ভাঙন যখন কোন সমাধান না

Woman-depressed-500x368উইমেন চ্যাপ্টার: জীবন কতরকম হয়, এই যে আমরা নারী অধিকার, নারী অধিকার নিয়ে চেঁচামেচি করি, মুখে ফেনা তুলি, তাতে কার কোথায় কী লাভ হচ্ছে, আমার অন্তত জানা নেই। কিন্তু আমরা নিজেরাই যদি, বা চারপাশের মানুষই যদি হেরে গিয়ে বসে থাকি, তাহলে এসব চেঁচামেচির আলটিমেট রেজাল্ট কি?

গত কয়েকদিন ধরেই আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে আরেক বন্ধুর সংসারের সমস্যাগুলোর কথা শুনে আসছিলাম। যখন শুনি, তখন অস্থির হয়ে পড়ি। নিজের অতীতে ঘটে যাওয়া অনেক কাহিনীর সাথে মিল খুঁজে পাই। আমিও তো ওই বেড়াজালেই বন্দী ছিলাম দীর্ঘদিন, কারও সাথে কোনদিন কথাগুলো শেয়ার পর্যন্ত করতে পারিনি। এখনকার মেয়েরা তো তবু একটা নির্ভেজাল, নির্ভর করার মতোন কাঁধ খুঁজে যায়, বলতে পারে তার কষ্টের কথা। আমি? কাউকে বলিনি কিছু, আমার কেউ ছিল না কোথাও বলার মতোন।

কিন্তু আজ যার কথা বলছি, সমাজের চোখে সে অনেক গুণী, সুখী সংসারের সুখী মানুষ আপাতদৃষ্টে। অধিকার আদায়ে পথে-মাঠে-ঘাটে সোচ্চার নারী। সেও শুনি পদে পদে অপমানিত হয় নিজ ঘরেই,। নিজেকে নিরাপত্তাহীন ভাবে নিজ ঘরেই।

কিন্তু এতো যার গল্প, সেই যদি শক্ত-জোরালো সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, তখন বিষয়টা বেশিদূর আর এগোয় না। এটাই সত্যি। কষ্ট হয় ওদের সংসারে ছোট্ট একটি মেয়ে আছে। বয়স পাঁচ বছর। ওর কচি কচি গল্পের ঝুড়িতে আমরা দিনরাত মশগুল হয়ে থাকি, কিন্তু ও যখন ভয়ে-আতংকে সেঁটিয়ে যায় নিজের ভেতর, তখন নিজেদের অপরাধী ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারি না।

দুজনই বন্ধু, কেউ কর্মক্ষেত্রে, কেউ সামাজিক ক্ষেত্রে। দুজনই প্রগতিশীল, সহযোদ্ধা, মাঠের লড়াকু কর্মী। দুজনের প্রেম-ভালবাসার ছবি ফেসবুকে দেখে নিজের ভেতর থেকেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আমার কেন এমন জীবন নেই? অথচ সেই ভালবাসার আড়ালে বিশাল এক নৃশংসতার গল্প। যার সমাধান আমি নিজে দিতে পারি না। অপেক্ষা করি, মেয়েবন্ধুটি নিজে থেকেই হয়তো কোনদিন এই সংসারের আগল ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে, যদি না ততদিনে সে একেবারে নি:শেষিত হয়ে যায়। ভয় হয়, পাছে তাকে খুন না হয়ে যেতে হয়। পাঁচ বছরের মেয়েটার চোখমুখ  মনে ভাসে। কী বীভৎসতা দেখে ও বড় হচ্ছে!

আগেও শুনেছি, প্রায়ই আমাদের পুরুষ বন্ধুটি মারধর করে স্ত্রীকে। সেই আঘাতের চিহ্ন আমাদের চোখ এড়ায় না।  কিন্তু মেয়েটি যেহেতু নিজে থেকে বলে না, আমরা আর কথা এগোই না এ বিষয়ে। ওকে নীরবে চোখে চোখে রাখি। ওর চোখ-মুখ দেখে ভিতরের কষ্টটা বুঝতে চাই। ওর বাচ্চাটাকে সময় দিয়ে ভুলিয়ে দিতে চাই রাতের ক্ষতগুলো।

শুনেছি কাল রাতে সেই সংসারের ওপর দিয়ে আবার ঝড় বয়ে গেছে। ক্ষত-বিক্ষত মেয়ে বন্ধুটা আমাদের জানিয়েছে সেই কাহিনী। শুনে শিউড়ে উঠেছি। রাত তিনটার দিকে মদ্যপ অবস্থায় আমাদেরই পুরুষ বন্ধুটি বাড়ি ফিরে  যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়েছে, পিটিয়ে শুইয়ে দিয়েছে তার বউকে, ছোট মেয়ের সামনেই। মেয়ে চিৎকার করে বলেছে, ‘বাবা, তুমি মেরো না মাকে, মা কষ্ট পাচ্ছে’। আরও অনেক কাহিনী ঘটিয়েছে বাবা ডাকের পুরুষটি, সেগুলো কথ্যযোগ্য নয় এখানে। ঘরের ভিতরের গল্প সবসময় বাইরে আনতে নেই।

পাঠক, যাদের সেই গল্প সম্পর্কে ন্যুনতম ধারণা আছে, তারা কল্পনায় ভেবে নিতে পারেন কী হয়েছিল কাল রাতে। আমি জানি, কারণ আমার জীবনে বার বার ঘটেছে এই ধরনের ঘটনা। আমারও বের হতে সময় লেগেছিল। হয়তো এক্ষেত্রেও লাগবে। বের হওয়া যদিও আমার চোখে সব সংকেটর সমাধান না, তারপরও বলি, একটু স্বস্তিতে ঘুমানোর অধিকার আমি চেয়েছিলাম জীবনভর, সেই স্বস্তিটুকু আমি পেয়েছি নিজের রক্ত-জল করা পরিশ্রম দিয়ে। আমার তাতেই শান্তি।

আমি এই গল্পের বন্ধুদের সংসারে নাক গলাতে ইচ্ছুক নই। কোন কোন ভালবাসা এমনই হয়, রক্তাক্ত করে দিয়ে যায়, তবুও আবার সব ভুলে একে-অপরকে জড়িয়ে থেকেই শান্তি পায় যুগল। হয়তো এটাও তেমনই এক ভালবাসা। কে জানে!  একেবারে শেষ হয়ে যাওয়ার আগে যদি ওরা নিজেদের শান্তি খুঁজে পায় তো, মঙ্গল। তা নাহলে অমঙ্গলই  বয়ে বেড়াবে জীবনভর। সংসার ভাঙতে সময় লাগে না, কিন্তু গড়তে লাগে।

তাই আমি চাই, ওরা একসময় আবার সব ভুলে  অন্তত কচি মুখটার দিকে তাকিয়ে হলেও সংসার সংসার খেলুক, নয়তো ভাণ করে হলেও পরে থাকুক মাটি কামড়ে। জানি এসব কথা নারীবাদীদের ভাল লাগবে না, কিন্তু জীবন থেকে বলছি, ভাঙন কোন সমাধান আনে না, বরং সমস্যাকে তীব্রতরই করে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.