বীরাঙ্গনাকে সম্মান দিতে গিয়ে হেয় করো না

Canada Tribalsহাসিনা আকতার নিগার: যে দেশে স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ঠিক করা হয়, যে দেশে আত্ম -অহংকারের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বার বার গোনা হয় আদম শুমারির মতো, সে দেশে বার বারই আলোচনার টেবিলে ঝড় তুলে একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের বিষয়টি।

বলা হচ্ছে বীরাঙ্গনাদের সংখ্যা কত আছে তা জানার জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে। যেন তারা তাদের অধিকার এবং স্বীকৃতি পায়। কিন্ত আমাদের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক  ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এতে কতটা সততা থাকবে তা প্রশ্ন রেখে যায়।

আজকাল দেখি  মিডিয়াতে বীরাঙ্গনারাদের নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হয়।  সেখানে অধিকাংশ বীরাঙ্গনার দারিদ্র্যকেই তুলে ধরা হয়। তবে সব বীরাঙ্গনা হত-দরিদ্র নয়। এর সাথে আবার নতুন সংযোজন বিজয়িনী বাংলা। সময়ের সাথে সাথে সব কিছু একবারে বদলে দেয়া যায় না।

বলা হয়েছে তাদের ইতিহাস পাঠ্য বইয়ে সংযোজিত হবে। সেদিকে যে প্রশ্নটি উঠে আসে ‘বীরাঙ্গনা ’ – সত্য মিথ্যার কোন মিশেল গল্প যেন না হয়। এর জন্য অনেক জানা প্রয়োজন।

একজন নারী  হলো, কন্যা , জায়া – জননী। যে  নারীটি ১৯৭১ সালে কন্যা বা  জায়া ছিলো আজ সে জননী কিংবা আরো এক ধাপ পাড়ি দিয়ে তার ঘরে এসেছে আরেক প্রজন্ম। সামাজিক কারণেই নিজের ক্ষতকে আড়াল করে তার পথ চলা। দেশের প্রতি মমত্ববোধ আর এই আত্মত্যাগী নারীদের মানবিক দিকটাকে বিবেচনা করতে হবে অনেক বেশী। যার  এক উদাহরণ গাজীপুর জেলার বরমী ইউনিয়নের এক গ্রামের এক কোণে বসবাস করা কজন নারী। যারা নিভৃতেই রয়ে গেছেন।

বরমীর এ গ্রামের কিছু ঘর আর তার সামনে একটি  কবর স্থান। সে কবরে শুয়ে আছে এক অপরূপা নারীর  স্বামী।  যে নারী ৪২ বছর ধরে বাকস্তব্ধ। এক সময় স্বামীর কবরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকতেন । এক বছর আগে এই  শয্যাশায়ী  নারীকে দেখে চমকে উঠি  তার সৌন্দর্যে। শারীরিক অসুস্থতার পরও ছোট একটি অন্ধকার ঘরে জ্বল জ্বল করছিলো তার দীপ্তিময় চোখ। দুধে মাখা গায়ের রং। চোখের ভাষাতে প্রচণ্ড এক আকুলতা। ১৯৭১ সাল বলতেই নিজের মুখটি ঘুরিয়ে নিলেন, আর দেখলেন না কাউকে। তার সন্তানটি এখন সংসার করছে। ছেলেও তেমন কিছু বলতে চাইলো না।

জানা যায়, বরমীর সেই গ্রামে পাকিস্তানী বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় এই নারীসহ আরও কয়েকজন নারীকে তাদের স্বামীর সামনে নির্যাতনের পর, স্বামীদের হত্যা করে চলে গিয়েছিল।  এমন দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে সন্তানদের নিয়ে জীবনের লড়াই করতে গিয়ে আবার তাদের জীবনে  মরণ কামড় দেয় এদেশের রাজাকাররা।  তাদের জায়গা জমি, এমন কি ভিটেমাটি পর্যন্ত দখল করে নেয়।

অনেক চড়াই  – উতরাই পেরিয়ে সে এলাকার  মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অহংকারী একজন মানুষ তাদের পাশে দাড়াঁয়।  নিজের মায়ের মতো করে আগলে ধরে বীরাঙ্গনাদের। কিন্তু  সেখানকার  সমাজ অন্যভাবে দেখে এই নারীদের এবং তাদের পরিবারের সবাইকে। আর এই মানুষটির মা বলেন না নিজের কথা, শুধু বললেন  – ‘বীরাঙ্গনাদের  সম্মান দিতে গিয়ে সমাজের কাছে ছোট করবেন  না। তাদেরও ঘর-সংসার আছে। সবাই কি আর সাহসী হয়।’ এর কোন উত্তর নেই কারণ সমাজ যে বড় নির্মম।

৭১ এর এমন অনেক ঘটনা আছে যা পরিবারের দুঃসহ স্মৃতি। অনেক সময় অনেক অহংকার যেমন গর্বিত করে তেমনি ভাবে তার উচ্ছাসের হাওয়াতে তছনছ করে জীবন। বীরাঙ্গনাদের সম্মান দিতে গিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে তারা যেন অসম্মানিত  না হয়। কারণ হায়েনার দল এখনো আছে এ সমাজে , এ দেশে। আর কিছু ভাতা আর সুবিধার জন্য মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা উঠা নামার মতো বীরঙ্গনার ক্ষেত্রেও যেন নয় হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.