ঈশ্বরের লীলায় মারিয়ার মর্যাদা!

Draupodi 1সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: মারিয়া রহমানের ‘কুত্তার বাচ্চা’ শব্দটি এতো শোনা হয়েছে জীবনে যে আজকাল নিজেকে ভুলেও আর মানুষ মনে হয় না তার। রাস্তার পাশের বস্তিতে যখন কোন ঝগড়ার খিস্তি খেউরে শব্দটি তার কানে আসে, মারিয়া কান বাড়িয়ে দেয়। কখনও হয়তো কেউ ‘তু’ শব্দ করে কুকুরকে ডাকলেও মারিয়া নিজেকে ডাকছে ভেবে ভুল করে চলে যেতে পারে তার পাশে!

কেন মারিয়া কুত্তার বাচ্চা হয়ে গেছে এতো অবলীলায়? জানতে চাইলে বলেন, এই নামটি তাকে দিয়েছে সেই মানুষরুপী ঈশ্বর(!) যে তাকে জীবনে প্রথম ভালবাসার কথা শুনিয়েছিল! আজও নাকি তাকে ভালবাসে! তার ইচ্ছে হলেই চুপিচুপি এসে বলে ‘অনেক ভালবাসি তোমায়’। আর কোন কারণে ঈশ্বরের মন বিক্ষিপ্ত থাকলে মারিয়া ‘কুত্তার বাচ্চা’ হয়ে যায় সেই ঈশ্বরেরই কৃপায়!

এ কেমন ভালবাসা? এটাকে কি ভালবাসা বলে? কেউ কাউকে ভালবাসলে তাকে এভাবে অপমান করতে পারে? এতো তাচ্ছিল্য করে ছোট করতে পারে?

জবাবে, মারিয়া চোখের পাতা শক্ত করে চেপে বন্ধ করে। গড় গড় করে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা চোখের জল। তার কণ্ঠ চেপে ধরে যেন কেউ। কিছুক্ষণ কথা বের হয় না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসে বিদ্ধ করে নীরবতার বুকে! বলেন, ‘আমি সব ভুলে যেতে চাই! সিজোফ্রেনিয়া রোগীর মতো! আমার সকল গত-বিগতকে আমি ভুলে যেতে চাই!’

এই মারিয়া রহমান একজন শিক্ষিত নারী। কর্মজীবীও বটে। নিজে উপার্জন করে ছেলেমেয়ে বড় করছেন। নিজেও  চলেন। সংসারে স্বচ্ছন্দ না থাক, দিন তো চলে যায়। কিন্তু এক সময় এমন ছিল না তার জীবন।পরনির্ভরশীল এক নিকৃষ্ট ইতরের মতো ছিল তার বসবাস।

একসময় তার সন্তানদের বাবা শীতে কুকুরের গায়ের লোম ফুলে উঠলে চট কেটে জামা বানিয়ে পরিয়ে দিতেন কুকুরটিকে। হাড়ির গরম ভাত ঠাণ্ডা হওয়ার আগে কুকুরের থালায় ঢেলে দিতেন। কুকুরটির শরীরে কোথাও জখম হলে ঔষধ লাগিয়ে দিতেন নিজ হাতে। এখনও নাকি তিনি একইভাবে কুকুর ভালবাসেন। কিন্তু মারিয়ার শরীরে তখনও সামান্য শীত নিবারণের কাপড় ছিল না। তার থালায় ভাত তুলে দেয়া তো দূরের কথা, কোনদিন তিনি খেয়েছেন কিনা খায়নি গৃহকর্তা জানতে চায়নি একবারও। তখন কুকুরটিকে নিজের চেয়ে অনেক বেশী ভাগ্যবান মনে হতো মারিয়ায়। কুকুরটিকে হিংসেও হতো তার।

মারিয়া কুকুরটির মতো সম্মানিত হওয়ার জন্য সংসার ছাড়েনি সেদিন। বরং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মানুষের মতো সম্মান ও ভালবাসা পাওয়ার সুতীব্র বাসনা তাকে বাধ্য করেছিল আলাদা হতে। তারপর একদিন সেই ভালবাসার ডাকও এসেছিল। জীবনের প্রথম প্রেমের মতো সেই আহ্বানে সেদিন শুধু সাড়াই দেননি মারিয়া, বরং মুগ্ধ বিবরের মতো সেই আহ্বানের স্রষ্টাকে অবলম্বন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। সেই সুন্দর ক্ষণ, সেই স্বপ্নময়তা তাকে বার বার আলিঙ্গন করে বলেছিল ‘এইতো জীবন, যা তুমি চেয়েছিলে এতটা কাল!’

খুব বেশিদিন লাগেনি মারিয়ার এমন ঘোর কেটে যেতে। যখন তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন এই জীবনও সম্মানের নয়, নয় কোন দায়বোধের। শুধু মোহের ঘোরে আবিষ্টতা ছাড়া। তবুও মারিয়া গুটিয়ে নিতে পারেনি নিজেকে। প্রতিবার অপমানিত হয়ে নিজকে প্রবোধ দিয়েছে এই বলে যে, ভুল মানেই পাঠ। সবার জীবনে এই পাঠ জোটে না। এমন পাঠ প্রয়োজনও পড়ে না কারো কারো। কিন্তু মারিয়ার কঠিন পাঠও বিফলে যায় প্রতিবার তার অন্ধ আবেগের কাছে।

সেই গৃহকর্তার পালিত কুকুরকে তিনি সেদিন হিংসে করলেও এমন ‘কুত্তার বাচ্চা’ তাকে আজ মোটেও সম্মানিত করেনা। বরং রোজ রোজ এমন ‘কুত্তার বাচ্চা’ হওয়ার অপমান তার জীবনের তারগুলো ধুয়ে মুছে ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়।

নিজেকে এতো তুচ্ছ করে মিথ্যা মোহের আবেগকে জয়ী হতে দেয়া কি পরাজয় নয়? জবাবে বলেন, আমি ভুলে যেতে চাই, সবকিছু! আমি ভুলে গিয়ে জয়ী হতে চাই।

সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.