‘আশায় বসত গড়ি…’

কাবেরী গায়েন (উইমেন চ্যাপ্টার): চারটি মহানগরে সিটি নির্বাচন শেষ হয়েছে। চার শহরেই বিএনপি এবং আঠারো দল সমর্থিত প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। একটি রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চার শহরেই বিরোধী দল-জোটের বিজয় আমাদের মত নড়বড়ে গণতান্ত্রিক দেশের জন্য বিশাল পাওয়া। বিএনপি এবং আঠারো-দলীয় জোট যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশ না নেবার অনড় অবস্থানে রয়েছে, সেই অবস্থানের ভীত অনেকটাই নড়ে যাবার কথা। এমনই তো হবার কথা যে কোন গণতান্ত্রিক দেশে। সরকারী দল প্রভাব খাটায়নি, নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টা করেনি। বাহ! আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। কারণ আমাদের স্মৃতিতে সরকারী দলের ছত্রছায়ায় নির্বাচন মানে মাগুরা উপ-নির্বাচনের ভয়াল আবছায়া। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এক অংশের বিজয় হয়েছে। মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছে। শুধু নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারাই এক বড় অর্জন আমাদের মত সব গণতন্ত্র-অভিমুখীন দেশগুলোর। আমার শৈশবের আবছা স্মৃতি বা রাজনৈতিক আলোচনার প্রথম আবছা-পাঠ ঘিরে রেখেছে ‘হ্যাঁ ভোট-না ভোট’-এর ক্যারিকেচার। মেঘলা দিনের গানের মত অস্পস্ট মনে পড়ে, কলেজ-পড়ুয়া আমার বড় ভাই, পাশের বাড়ির সালাম ভাই, কবির ভাইদের মুখে ‘না-ভোট’ বাক্স দুই মাইল দূরের ধানক্ষেতে ফেলে রাখার আলোচনা। বড় হয়েছি নির্বাচন নিয়ে নানা অদ্ভুত গল্প আর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পরে হাঁটি হাঁটি পা-পা করে যে অভিযাত্রা গণতন্ত্রের, যা বারে বারেই হোঁচট খেয়েছে, সেই অভিযাত্রা রোদে-জলে টিকে অবয়ব নিচ্ছে। সে’জন্য অদ্ভুত এক ভালোলাগাবোধ কাজ করছে।
অন্যদিকে ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না, এক ভয়ংকর প্রচারণারও জয় হয়েছে এই নির্বাচনে। বিশেষ করে, রাজশাহী এবং বরিশালের কথা যতটুকু শুনেছি, মারাত্মক ধর্মীয় উস্কানিমূলক প্রচারণা হয়েছে। এই দুই নগরের মেয়রদের কাজের যথেষ্ট ভালো নমুনা থাকা সত্ত্বেও তারা পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এবং সরকার এই উগ্র ধর্মীয় প্রচারণা নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নাকের ডগার উপর দিয়ে রং-বেরঙএর কাগজে তীব্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়ে সাজানো লিফলেট, প্রচারণা চলেছে। দেশের সব মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হবে, ইসলামের কোন নাম-চিনহ থাকবে না- এমন সব প্রচারণা চলেছে। এখানে নির্বাচন কমিশনের প্রতি অভিযোগ রয়ে গেলো। এমনকি পাকিস্তানে পর্যন্ত নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিধান জারি করেছিলো পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন। অথচ আমাদের দেশে আজো এমন কোন নজির স্থাপন করতে পারলো না আমাদের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এই ‘না-পারা’ সামনের নির্বাচনে কী ভয়াবহ ফলাফল নিয়ে আসবে, ভাবা যায় না। ইতিমধ্যে খবর পাওয়া যাচ্ছে , লালমোহনে মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে। সামনের নির্বাচনকে মাথায় রেখে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এলাকাগুলোতে জোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবার দাবি জানাই।

ইতিমধ্যেই সংশয় শুরু হয়ে গেছে, চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচার কেমন রুপ নেবে, সে’বিষয়ে। জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের যে দাবি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে উঠে ছড়িয়ে পড়েছিলো সারা দেশে, সেইসব দাবির ভবিষ্যত কী হবে, প্রশ্নগুলো জাগছে। আশা করতে ইচ্ছে করে, যাঁরাই বিজয়ী হয়েছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় তারা সামিল থাকবেন। থাকবেন কি?
আমরা যারা ক্ষমতা কাঠামোর অনেক বাইরে অবস্থান করি, অথচ দেশটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাদের নাছোড়বান্দা হয়ে স্বপ্ন দেখা আর দেখানোর কাজটি চালিয়ে যেতেই হবে। ক্ষমতায় যেই-ই আসুক, যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিকে যেনো কেউ পাশ কাটিয়ে যেতে না পারে, সেই পাহারাদারিকে জারি রাখাটা আমাদের আশু কাজ। সে কাজটা হয়তো দূ্রুহ, তবু চেষ্টা করার কোন বিকল্প নেই, ‘আশা নিয়ে ঘর করি, আশায় বসত গড়ি…’।

[divider]
লেখক পরিচিতি:কাবেরী গায়েন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.