মাঠে ক্রিকেট, গ্যালারিতে নারী, তবুও নারীর দোষ?

Kohliউইমেন চ্যাপ্টার: নারী, প্রেম, যৌনতা, এগুলো কী এতোটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে খেলার মাঠও এর থেকে বাদ যায় না? যৌন সুঁড়সুঁড়ি না থাকলে খেলাও জমে উঠে না? সবসময় একজন নারীকে সেখানে টেনে আনতেই হবে? আমরা খেয়াল করছি, খেলায় ভাল করা আর না করার মাঝে একজন নারী যেন আবশ্যকীয় প্রসঙ্গ হয়ে উঠে। তবে ভাল করলে ততটা হয় না, যতটা হয় একজন খেলোয়াড় খারাপ করলে।

আশ্চর্যজনকভাবে নারীর উপর দোষ চাপানোর রেওয়াজ একই রয়ে গেছে। উপমহাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এখন শিক্ষা-দীক্ষায় নিজেদের আধুনিক প্রকাশের মাধ্যমে নারীর প্রতি আক্রমণের ধরনও বদলে ফেলেছে।

এই ২৬শে মার্চের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সেমিফাইনালটাই যদি ধরি, তাহলেই দেখবো, ঘুরে-ফিরে এসেছে আনুশকা শর্মার কথা। মাঠে যখন ভারত ব্যাট করছে, আনুশকা তখন গ্যালারিতে। খেলার দর্শক। হ্যাঁ তিনি একজন বর্তমান সময়ের ডাকসাইটে বলিউড অভিনেত্রী। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সুদর্শন খেলোয়াড় ভিরাট কোহলির বন্ধু, প্রেমিকা। পর পর দুটি ম্যাচে কোহলি খুবই খারাপ খেলেছেন, বাংলাদেশের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে ৩ রানে আর অস্ট্রেলিয়ার সাথে সেমি ফাইনালে ১ রানে আউট হয়েছেন। এটা ভারতের জন্য অবশ্যই একটা বিপর্যয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আনুশকা গ্যালারিতে ছিলেন বলেই কোহলি খারাপ খেলেছেন।

সহকর্মীদের বলতে শুনেছি, ফেসবুকে লিখতে দেখেছি যে, আনুশকা গেল কেন স্টেডিয়ামে, ওই আনুশকাই যত অনর্থের মূল, আনুশকার দিকে তাকিয়ে থাকাতেই কোহলি আউট হয়ে গেল, এ ধরনের মন্তব্য। খারাপ বা অশ্লীলগুলো এখানে উল্লেখ নাই বা করলাম।

ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সব বিভাগেই অস্ট্রেলিয়ার থেকে পিছিয়ে থেকে হারলো ভারত, আর দোষ হল সব আনুশকরা শর্মার। গালাগালির তীরে পুরো এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেলেন তিনি। তাইতো খেলা শেষে আনুশকা যখন কোহলির সাথে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, মুখটা তার প্রচণ্ড রকমের ফ্যাকাশে ছিল। বুঝতে বাকি থাকে না, ওই গ্যালারিতেও তাকে কী ধরনের মন্তব্য শুনতে হয়েছে। ফেসবুক, টুইটার সহ সব সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের পাতা ভরে উঠেছে আনুশকার প্রতি হাজারো অভিযোগে। তাঁর ‘অপরাধ’, ভারতের খেলা দেখতে তিনি এদিন সিডনি স্টেডিয়ামে ছিলেন।

শুনলাম, ভারতে আনুশকার বাড়িতে হামলা পর্যন্ত চালিয়েছে ভক্তরা। এ কেমন ভক্তের দল, জানতে মন চায়!

সেমিফাইনালে হারল লজ্জাজনক ৯৪ রানে। কিন্তু তার সঙ্গে গ্যালারিতে আনুশকার থাকা-না থাকার সম্পর্ক কী? আজ আনুশকা মাঠে না গেলেই ভিরাট একেবারে ফাটাফাটি খেলতেন, এরকম মনে করার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কি? তাহলে ভারত হারার যাবতীয় ক্ষোভ আনুশকার প্রতি উগরানো হচ্ছে কেন?

বিরাট কোহলি ও আনুশকরা মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে, সেটা কারোরই অজানা নয়। বিভিন্ন সময় তাঁদের একসঙ্গে দেখা গিয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে তাঁরা বিয়ে করবেন বলেও সূত্রের খবর। বয়ফ্রেন্ডের খেলা দেখতে মাঠে যেতেই পারেন আনুশকা। কোন যুক্তিতে হারের যাবতীয় দায় তাঁর উপর চাপানো হচ্ছে, সেটা কিন্তু স্পষ্ট নয়।

আনুশকার সিনেমা ফ্লপ করলে কেউ বিরাট কোহলিকে দোষারোপ করে কী কখনও? করে না। কারণ এ ধরনের চল এই উপমহাদেশে নেই। এখানে সব দোষ কী করে নারীর ওপর বর্তানো যায়, তারই ‘মওকা’ খোঁজে পুরুষকুল। যেমন সংসারে সন্তান ভাল করলে বাবা বলে উঠেন, দেখতে হবে না কার সন্তান! আর সন্তান খারাপ করলে, সব দোষ গিয়ে পড়ে ওই অভাগী মায়ের ওপর।

খেলার মাঠের এই কাহিনী আজকের নয়। যখন অভিনেত্রী শর্মিলী ঠাকুরের স্বামী নবাব পতৌদি খেলতেন, তখনও এমনটি দেখা গেছে। পতৌদি তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যাওয়ায় পচা ডিমের ঢিলও খেতে হয়েছিল শর্মিলা ঠাকুরকে। কিন্তু শর্মিলার ফ্লপ ছবির দায়িত্ব কোনদিনও পতৌদির উপর বর্তায়নি।

বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশে হয়ে গেল রুবেল-হ্যাপি উপাখ্যান। বিশ্বকাপ জুড়েও এর প্রবল তাণ্ডব লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশের খেলার দিন অবধারিতভাবেই ‘হ্যাপি’ নামটি শোনা গেলে গ্যালারি থেকে ফেসবুকের পাতায় পাতায়। কাছের-দূরের, অসম্ভব ‘প্রগতিশীল’ মানুষও এ থেকে বাদ পড়েননি। হ্যাপি প্রসঙ্গ যেন টানতেই হবে। রুবেল বিশ্বকাপে ভাল পারফরমেন্স দেখিয়েছে। সেই উন্মাদনায় পুরুষকুল হ্যাপিকে তুলোধুনো করতে ছাড়েনি। খারাপ করলে তো হ্যাপিকে ছিঁড়েই খেয়ে ফেলতো সবাই। রুবেলের ভাল করাতে হ্যাপির ‘পুরুষ আইনজীবী’ ততোধিক পৌরুষ দেখিয়ে মামলা থেকে সরে গেছেন। তাহলে আগে কেন তিনি এই মামলা নিয়েছিলেন সেই কথাটা কেউ জানতে চায়নি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো পড়লে মনে হবে, হ্যাপিকে তারা রুবেলের কাছ থেকে টেন-হিঁচড়ে নামাতে পারলেই দেশের সুযোগ্য সন্তান বা দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব সারতে পারবেন। হ্যাপিই এখানে মূল কাঁটা।

আমরা আমাদের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে গর্ব করি বুক ফুলিয়ে। আবার যখন সে খারাপ খেলে, তখনই এর সব দায়ভার গিয়ে বর্তায় তার স্ত্রী শিশিরের ওপর। গ্যালারিতে শিশিরকে কটাক্ষ করার কথাও আমরা জানি। আর সে কারণে সাকিব মারামারিও পর্যন্ত করেছে দর্শকদের সাথে। বেচারা সাকিব। সেজন্যও কথা শুনতে হয়েছে তাকে। বউ হয়রানির শিকার হবে, এর প্রতিবাদ সে করতে পারবে না। করলেই তার ‘সুনাম’ ক্ষুন্ন হয়ে যাবে। মুশফিক যখন বিয়ে করলো, তখনও অনেককে বলতে শুনেছি, তার দিন শেষ। কিন্তু কই, দিন তো শেষ হয়নি মুশির। বরং দিন দিন চেকনাই বাড়ছে ওর ব্যাটিংয়ের। তামিমের খারাপ পারফরমেন্সের কারণেও দোষারোপ করা হয় ওর বউয়েরই। জানি না, কখনও জানা হয়নি, এসব শুনতে ওদের স্ত্রীদের কেমন লাগে! এটুকু জানি যে, মাঠে প্রিয়জনের ভাল পারফরমেন্স সবাই দেখতে চায়। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ যখন সেঞ্চুরির পর ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দেন, আমরা কিন্তু তার বদনাম করি না, কারণ সে ভাল করেছে। মাঠ থেকে মাথা নিচু করে কেউ বের হলেই ঝাঁপিয়ে পড়ি তার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধারে।

নারীকে যে জাতি সম্মান করতে জানে না, সে জাতি কোনদিন শিখরচূড়ায় উঠতে পারে না। নারী মানেই স্ত্রী বা প্রেমিকা নয়, নারী মানে মা এবং বোনও। যেসব খেলোয়াড়ের স্ত্রী বা বান্ধবীদের ওপর হামলে পড়ছি, সেইসব খেলোয়াড়ের ঘরে কিন্তু মা-বোনও আছে। অথচ তাদের ওপর দোষ যায় না।

কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও বলছি, তাহলে কী সব দোষ ওই যৌনতাকেন্দ্রিক?

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.