ভারত কেন নির্ভয়াকে ভালবাসে, আর ঘৃণা করে সুজেটকে

Suzette Jordan
সুজেট জর্ডন

উইমেন চ্যাপ্টার: ‘আমরা সেইসব নির্যাতিতাদের ঘৃণা করি যারা তাদের নির্যাতনের কথা বলার জন্য বেঁচে থাকে, নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও যারা বেঁচে থাকতে চায়, নিজের মতো করে মাথা উঁচু করে বাঁচে। যৌন নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়েও যেসব নারী সোৎসাহে জীবন চালিয়ে যায়, আমরা তাদের ঘৃণা করি’।

কথাগুলো একজন আইনজীবীর, একজন নারী অধিকার কর্মীর। নাম তার ফ্লাভিয়া আগ্নেস। পত্রিকার এক কলামে তিনি ধর্ষণের শিকার দিল্লির নির্ভয়া এবং কলকাতার সুজেটের তুলনা করতে গিয়ে একথা বলেন।

তিনি লিখেছেন, এটা খুবই মর্মান্তিক যে, এখনও, এই সময়েও, এতো বছর পরও নারীর প্রতি আমাদের মনোভাবের কোন পরিবর্তন আসেনি, বিশেষ করে যেসব নারী ধর্ষণের শিকার হয় এবং যারা এই দুর্ঘটনার পর প্রাণে বেঁচে যায়। এসব নারীর ক্ষেত্রে সেই একই পুরনো কাসুন্দি আমরা ঘেঁটেই চলেছি। বিভক্তির রেখাটিও কিন্তু স্পষ্ট এক্ষেত্রে। কে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতার দাবি রাখে, সহানুভূতি পাবে আর কে পাবে না। আমাদের সমর্থন পেতে হলে নির্যাতিতকে ভিকটিমকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে, সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে তাকে মরে যেতে হবে। জীবনের চাইতেও তাদের বৃহত্তর হতে হবে, যাতে আমরা তাদের সম্মান করতে পারি এবং আদর্শ হিসেবে নিতে পারি।

আমরা তাদের ঘৃণা করি যারা একই সাথে হাসতে পারে এবং কাঁদতেও পারে, যারা নাচতে পারে এবং ন্যায়বিচারের জন্য লড়তেও পারে। সুজেট জর্ডনের একজন বন্ধু হিসেবে হরিশ আয়ার, যিনি কিনা সমকামিদের অধিকার আন্দোলনের একজন কর্মীও, তিনি সুজেটের মৃত্যুতে তার প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা তাকে হেয় করেছি, তার সম্মানবোধকে আমরা থোরাই কেয়ার করেছি, আমরা মৌখিকভাবে তার প্রতি পাথর ছুঁড়েছি, এবং সবশেষে আমরা তাকে হত্যা করেছি।

প্রকৃত ঘটনা হলো, সুজেট নিজ নামেই পৃথিবীকে মোকাবিলা করার সাহস দেখিয়েছিলেন, টিভি ক্যামেরার সামনে নিজের মুখেই বলে গেছেন, তার ওপর নির্যাতনের গল্পগুলো, একই অবস্থার শিকার হাজারও মানুষের উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিলেন সুজেট, প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে গেছেন আমাকের।

কিন্তু আমরা তাকে দেখতে চাইনি, জানতে চাইনি, তার সাথে একই টেবিলে বসে রেস্টুরেন্টে খেতে চাইনি। এমনকি তার মৃত্যুতেও কিছু পত্রিকা তার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লিখেছে, ‘পার্কসাইড রেপ ভিকটিম’, যে শব্দটা সম্পর্কে সুজেটের প্রচণ্ড বিরোধিতা ছিল, সেই শব্দটাই উচ্চারিত হয়েছে নানাভাবে। আমাদের আইনে ধর্ষণের শিকার নারীর নাম প্রকাশ করা হয় না, সুজেটের এ নিয়ে আপত্তি ছিল। তিনি চেয়েছিলেন তার নামটা জানুক সবাই। কিন্তু মৃত্যুতেও তার কানাকড়ি মূল্যও দেয়া হয়নি। ধর্ষণের শিকার একজন নারীর লজ্জা এবং কলংক যেন তার সাথেই থাকে, তার সাথে সাথে কবর পর্যন্ত যায়, এটাই চাওয়া এই সমাজের। এই হিপোক্রেসি আমাকে পিষে মারে।

ধর্ষণের শিকারকে খুবই নীরবে, আবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হবে, ঘটনার দু:সহ স্মৃতি যেন তাকে তাড়িয়ে ফেরে, তার সব ব্যবস্থা পাকা থাকে। এর বাইরে তার অন্য কোন জীবন হতে পারে না। সবসময়ই তাকে আতংকে থাকতে হবে যেন তাকে কেউ ধর্ষণের শিকার বলে চিনে না ফেলে। অবশ্য নির্ভয়ার গল্পটা অন্যরকম।

নির্ভয়াকে আমরা ভালবাসি, সে নিজের সম্মান রাখতে গিয়ে মারা গেছে। মৃত্যু পর্যন্ত সে তার ‘সম্মান’ জ্বলজ্বলে রেখে গেছে। মৃত্যুতে তাকে অনেক বড় দেখানো হয়েছে, এমনকি আইকন বানানো হয়েছে, আধুনিক যুগের ‘ঝাঁসি কা রানি’ও করা হয়েছে। নৃশংসতা যত বেশি হবে, আমাদের ভালবাসাও তত প্রবল হবে। আমরা তার শরীরে ক্ষত স্থানগুলো গুনতে গুনতে শেষযাত্রার প্রস্তুতি নেই মহা আনন্দে।

আবার তাকে অবশ্যই দরিদ্র দলিত সম্প্রদায়ের, বা ধর্ষণের শিকার  উপজাতি এবং চরম নিগৃহীত হওয়া যাবে না। কারণ এদের দিয়ে ঠিক ‘আইকন’ বানানো সম্ভব না। তাকে অবশ্যই আমাদের সমাজের হতে হবে, আমরা যেন তাকে চিনতে পারি।

প্রত্যেকেই যাতে এই আইকনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে, কারণ সে আর নেই পৃথিবীতে। সে শুধুমাত্র একটি স্মৃতি, রক্ত-মাংসের প্রকৃত নারী সে নয়। ফ্রেমের বাইরে সে থাকতে পারবে না, সে অমর। তখন সে হয়ে যায় জাতীয় সম্পদ, এমনকি এর বাইরেও যদি কিছু থাকে, বিশ্বসম্পদও হয়ে যেতে পারে। তাকে নতুন করে অভিষিক্ত করা যেতে পারে, আইনের পুনর্গঠন হতে পারে, নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পারে, তার নতুন নামে মোবাইলে নতুন অ্যাপও সংযুক্ত হতে পারে। সিনেমা তৈরি হতে পারে, আর একে ঘিরে বিতর্কও চলতে পারে। সে তখন হয়ে যায় সমাজের সবচেয়ে নামী-দামি পাবলিসিটির উপকরণ। সবার জন্য উন্মুক্ত।

আবার একই সময়ে তার সাধারণ জীবনযাপনের স্মৃতি, যেমন একজন তরুণী মেয়ে, স্বভাবতই যার ভিতরে যৌনাকাঙ্খা আছে, ক্যারিয়ার নিয়ে স্বপ্ন আছে, যে তার বন্ধুকে নিয়ে শপিং মল বা সিনেমা দেখতে যেতে পারে, এসবই মুছে ফেলা হয়। তাকে বিশুদ্ধ করা হবে, উৎসর্গিকৃত ছাগলে রূপ দেয়া হবে তাকে। আমরা বেরিয়ে আসবো, বিক্ষোভ করবো, মোম জ্বালবো এবং তার হয়ে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করবো। মৃত্যুদণ্ড চাইবো নির্যাতকদের, এমনিক যারাই সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ, তাদের বিচারও চাইবো। এটা আমাদের ভাবতে ভাল লাগায়, আমাদের আন্দোলনের জায়গাটা এসব ঘটনা পুনরুজ্জীবিত করে।

আর আমাদের এসব তৎপরতা দ্রুত বিচারের পথ প্রসারিত হবে, শাস্তি নিশ্চিত হয়। সর্বোপরি, এর মধ্য দিয়ে আমাদের নিজেদের সম্মান এবং গোটা দেশের সম্মান রক্ষা হয়।

সুজেটের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না। তার সাহস, তার রুখে দাঁড়ানো, এসবই অমূলক। আমরা একে চূর্ণ করে দিতে উদ্যত। আমরা এসব ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়াকে আরও নাজুক করে তুলি, বিচার চাইতে গেলে তাকে মৌখিকভাবে এবং নানাভাবে আরও ধর্ষণ করে চলি। এসবই তাকে দমিয়ে দিতে যথেষ্ট। সুজেটের ক্ষেত্রে বিচার চলতে পারে অনন্তকাল ধরে, কেউ না, এমনকি একজন নারী বিচারকও তার সম্মান রক্ষার্থে আদালতে দাঁড়ায় না। ধর্ষণের সময় যে প্যান্টি সুজেটের পরনে ছিল, সেই রক্তমাখা প্যান্টিটি বরং আদালতে বার বার উপস্থাপন করে সুজেটকে অপমানে জর্জরিত করা হয়, কষ্টের জায়গাটা বাড়িয়ে তোলা হয়। প্যান্টি তো আসলে কোন বিষয় না, কারণ আমরা প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় প্যান্টি-ব্রা সবই দেখতে পাই, সেক্সি মেয়ে-ছেলের পরনে দেখতে পাই, সুজেটের সেই প্যান্টিও সেইরকমই। বিচারকরা একবারও ভাবেনি যে, এটা সুজেটের জন্য কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে।

এরকম ঘটনা ভুরি ভুরি। মুম্বাইয়ে এরকম ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছিল আরও নানা কাহিনী।

কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, সুজেট জানতেন, তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কতটা আশার সঞ্চার করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, তিনি সাহসের প্রতীক, উৎসাহের প্রতীক। তিনি যখন টিভি স্ক্রিনে আসতেন, অনেকেই তাকে উৎসাহ দিয়েছেন, দেশজুড়ে মানুষ উৎসাহের সাথেই সেই অনুষ্ঠান দেখেছে। আবার এমনও আছে, যারা সুজেটকে দেখে কেঁদেছে, নিজেদের যন্ত্রণার কথা মনে পড়ে গেছে সুজেটের কথায়। তাদের ক্ষত কখনও শুকাবে না। কিন্তু তারা আশাবাদী যে, কোন না কোন একদিন তারাও সুজেটের মতো হতে পারবে।

এতো নিগ্রহ, নির্যাতন, হয়রানি, অপমানের পরও সুজেট ছিলেন একজন রোল মডেল, তার কিশোরী মেয়ের জন্য আলোকবর্তিকা। আমি নিশ্চিত, তার মেয়ে মায়ের মতোই শক্তি আর সাহস নিয়ে নিজের জীবন চালিয়ে যেতে পারবে, সুজেট তাকে সেই পথই দেখিয়ে গেছেন। কম্প্রোমাইজ নয়, নিজের বিশ্বাসের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই, এই তো সুজেটের শিক্ষা। হতাশা-দু:খ-কষ্টের মাঝেও জীবনের প্রতিটি মূহূর্ত কিভাবে উপভোগ করে বেঁচে থাকতে হবে, সেটা শিখিয়ে গেছেন সুজেট, বিশেষ করে জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো নিয়ে কিভাবে বাঁচতে হয়, সুজেট তা দিয়ে গেছেন তার মেয়ের মাঝে।

(লেখাটি ঈষৎ সংক্ষেপিত)

ফ্লাভিয়া আগ্নেস: আইনজীবী, নারী অধিকার কর্মী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.