলরা সবসময়ই নির্দোষ থেকে যাবে।

আরেকটি ঘটনার সাক্ষী আমরা নিজেরাই, মানে নারী সাংবাদিকরা। আমাদেরই একজন ক্রমাগত তার স্বামীর নানারকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সেই স্বামী পরনারীতে আসক্ত, সেই কথা সে প্রকাশ্যেই বলে বেড়ায়, এমনকি আমাদের সহকর্মীটিকে ‘কাগুজে বই’ উল্লেখ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। সেই স্বামী নামক পুরুষটি যেদিন গায়ে হাত তুললো, মেয়েটি তখন পাঁচ মাসের অন্ত:সত্ত্বা। আমরা পুলিশ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। কিন্তু শারীরিক নির্যাতন বা পরকীয়া প্রেমের কোনো বিধান আইনে নেই। মামলা করলে দিতে হবে যৌতুকের কারণে। কিন্তু সেটা তো প্রযোজ্য নয় এক্ষেত্রে। তাহলে? আমরা ফেরত এসেছিলাম, মামলা করা হয়নি। তো, নারী নির্যাতন দমন আইনের এসব ফাঁকফোকর গুলো্ নিয়ে কেউই কথা বলে না। এমনকি নারী সংগঠনগুলোও নয়। এক্ষেত্রে বলতে পারি, অধিকাংশ নারী সংগঠনই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জপ্রায়। পুরনো নেতৃত্ব পুরনো ধাঁচেই চলছে। অনেকটা এনজিও কায়দায় চলা যাকে বলে। বড়জোর মানববন্ধন, প্রতিবাদ বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ এখন তাদের কার্যক্রম। হাল জমানার নতুন নতুন প্রতিবাদ সম্পর্কে তারা কমই খবর রাখেন। যতদিন না এই নেতৃত্বে নতুন প্রজন্ম আসছে ততদিন এই দেশের নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখাও দুরূহ ব্যাপার।

সোহরাব ভাইয়ের ভাষাতেই বলি, হাজী সেলিম বলেছেন, তাঁর কাছে ২০ জন সালিসি করতে এলে তার মধ্যে ১৫ জনই নারী নির্যাতনের বিষয় নিয়ে আসেন। তিনি নারী নির্যাতনবিরোধী আইনের নামে স্বামীর ভাইবোন, বাবা-মায়ের হয়রানির কথা বলেছেন। কিন্তু এই সাংসদ কি জানেন না যে, তাঁর কাছে যাঁরা প্রতিকার চাইতে আসেন, তার চেয়ে অনেক বেশি নারী নীরবে নির্যাতন সহ্য করেন। তাঁর এটাও অজানা থাকার কথা নয় যে নারী নির্যাতবিরোধী হয়রানিমূলক মামলার পেছনেও থাকে প্রভাবশালী পুরুষের বদমতলব। থাকে পুরুষ পুলিশ সদস্যদের প্ররোচনা। আইনপ্রণেতা হিসেবে হাজি সেলিমের দায়িত্ব ছিল নারী নির্যাতনবিরোধী আইনের অপব্যবহার ও অকার্যকারিতা নিয়ে কথা বলা।

১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন হাজি সেলিম এবং সাংসদ নির্বাচিত হন। সেই দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়েই আমরা তাঁর নাইনশ্যুটার তাণ্ডবও দেখেছি।

সেই হাজী সেলিম এখন জনসংখ্যার অর্ধেক নারীকে নির্যাতক হিসেবে চিহ্নিত করে পুরুষ নির্যাতনবিরোধী আইন করতে চাইছেন। এর উদ্দেশ্যটা কী? হাজী সেলিমেরা কি বাংলাদেশটাকে ফের অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে চান, যেখানে সংসদ থেকে শুরু করে শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য—কোথাও নারীর অধিকার থাকবে না। কেউ সেই অধিকারের কথা বললেই পুরুষ নির্যাতনবিরোধী আইন করে তাঁর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

হাজী সেলিমেরা ক্রমাগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে যাচ্ছেন। এর আগে ফেনীর গডফাদার বলে খ্যাত জয়নাল হাজারী আরও জঘন্য ভাষায় নারীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার বা সংসদ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি মৌখিক নিন্দাও জানাননি কেউ। তাহলে কি ধরে নেবো, নারীদের নিয়ে যে কেউ, যে কোনো জায়গায় কটূক্তি করতে পারেন? ‘তেঁতুল শফী’ বলে খ্যাত হেফাজত নেতা যখন নারীদের তেঁতুলের সাথে তুলনা করেছিলেন, তখন প্রতিবাদ চোখে পড়েছিল। সংসদেও এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে খোদ প্রধানমন্ত্রীই বিরোধী দলীয় নেত্রীকে তেঁতুল বলে হাস্যরস করেছিলেন। আসলে আমরা নিজেরাও নিজেদের পদক্ষেপগুলো মেপে ফেলি না। আর সেই সুযোগটাই নেয় কিছু সুযোগসন্ধানী। হাজি সেলিম সেই খাতায় নিজের নামটি লেখালেন আবারও।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.