কেন এমন হয়!

Women Riseতানিয়া মোর্শেদ: অনেক রাতে ঘুম আসে। তারপরও ঘুম ভেঙ্গে যায়। আচমকা মনে হয় আর কোনদিন বাবাকে দেখতে পারবো না …………………। তারপরই মনে পড়ে অভিজিৎ (ড: অভিজিৎ রায়) রক্তের স্রোতে উপুড় হয়ে আছে! বন্যা রক্তাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে মানুষের দিকে তাকিয়ে সাহায্য চাইছে! ছবিটা মানবতার মৃত্যুর ছবি!

১৯৭১-এর ছবি, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ছবি, আরো অসংখ্য ছবিরা সাথে এটিও যোগ হয়েছে! খুনীরা খুন করে চলে যায়, কেউ বাধা দেয় না! তারপরও এগিয়ে আসে না! সাহায্য চাইবার পরও না! পুলিশও দাঁড়িয়ে দেখে! মানবতা বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ঠিক কবে থেকে!

প্রতিবাদ করে দেশ বিদেশে অল্প কিছু মানুষ। বাকীরা নিশ্চুপ! মনে কি ভয়, প্রতিবাদ করলে যদি চিহ্নিত হয়ে যাই?! না কি তাঁর নামের সাথে “নাস্তিক” ট্যাগ ছিল তাই?! সবাই হিসেব করে। কেউ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার, কেউ ভোটের নিরাপত্তার!! এরমাঝে কিছু সেলিব্রিটি (বিশেষত ফেইসবুকে) লেখে কিন্তু, তবে যুক্ত করে। কেউ কেউ আরো বেশী সোচ্চার, নোংরামী চলে খবরে কাগজেও। মানুষ কবে এত অসভ্য হলো? না কি আগে থেকেই ছিল?!

ইসলামিক সন্ত্রাসীরা মানুষের কল্লা কেটে ফেলছে, ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে, স্কুলের মেয়েদের যৌন দাসী বানাচ্ছে, অপহরণ করছে, বিক্রি করছে, হাজারে, হাজারে মানুষ হত্যা করেছে, ধর্ষণ করছে। ক’জন তথাকথিত “মডারেট” মুসলমান প্রতিবাদ করেছে? তাদের “শান্তির” ধর্মকে কারা “বিকৃত” করছে? যুক্তিবাদী নাস্তিক বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মকে অস্বীকার করলে বেশী লাগে?

সময় কি ভাবে চলে যায়! দেখতে দেখতে ছ’মাস প্রায় চলে গেলো! আবার দিন ঘনিয়ে এসেছে, জাজমেন্ট ডে-র! ছ’মাস শুরু করবার মাসখানেকে মধ্যেই বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে আইসিইউ-তে যান। কী যুদ্ধটাই না করেছেন! আর কষ্ট!! আগে থেকে প্ল্যান ছিল দেশে যাবার, ডিসেম্বরে। সাড়ে তিন বৎসর পর! এই সময়টা গেছে দু’টো লাংস সার্জারিতে। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের মত ক্যান্সার যুদ্ধে, যুদ্ধটা অবশ্য আট বৎসর ধরে প্রতিনিয়ত।

কত প্ল্যান ছিল, মাত্র ষোল দিনে কি কি করবো! বাবার সাথে বেশী থাকবো এটা বাদেও। জানতাম এবার বাবাকে হয়ত চির বিদায় বলে আসতে হবে। তবে আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু অন্য রকম থাকে। কার দিক থেকে বিদায় কে জানে! বাবার আইসিইউ-তে লাইফ সাপোর্টে থাকার পুরো সময়টা কেটেছে, “কেন দুঃসাহস করে গ্রীষ্মে গেলাম না, যদি এমন হয় আমার যাবার আগ দিয়ে চলে যান, যদি আমি প্লেনে আর তিনি চলে যান,” এসব ভেবে দিন গুণে! মাঝে একদিন যখন তাঁর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হলো আমি ভিডিওতে তাঁকে দেখে বলেছিলাম, তিনি চলে যান, আমি এ কষ্ট দেখতে চাই না। না হোক আমার দেখা! তিনি মনে হয় আমার জন্যই এতদিন যুদ্ধ করেছেন! আমি দেখেছি তাঁকে। চলে আসবার আগের দিন আমায় চিনতেও পেরেছেন! এ ভাগ্য (!) ক’জনের হয়! আমি সব সময় দেখার বাইরেও দেখি। বাবাকে বিদায় দেবার সময় (জানতাম আর দেখা হবে না) নিজের সন্তানের কথা ভেবেছি, বাধ্য হয়েই। ভেবেছি, ওর কেমন লাগবে! দিনটাকে যেভাবেই হোক আরো কিছু সময় দূরে রাখতে হবে!

ফিরে এসে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে নিতে বাবা চলে গেলেন। থাকা (সে যেভাবেই হোক) আর না থাকার পার্থক্য এতো! এর মাঝেই এলো অভিজিৎ-এর হত্যার খবর। এবার দেশে গিয়েই বুঝেছি, আমি আমার দেশকে হারিয়ে ফেলেছি, ধর্মান্ধ, অতিধার্মিক মুসলমানদের কাছে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ দেখবার স্বপ্ন দেখা যায়, হয়ত স্বপ্ন একদিন সত্যিও হতে পারে (কি ভাবে, কখন ইত্যাদি এখন না জানলেও)।

কিন্তু ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্তি কি এত সহজ?! গোটা পৃথিবী আজ এর কোপানলে, আর সেখানে ৯০% মুসলমানের দেশে কে বলবে, কি করবে ইসলামী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে? আর যেখানে বর্তমানের রাজনীতিও হচ্ছে ক্ষমতার লোভ। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলও আজও ইসলামী প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে! হেফাজতিদের শান্ত রাখছে! আর সাধারণ মানুষ তা নীরবে দেখে। আমিও দেখি, কারণ এর বিকল্প নেই।

ভাবি, দেশে এত এত মানুষ নামের মানুষ আছে, কিন্তু ক’জন ধর্মের সাথে রাজনীতি, রাষ্ট্র, শিক্ষাকে আলাদা রাখায় বিশ্বাসী! কথা বললে, বন্ধুও যুক্তি দিতে আসে, তোমার চিন্তা-ভাবনা এখন থেকে কম পক্ষে পঞ্চাশ বৎসর পরের। তখন হয়ত কেউ বুঝবে।

নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি বেশ কিছুদিন ধরেই। সামাজিক অনুষ্ঠানে বাধ্য না হলে যাই না। এক সময় নিজের উদ্যোগে অসুস্থ অবস্থায়ও কিছু না কিছু করবার চেষ্টা করেছি। সেই আমি এখন নিশ্চুপ। প্রায় আট বৎসর ধরে যে স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনে প্রতিনিয়ত যুক্ত থেকেছি, কি করেছি তা বলবো না, আমি বলায় বিশ্বাসী নই, তাও ছেড়ে দিয়েছি! কারণ কি নিজের নিষ্ক্রিয়তা? অবশ্যই নয়।

আমি সার্জারীর পর যখন হাত নাড়াতে পারি না তখন আমার হাজবেন্ড মিজানকে বলেছি টাইপ করে আমার মতামত জানাতে, সেই আমি কেন ছেড়ে দেই? মানুষের ইগো হচ্ছে এক দানব। এ শুধু নিজেকেই ধ্বংস করে না, করে অনেক কিছুকে।

বাংলাদেশের পুরুষদের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, ব্যক্তি জীবনে কোনোভাবেই অভিজ্ঞতা না থাকলে, দেখেছি স্বেচ্ছাসেবা দিতে গিয়ে! আমার মত প্রতিবাদী মানুষ যুদ্ধ করেছে প্রায় প্রতিনিয়ত, কিন্তু অনেক অপমান সহ্য করেও থেকেছি। কারণ কাদের জন্য করছি সেটাই ছিল মূখ্য। আমার অপমান কিছু নয়। এক পর্যায়ে বুঝেছি, এর থেকে নিজে নিজে করবার সিদ্ধান্তটাই জরুরী। একা যতটা করা যায়, তার থেকেও অনেক বেশী করা যায় দশজনে, এটা ভেবেই তো এত সয়েছি!

কিন্তু আর কত! বিশেষত যখন অন্য অনেকের করা হয়, “মানুষের জন্য করলে আল্লাহ পুরষ্কার দেবেন, বা দেখে রাখবেন” এই সব চিন্তা ভাবনা থেকে! আর আমি ভাবি, মানুষই তো মানুষের পাশে দাঁড়াবে। ভাবি, বাবা যখন মৃত্যুর সাথে লড়ছেন সে সময়ও, চলে গেছেন তার ক’দিনে্র মধ্যেও আমি তো আমি, আমার মা কাজ করে দিচ্ছেন যে সংগঠনে, সেখান থেকে আমি এভাবে সরে এলাম! কী বলছি আমি! আমার মায়ের জীবনে তো এর থেকেও হাজার গুণে বড় ঘটনা আছে। অনেক আগে লিখেছি। (বই-এ আছে সেকথা) না আমি থেমে থাকবো না। অনেক ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও চলবে আমার চেষ্টা।

ফেইসবুকেও চলে বৈপরীত্যের আনাগোনা। পৃথিবীতে, দেশে যখন চলে চরম হতাশার খবর, অমানবিকতার খবর, তখনো কিছু মানুষ সেলফি তোলে, পার্টিতে সাজুগুজুর ছবি দেয়, নিজের গুণ কীর্তন চলে, আমাকে দেখো আমাকে দেখো চিৎকারে টাইমলাইন থেকে অভিজিৎ আর বন্যার রক্তাক্ত ছবি হারিয়ে যেতে থাকে! আমি চেয়ে চেয়ে দেখি! মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে আনফ্রেন্ড বাটন ব্যবহার করি। অচেনা ফ্রেন্ডদের বেলায়। কেন চেনা ফ্রেন্ডদের নয়? আমি দেখতে চাই তাদের সাথে আমার বৈপরীত্যের মাত্রা!

বেশ কিছু সমমনাদের পেয়েছি গত ক’দিনে। নিজেই কাউকে কাউকে বন্ধু রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি! এটা খুব কম ঘটে। কিন্তু আমিও বুঝেছি, হারিয়ে যেতে যেতে মানুষ শেষ চেষ্টা করে, অনেক ভাবেই! হ্যাঁ আমি হারিয়ে যাচ্ছি তা জানি! আমাকে কিছুটা জানে এমন মানুষও বলছে সে কথা!

স্বপ্ন দেখা আমি, এখন শুধু তাকিয়ে থাকি, শুনি, সন্তানের স্বপ্ন! ভাবি, এ কোন পৃথিবীতে এনেছি তাকে! তাকে আরেকটু সাহসী, দৃঢ় করবার জন্য আমার আরো কিছু সময়ের প্রয়োজন! ভাবছি, এ ছ’মাসে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে আমি কতটা শক্তিশালী থাকতে পেরেছি?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.