পুরুষতন্ত্র আর ধর্মতন্ত্র-দুই-ই সমান

Free 1মনোরমা বিশ্বাস: পুরুষতন্ত্র আর ধর্মতন্ত্র – এই দুই তন্ত্র মেয়েদেরকে ‘মেয়ে’ হিসেবে রেখে দিয়েছে। তার ভেতর নিজস্ব যে ‘আমি’ টা আছে খুঁজে দেখেনি সে। শেখানো আপ্তবাক্য সত্য জেনে সে তাই মনে করে এসেছে স্বামীর বিছানাই হলো তার গন্তব্য, সুখের ঠিকানা। তার ‘নিজের ঘর’ নিজে তৈরী করার তাগিদ সে কখনোই বোধ করেনি।

মুক্তি তার ঘটেনি আজো বরং কিছু বাড়তি সুবিধা ধরিয়ে দিয়ে প্রতারণার আরেক ফাঁদ পেতেছে পুরুষতন্ত্র। এখন এই দুই তন্ত্রের বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক পন্থায় ক্রমাগত: আক্রমন করতে হবে। লক্ষ্যে অবিচল থেকে ‘নিজের ঘর’ নিজেই তৈরি করতে হবে। সেই ঘরে, তার সঙ্গীকে হবে, তার সিদ্ধান্ত সে নিজেই নেবে। তার দেহ তার নিজের, তার আনন্দও তার নিজের। বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্তও কারো চাপিয়ে দেবার সুযোগ নেই, কারণ তার দেহ তা ধারণ করে।

পৃথিবীর অধিকাংশ সম্পদ পুরুষের অধিকারে, সিদ্ধান্ত নেবার মালিকও তারা। তাই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারের পাশাপাশি সম্পদের মালিকানাও ছিনিয়ে নিতে হবে। চার দেয়ালে আটকে থাকা জীবনের অবসান ঘটাতে তাই পথে নামতে হবে। আদায় করতে হবে শিক্ষার অধিকার, জীবিকার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার।

নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম গুরুত্বপূ্র্ণ দিক হলো তার ‘সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা’। মেয়েরা ক্রমবর্ধমান হারে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হতে থাকলে তাদের এ ক্ষমতাটা বাড়বে। তাছাড়া সম্পত্তিতে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইও খুব জরুরি মনে রাখতে হবে পথে নামলেই পথের সন্ধান পাওয়া যাবে।

এখন মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও কিছু কথা বলা দরকার। কবিতায় পড়েছি “মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে”, কথাটা খুব রুঢ় শোনাবে হয়ত কিন্তু তা সত্য। সর্বগ্রাসী বাণিজ্য সব কিছু শুধু যে পণ্যে রুপান্তরিত করেছে তাই নয়, আমাদের স্বাধীন পছন্দ-অপছন্দের জায়গাটিতে পর্যন্ত অহরহ অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ করছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কুৎসিত দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি।

আমাদের ভালোবাসা, আমাদের সুন্দর আমাদের মানবিক অনুভুতিগুলো পর্যন্ত বাণিজ্য কর্তারা বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করে বিজ্ঞাপিত করছে। আর একথা কে না জানে মেয়েরা পণ্য নির্মাতা তথা বিজ্ঞাপন নির্মাতা মিডিয়া মোড়লদের প্রধান শিকার।

আপনাদের মনে আছে ভোক্তা রুচিকে প্রভাবিত করার নামে ‘রং ফর্সা কারী ক্রিম’ বিপণন করতে গিয়ে এরা বর্ণবাদকে পর্যন্ত উসকে দিয়েছিল, বলতে চেয়েছিল গায়ের কালো রং বুঝি সৌন্দর্যের পক্ষে হানিকর। সে সময় প্রতিবাদের সুর উঠায় এখন ওরা ভিন্ন কৌশলে এগুচ্ছে। কৌশল যতই বদল করুক ,হঠাৎ দেখে সকলে বুঝতে না পারুক কিন্তু এদের উদ্দেশ্য সবসময় এক আর তা হলো মেয়েদের যৌন সামগ্রী, দুর্বল, নির্ভরশীল বা হেয় করে উপস্থাপন করা। মিষ্টি কথার আড়ালে ওদের নোংরা চোখ সবসময় মেয়েদের সম্মান কেড়ে নেবার চেষ্টা করবে। সেদিন টিভিতে এক বিজ্ঞাপণচিত্র দেখছিলাম, যাতে দেখানো হচ্ছে মেয়েরা নুডুলস রান্না করছে, রুটি বানাচ্ছে ইত্যাদি। কেন? এ কাজ কি শুধু মেয়েরা করে? করবে ? পুরুষরা করতে পারে না তা?

আমেরিকার সমাজে তো এ কাজ ডমিস্টিক প্রচুর কাজ এখন ছেলেরাই করছে! কেন তবে মডেল হিসেবে শুধু মেয়েদের বেছে নেয়া? ছেলেদেরও ডমিস্টিক কাজে যুক্ত দেখানো হোক , পুরুষদের অনভ্যস্ত চোখ এসব দেখে তৈরি হোক, বুঝুক যে এমন দিন আসছে যখন গৃহস্থালীর কাজ মেয়েরা এক তরফা আর করবে না, ছেলেদেরও অংশ নিতে হবে তাতে। আরেকদিন দেখলাম সরষে তেলের বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে, স্বামী চিকেন ফ্রাই মুখে তুলছে, বউ সামনে বসে উদ্বিগ্ন চিত্তে তাকিয়ে আছে, স্বামী এটা খেয়ে খারাপ বলে কিনা। অদ্ভুত !

মেয়েরা খাবারও বানাবে এবং তার ভালো-মন্দ নিয়ে পুরুষদের কাছে ফাউ বকাঝকা আর তিরস্কারও জুটবে। কেন বিজ্ঞাপণে এমনও তো দেখাতে পারে, স্বামী বউ এর জন্য কফি বা চা বানিয়ে দিচ্ছে, অথবা রান্না করছে, বাইরের আজেবাজে খাবার যাতে না খেতে হয় সেজন্য খোদ পুরুষটিই রুটি বানিয়ে বউ-বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছে।

জানি বাংলাদেশ-ভারতের পুরুষ বন্ধুরা আমার এ বর্ণনায় একটু ভ্যাবাচাকা খাবেন, কিন্তু তবু তাদেরকে বলি দিন বদলাচ্ছে, আপনিও বদলান। আমেরিকাসহ উন্নত ইউরোপিও দেশগুলোয় এখন এটাই স্বাভাবিক চিত্র।

শেয়ার করুন:
  • 29
  •  
  •  
  •  
  •  
    29
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.