যেমন বিজয় চাই

BD Cricনওরীন তামান্না: সে অনেক কাল আগের কথা। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান আমার বাবা। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে পড়তে গিয়েছিলেন। কথা ছিল পড়াশোনা শেষে যে ছেলেটি সবচাইতে ভাল রেজাল্ট করবে, তাকে স্কলারশিপ দিয়ে পাঠানো হবে সুইডেনে উচ্চশিক্ষার জন্য। খুব খেটেখুটে পড়েছিলেন আব্বা। টানা প্রথম হয়েছিলেন প্রতিটি পরীক্ষায়। দ্বিতীয় হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের একটি পাঞ্জাবী ছেলে। স্কলারশিপ দেওয়ার সময় দেখা গেল সবাইকে অবাক করে নির্বাচিত করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের ছেলেটিকে। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা আমার বাবা, ছোটোখাটো বাঙালী ছেলেটিকে বিদেশে পাঠানোর যোগ্য মনে করেননি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ। সেদিন আব্বার সে কি কান্না! সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ছিলেন এক সুইডিশ ভদ্রলোক। তিনি তখন বাবাকে ডেকে বলেছিলেন – তুমি মন খারাপ কোরো না, একদিন এর চেয়েও ভাল কিছু তোমার হবে, দেখে নিও। তাই হয়েছিল। পরে আরও অনেক বেশী সম্মানজনক একটি বৃত্তি নিয়ে বাবা চলে যান সুইডেনে।

আজ পর্যন্ত বাবা স্মরণ করেন তার সেই শিক্ষককে। বলেন “মাঝে মাঝে হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া যায়”।

পৃথিবীর আর সব খেলার মতো ক্রিকেট খেলাতেও হার-জিত থাকে। কিন্তু কখনো কখনো দল হারলেও জিতে যায় দেশ। জিতে যায় ক্রিকেট। বিশ্বাস হচ্ছে না? বাংলাদেশ যখন নিউজিল্যান্ড এর সাথে হারলো এবার, তখন সমস্ত বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ বলেছিল “লড়াই করে হেরেছে আমাদের ছেলেরা, সাবাশ”। আমার জানা মতে পুরো পৃথিবীতে এক মাত্র বাংলাদেশের খেলাতেই সমর্থকেরা এই ভাষায় কথা বলে। সেদিন হেরে গিয়েছিল আমাদের দল, কিন্তু জিতে গেছে বাংলাদেশ, জিতে গেছে ক্রিকেট। বাংলাদেশ যখন ইংল্যান্ডের সাথে জিতলো, তখন দলনেতা মাশরাফি বলেছিলো – এই জয় তারা উৎসর্গ করেছে ১৯৭১ এর মুক্তিযোদ্ধাদের। জিতে গিয়েছিলো বাংলাদেশ।

আমাদের এই দুর্ধর্ষ দলনেতাটির একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম সেদিন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “বাজে খেললে দর্শকরা যখন গালি দেয়, তখন খারাপ লাগে না?” উত্তরে এই দুর্দান্ত ছেলেটি কি বলেছিলো জানেন? বলেছিলো – “আমরা তো দেশের মানুষকে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। কখনও হয়তো জিতেছি। কিন্তু বেশির ভাগ সময় আমরা খুব বাজে খেলে হেরেছি। তবু দেশের মানুষ দিনের পর দিন আমাদের সমর্থন করেছে। খারাপ খেললে গালি দেবে, এটাই স্বাভাবিক।”

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়ের পর বিলেতের পত্রিকাগুলো লিখেছিল – “ইংল্যান্ড টিমের পেছনে যে পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগ হয় তার এক শতাংশও ব্যয় হয় না বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমের পেছনে। টাকা নেই, কিন্তু এদের সবচেয়ে বড় সম্পদ এদের বুক ভরা ভালোবাসা, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি, ক্রিকেটের প্রতি।”

এর পরেও কি জেতার আর বাকি থাকে কিছু?

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বাচ্চা কিছু ছেলে নিয়ে আমদের এই দল। অনেকেই হয়তো ছোটোবেলায় বেড়ে ওঠার সময়টায় দামী কোচিং তো দূরের কথা, ভালো খাবারটুকু কোনদিন পায়নি। তারপরেও অদম্য সাহস নিয়ে কি সুন্দর দাঁড়িয়ে যায় এরা বাঘা বাঘা টিমগুলোর বিরুদ্ধে, বুক বেধেঁ দাড়াতে শেখায়, স্বপ্ন দেখায়। একটি খেলার হার-জিতে কি তার দাম শোধ হয়? বিলেতের ফুটবল প্লেয়ার, ক্রিকেট প্লেয়ারদের দেখি, তাদের পিছনে কোটি কোটি টাকার লগ্নি দেখি। আমার হৃদয় ভেঙ্গে যায়। উনিশ বছর বয়সী আমার বাবার মলিন চেহারাটি মনে ভাসে।

৭১ এর নয় মাস যখন শহীদুল্লাহ কায়সাররা বাংলাদেশের মাটি কামড়ে পড়েছিলেন, তখন বাঁচবেন না মরবেন তা একবারও ভাবেননি। রুমী-আজাদেরা যখন যুদ্ধে গেল, তখন একবারো ভাবেনি হারবেন কি জিতবেন। তারা শুধু ভাবতো লড়াই করতে হবে, লড়াই। কালকে ভারতের সাথে ম্যাচে আমি জানিনা বাংলাদেশ জিতবে কি হারবে। তাতে আসলে তেমন কিছু যায় আসে না।

ম্যাচের ফলাফল যাই হোক, যেন জিতে যায় ক্রিকেট, যেন জিতে যায় বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.