লং লিভ ‘ভারতকন্যা’

India Rapeউইমেন চ্যাপ্টার: বিবিসি’র তথ্যচিত্র ‘ইন্ডিয়ানস ডটার বা ভারতকন্যা’ নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে। সবাই জেনে গেছে তথ্যচিত্রটি সম্পর্কে, বিবিসি বা ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এটি দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে অনেকের। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পক্ষে-বিপক্ষে একটা মতামত তৈরি হয়েছে সবার।

সম্প্রতি এ নিয়ে ধর্ষণ একটি পুরুষালী রোগ সংক্রান্ত একটি লেখায় দৃষ্টি আটকে যায়। লেখক একে কেবল রোগ বলেই পার পেতে চাইছেন কেন? জ্বরজারিও রোগ, এইডসও রোগ। কাজেই রোগ বলে একে হালকা করে দেখার কোন ফুরসত নেই ধর্ষণের ক্ষেত্রে। বলা যায়, পুরুষতন্ত্রের সহজ ভাষাতেই কথা বললেন উনি।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, ধর্ষণ একটি পুরুষালি রোগ, এর চিকিৎসা দরকার। আমার প্রশ্ন হচ্ছে পুরুষের কোন রোগটা পুরুষালি না? বলবেন কি আমাকে এর উত্তরটা? বউ পিটানো, গৃহ নির্যাতন, এসিড সন্ত্রাস, খুন করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া, বিক্রি-পাচার করে দেয়া, ধর্ষণ করে হত্যা করা, ইত্যাদি কি পুরুষের আজকের রোগ?

না, এটি তাদের বহু পুরোনো রোগ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সকল কিছুর মালিক যখন পুরুষ, তখন তার রোগ না হয়ে যায় কই, বলেন। মেয়েটির চরিত্র ভালো না, বলে দেন, ব্যাস কেল্লা ফতে। আর কিছুই লাগবে না আপনার, বাকিটা এমনি এমনি হয়ে যাবে।

আমরা কি জানি না যে এমন ভাববার কারণ কি? আমরা জানি, এই যে সমাজ পরিবার সংসার জীবন-যাপন এর সবই পুরুষের তৈরি। ধর্ম, আইন, পড়াশোনা, যে কোন প্রতিষ্ঠান তার সবই পুরুষের তৈরি। এর মধ্যে বিবিসি’র তথ্য চিত্র এর বাইরে আমাদের কি দেখাবে? আমরা কি এবারই প্রথম শুনলাম মুকেশরা এই ধরনের কথা বলছে?

না, এটা জন্ম থেকে শুনে আসছি। এখনো শুনছি। পৃথিবী জুড়েই তো মুকেশরা আছে। বহাল তবিয়তে আছে। ভারতে এবং আমাদের এখানেও এ নিয়ে বলা হচ্ছে, সাধারণভাবে মানুষ নাকি এই তথ্য চিত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

কিন্তু কেন? কারণ কি? এই সত্য কথাটা বন্ধ করতে হবে কেন? কেন শুনতে দেয়া হবে না? কেন মুকেশের কথা শুনে হৈ হৈ করে উঠি ‘বন্ধ কর’ বলে? আমাদের ঘরে, পরিবারে, সমাজেই তো মুকেশ লুকিয়ে বা প্রকাশ্যেই আছে।

বাংলাট্রিবিউনে প্রকাশিত ওই লেখাটিতে লেখক তার লেখায় বেশ কয়েকটি পয়েন্ট তুলে ধরে বলেছেন, বিবিসি এখানে সাংবাদিকতার নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ধর্ষক মুকেশ সিং যেসব কথা বলেছে, তাতে নাকি ক্ষোভের পরিবর্তে সহানুভূতির উদ্রেক হবে, আর তাতে ব্যাহত হতে পারে বিচার প্রক্রিয়া। সেজন্যই তিনি এই তথ্যচিত্রটি প্রচারের বিপক্ষে তার অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

একজন লেখক, একজন দর্শক তা জানাতেই পারেন। এটা তার নিজস্ব মন্তব্য। কিন্তু বিবিসির পক্ষ থেকে বার বার চিঠি দিয়ে সেই ভ্রান্তি দূর করানো হয়েছে। তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালা অত্যন্ত শক্তিশালী। এটা না মেনে তাদের কোন রিপোর্ট কখনও প্রকাশিত হয় না, হলেও তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়, এটা আমরা সবাই জানি। কাজেই নীতিমালাহীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বিবিসি নিয়ে সমালোচনা খুব একটা হালে পানি পায় না।

তথ্যচিত্রের পটভূমি যে ঘটনা, ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিল্লিতে নির্ভয়া ধর্ষণের সেই ঘটনায় যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল ভারত ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে, যে কারণে আইন কঠোর করতে বাধ্য হয়েছিল কংগ্রেস সরকার, তাতে মুকেশ সিংয়ের কোন কথাতেই আর তার প্রতি কোন সহানুভূতিই যে কাজ করবে না, এটা লেখকের জানা থাকা উচিত ছিল। ভারত সরকার ভারতে তথ্যচিত্রটি দেখানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর বিষয়টি লাইমলাইটে চলে আসে। কেউ এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, কেউ কেউ বিপক্ষে।

অধিকাংশেরই মত, তথ্যচিত্রটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হোক। দিল্লি থেকে প্রকাশিত প্রখ্যাত পত্রিকাগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন ‘এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া’ যৌথভাবে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন নারীবাদী সংগঠন এবং নারী অধিকার আদায়ে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনও একই আবেদন জানিয়েছে।

তাদের বক্তব্য, তথ্যচিত্রটি যে কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আদতে তা ঠিক নয়। বরং এতে ধর্ষক এবং তার আইনজীবীরা যে কথা বলেছে, তাতে করে পুরো ভারতের নারীদের প্রতি মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে। একজন ধর্ষক যে কিনা সমাজের একেবারে নিচুস্তর থেকে আসা মানুষ, সে শুধুমাত্র ‘ফান’ করার জন্যই বেছে নিয়েছিল সেদিনের নৃশংসতম ঘটনাটি, আগে-পরে কিছু ভাবেইনি সে। নারীদের প্রতি তার যে মনোভাব তা মোটেও অনুকূল হওয়ার কোন সুযোগ নেই তার পরিবেশে। কিন্তু তাই বলে তার অন্যায় মওকুফের কোন সুযোগ নেই তথ্যচিত্রটি থেকে। বরং একজন ধর্ষক কিভাবে ঠাণ্ডা মাথায় তার কৃত অপকর্মের সাফাই গাইতে পারে, সেটাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এতে।

আর মুকেশের আইনজীবীরা মেয়েদের সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছে, আপত্তিটা সেখানেই। একজন লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ কি করে মেয়েদের সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করতে পারে, ধর্ষণকে জায়েজ করতে পারে, সেটা ভেবেই বরং গা শিউড়ে উঠে। তথ্যচিত্রটি না দেখলে তো সমাজের এই স্তর সম্পর্কে ধারণাই হতো না। সেজন্যই এটা দেখানোর পক্ষে অধিকাংশের মত।

কিন্তু কথা হলো, সবাই এমনভাবে ধর্ষক মুকেশ সিংয়ের ওপর হামলে পড়লো কেন?

সে যা বলেছে তা কি কেবল তার কথা? সে তো এই পুরুষ সমাজেরই প্রতিরূপ! ১০ ভাগ যদি ছেড়েও দেই, ৯০ ভাগ মানুষ মনে করে মুকেশ যা বলেছে তা ঠিক। আমার কথাটা কি বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে? তাহলে আসুন একটু এ্যানালাইসিস করি।

নারী কী পোশাক পরবে না পরবে, শরীর কতটুকু খোলা রাখবে বা ঢেকে রাখবে, বুকে কাপড় রাখবে কী রাখবে না, কাপড় রাখলে এক পাশে রাখবে, নাকি গলায় ঝুলাবে, পা ফাঁক করে বসবে না পা চেপে বসবে, পা ফাঁক করে ঘুমাবে না পা চেপে ঘুমাবে, কতটুকু জোরে হাসবে কি হাসবে না, কত দূর যেতে পারবে কি পারবে না, রাতে বের হবে কি বের হবে না, হলেও কতটুকু হবে ইত্যাদি ‘উপদেশ’ নারীর জন্য কারা ঠিক করেছে? উত্তর নিশ্চয়ই পুরুষ। পুরুষতন্ত্র। তথ্যচিত্রটিতেও আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাই।

মোদ্দা কথা নারীর জীবনই যখন নারীর না, তখন এই তথ্য চিত্র বন্ধ করার দাবি আমরা কেন জানাই? কেন ঐ তথ্যচিত্রটি দেখানো হবে না? কেন আমরা দেখতে পারবো না? মুকেশের কথা না শুনতে দিলেই কি সমাজ বদলে যাবে? অন্য মুকেশরা ভালো হয়ে যাবে?

বলা হচ্ছে মুকেশরা অসুস্থ অপরাধী, তাই যদি সত্য হয় তো কোন পুরুষই তো শুধু আর নিরপরাধী নয়। কারণ ঐ যে রোগ আছে তাদের। পুরুষতন্ত্রের রোগ। বেটাগিরির রোগ, ক্ষমতাশালীর রোগ, মাচো রোগ। এই রোগ থেকে তারা যেমন মুক্ত নয়, তাদের কারণে নারীরাও মুক্ত নয়। যে কোন কিছু নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান। মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের থাকতে হবে। তথ্যচিত্রটি প্রচার বা নিষিদ্ধ করার কথাটা ঠিক না।

শেষ করছি তসলিমা নাসরিনের একটি কবিতা দিয়ে। কবিতার নাম চরিত্র।

“তুমি মেয়ে, তুমি খুব ভালো করে মনে রাখো

তুমি যখন ঘরের চৌকাঠ ডিঙ্গাবে

লোকে তোমাকে আড়চোখে দেখবে।

তুমি যখন গলি ধরে হাঁটতে থাকবে

লোকে তোমার পিছু নেবে, শিষ দেবে।

তুমি যখন গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠবে,

লোকে তোমায় চরিত্রহীন বলে গালি দেবে।

তুমি যদি অপদার্থ হও তুমি পিছু ফিরবে,

আর তা না হলে যে ভাবে যাচ্ছো, যাবে।”

 

ইন্ডিয়ান ডটার বা ভারতকন্যাদেরই কেবল নয়, বিশ্বের সব কন্যাকে শুনতে হবে যে মুকেশদের দিন শেষ করে দিতে হবে আমাদেরই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.