চলুন বিষন্নতা নিয়ে কথা বলি

Deepika 2উইমেন চ্যাপ্টার: বিষন্নতা আর দু:খ এক জিনিস নয়। দু:খকে পাশ কাটিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব হলেও, বিষন্নতা কাটানো যায় না। এটা অনেকটাই মারণঘাতী। বিষন্নতার শিকার হয়ে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর পথ বেছে নিচ্ছে, এমন লোকের সংখ্যাও বাড়ছে ক্রমশ:। বিশেষ করে সেলিব্রিটিদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি।

এমনই একটি অবস্থার শিকার হয়েছিলেন বলিউডের এ সময়কার অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোন। অবশেষে এনডিটিভির একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে এ ব্যাপারে মুখ খুললেন তিনি। বললেন, মা-বাবা, বন্ধু, চিকিৎসক সবার সহযোগিতাই তাকে এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সাহায্য করেছে।

কেমন ছিল বিষন্নতার সেই অনুভূতিটা? দীপিকা বলছিলেন, তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না, তার কেমন লাগছে। খুব কান্না পাচ্ছিল। ঘুম ভাঙার পর একধরনের শূন্যতা তাকে পেয়ে বসে। হঠাৎই সব অর্থহীন হয়ে যায় তার কাছে। হাউ-মাউ করে কান্না শুরু করেন। ঠিক সেই সময়টাতে তাকে দেখতে এসেছিলেন মা-বাবা। প্রথমে ভাবেন যে, হয়তো তারা চলে যাবেন ভেবেই এমনটি হচ্ছে। কিন্তু না, এটা তখন কেবলই বাড়ছিল। কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলেন না নিজেকে।

মা তাকে এ অবস্থায় দেখে অবাক হয়ে যান। মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপিকা ছোটবেলা থেকেই বেশ শক্ত মনের। যেকোনো পরিস্থিতি সে একাই সামলে নিতে পারে। তাই তার কান্নাকে প্রথমে তিনিও খুব একটা গুরুত্ব দেন না, ভাবেন যে, তারা চলে যাবেন বলেই হয়তো সে কাঁদছে। কিন্তু না। মায়ের মনে হলো, কোথাও কিছু একটা হয়েছে। তিনি নানান প্রশ্ন করেন দীপিকাকে, কাজের ক্ষেত্রে কিছু হয়েছে কিনা, কেউ কিছু বলেছে কিনা! পরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন থেকে যাওয়ার। টিকেট ফিরিয়ে দেন।

দুজনই মুখোমুখি হন এনডিটিভির বিশেষ এক প্রোগ্রামে। সেখানে ছিলেন দীপিকার কাউন্সিলর ও চিকিৎসক।

বিষন্নতা একটা ভয়াবহ মানসিক রোগ, একে চেপে যাওয়া মানেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা, তাই এ ব্যাপারে সবার সচেতনতা প্রয়োজন, সবারই মুখ খোলা প্রয়োজন। এটা কোনো কলংকের কিছু নয় কারও জন্যই, যে কারও হতে পারে। এসবকিছুই উঠে এসেছে তাদের আলাপচারিতায়।

দীপিকা বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলছি এ কারণেই যে, আমি যদি একটি জীবনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারি, এবং আমি কিসের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, সেকথা সবাইকে জানাতে পারি, পাশাপাশি এটাও বলতে পারি যে, আমার চারপাশের মানুষ অনেক সহায়ক ছিল বলেই আমি এটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি’।

‘মানুষের মাঝে যখন থাকতাম তখন ভালো লাগতো, তবে নিজের ঘরে ফিরে গেলেই পেয়ে বসতো সেই বিষন্নতা। কখনো কখনো মনে হতো ঘুমের মাঝেই যেন হারিয়ে যাই, ঘুম থেকে যেন উঠতে না হয়’।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে যখন খ্যাতির চুড়ায় দীপিকার ক্যারিয়ার ঠিক তখনই বিষন্নতার ছায়া পড়ে তার ওপর। খুব কম সময়ের জন্য হলেও বেশ ভাল একটা ছাপ ফেলে যায় তার জীবনে। তিনি বলেন,
“গতবছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎই মনে হলো আমি একা কি করবো? কোথায় যাবো কোনো সঠিক দিকনির্দেশনাই যেন পাচ্ছিলাম না। চোখে-মুখে খালি শুন্যতা। খুব কষ্ট করে পার করেছি নিউইয়ারের শুটিংয়ের সময়টা।”।

দীপিকা স্বীকার করেন যে, বিষন্নতার সময়টুকুতেও তিনি একবারের জন্যও নিজেকে গুটিয়ে ফেলার কথা ভাবেননি। বলেন, ‘আমি আমার কাজকে নিয়ে কখনও কোনো প্রশ্ন করিনি। তবে নিজের ভেতরে দোদুল্যমানতা ছিল’। তিনি তখন সাহায্য নেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা চান্দির। সেই চিকিৎসকই তাকে আস্তে আস্তে বিষন্নতাকে প্রথমে মানিয়ে নিতে এবং পরে সেখান থেকে বের হতে সাহায্য করেছেন। দীপিকা প্রায়ই মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠাতেন সেই চিকিৎসককে এবং এভাবেই আস্তে আস্তে একটা জায়গা তৈরি হয়, যেখানে তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে পারতেন, তার নিজের জীবনে কি হচ্ছে, তা বলতে পারতেন।

চিকিৎসক চান্দি জানান, দীপিকা তার অসহায় অবস্থাকেই শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। কারণ তিনি দিনের পর দিন তার কাজ অব্যাহত রাখছিলেন। তার ক্ষুদে বার্তাগুলো ছিল এরকম, ‘আমার শূন্য লাগছে সব’ অথবা ‘শূন্যতা আমার মাঝে’। আর এরপরই তিনি কাজে ফিরে যেতেন। এমনই চলছিল।

এক ধরনের উদ্বেগ আর শূন্যতা ঘিরে রাখতো সবসময় দীপিকাকে। নি:শ্বাসটা কেমন যেন অচেনা মনে হতো। গভীর নি:শ্বাস নিতে পারতেন না। ছোট ছোট শ্বাস নিতেন। মাঝে মাঝে মতে হতো, দম আটকে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে পেটের ভিতরটাও খালি বোধ হতো। একথা তিনি অনেকবার ডাক্তারকেও বলেছেন। তার মনে হতো, তার পেটের ভিতরটা কেউ যেন বেঁধে রেখেছে।

দীপিকার ভাষায়, “আমার যখন ম্যালেরিয়া হয়েছিল বা পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম, তখন সবসময় মনকে বলতাম সারিয়ে তুলতে। কিন্তু বিষন্নতার সময়টাতে আমার মনই সায় দিচ্ছিল না। মনই যদি কথা না বলে, তাহলে যাবো কোথায়? কি করবো? সবসময় নিজের সাথে কথা বলতাম, কিন্তু কোন উত্তর পেতাম না।

যেকোনো বিষয়েই আর দশজনের চেয়ে একটু বেশি খোলামেলা দীপিকা পাডুকোন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে তার বিষন্নতা নিয়ে লেখালেখির জবাব দেয়া ছাড়াও, সমাজে এসব কারণে দুর্ঘটনার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির জন্যও তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন।

কোনো মানুষ যেনো বিষন্নতায় ডুবে না যায় সেজন্য ‘লিভ লাভ লাফ ফাউন্ডেশন’ নামের মানসিক পরিচর্যা সংস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই বলিউড সুপারস্টার। তিনি এখন কয়েক মাস ধরেই বিশেষজ্ঞ এবং মনোজিকিৎসকদের সাথে কাজ করছেন এ নিয়ে। সংস্থার নামও রেজিস্ট্রি করা হয়ে গেছে। দীপিকা ২০১৫ সালটিতে মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার কাজে ডুবে থাকতে চান এবং এ বিষয়ে যাতে সবাই মুখ খোলে সেই চেষ্টা করে যেতে চান।

‘কারো ক্ষেত্রে যখন এধরনের ঘটনা ঘটে তার মনে হয়, আমার সাথেই কেন এমন হচ্ছে। আপনি ভাববেন না যে পৃথিবীতে আপনি একাই বিষন্নতায় ভুগছেন, হাল ছাড়বেন না, মনে রাখবেন অবশ্যই দূর হবে আপনার নিরাশার দিন’।

সবশেষে দীপিকা, তার মা এবং দুই চিকিৎসকের অভিমত হলো, বিষন্নতা আর সব রোগের মতোই একটি রোগ। মাথা ব্যথা হলে যেমন ওষুধ খেতে হয়, এরও প্রয়োজন আছে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মুখ খোলা। এটা কোন গোপন বিষয় না। যত তাড়াতাড়ি মানুষ, যতবেশি এ নিয়ে কথা বলবে, এ থেকে তত দ্রুত পরিত্রাণও পাবেন।

সৌজন্যে: নোভেনা তাসনিম, একাত্তর টেলিভিশন

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.