আমাদের যত কৌতূহল

Bonnaসেবিকা দেবনাথ: নিহত লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে বেশ মুচমুচে তথ্য বের করে এনেছেন কিছু রিপোর্টার। পাঠকের সব রকমের জ্ঞান পিপাসা (আজাইরা যত চিন্তা) মেটাতে তারা সর্বদা প্রস্তুত এর প্রমাণ দিয়েছেন তারা। শুধু তাই নয় তাদের ভাবখানা এমন ছিল যে, ‘পাইছি এক্সক্লুসিভ নিউজ করার এখনইতো সময়’ তাই লেগে পড়ো। কার আগে কে ‘ব্রেকিং’ দেবে সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন তারা।

হয়তো ওই সব রিপোর্টাররা বন্যার আগের স্বামী কে? কি করতেন? তাদের ছাড়াছাড়ি হয়েছে? ছা ড়াছাড়ি হলে কেন হয়েছে? তিনি কি জীবিত আছেন? থাকলে কোথায়? মারা গিয়ে থাকলে সেই মৃত্যু কি স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক? অভিজিৎ এবং বন্যার পরিবার কি তাদের বিয়েটা মেনে নিয়েছিল? চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলে তিনি কার কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন….. ইত্যাদি ইত্যাদি…. এমন কোটি টাকা মূল্যমানের (তাদের কাছে) প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার কাজে আত্মনিয়োগ করবেন।

ওইসব তথ্য দিয়ে বেশ মুখরোচক রিপোর্ট নিজেদের গণমাধ্যমে পরিবেশন করবেন পাঠকের সস্তা মনোরঞ্জনের জন্য। পাঠক এবং ওইসব রিপোর্টারদের এই আগ্রহ হয়তো অতটা হতো না যদি না অভিজিৎ আর বন্যা দু’জন দুই ধর্মের হতেন। স্যারকেও (অধ্যাপক অজয় রায়) কেউ কেউ এমন সব প্রশ্ন জিজ্ঞাস করেছেন যা সত্যিই দুঃখজনক।

প্রবাদ আছে, পৃথিবীতে নাকি সব চেয়ে ভারী বস্তু হচ্ছে ‘পিতার কাধে পুত্রের লাশ’। পুত্র শোকে কাতর সেই পিতার কাছেই জানতে চাওয়া হয়েছে অভিজিৎ আর বন্যার পরিচয় কিভাবে হলো? কবে তারা বিয়ে করেছেন? ইত্যাদি ইত্যাদি।

স্যার ক্ষমা করবেন আমাদের। নিউজের খোরাক জোগাতে পুত্র হারানোর শোকে আচ্ছন্ন বাবাকেও আমরা ছাড় দেইনি। আপনাকে প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেছি একের পর এক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক রুমানা মঞ্জুরের বেলায়ও দেখেছি কিছু সাংবাদিকের বাড়তি কৌতূহল। প্রকৃত ঘটনার বদলে ব্যক্তি জীবনকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। উনি বিদেশে গিয়ে নতুন সংসার পেতেছেন এমন কথাও আমরা দেশে বসে থেকে দিব্যি লিখে দিয়েছি।

সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের পরও কিছু জন্ডিসে আক্রান্ত সাংবাদিক (হলুদ সাংবাদিক) তাদের লেখনি দিয়ে কাদা ছুঁড়ে দিয়েছেন রুনির চরিত্রে। একটিবারের জন্যও ভাবিনি মেঘের কথা। মৃত ব্যক্তির প্রাইভেসি তো অনেক দূরের বিষয়।

কথায় বলে, কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু মানুষই বোধ হয় একমাত্র জীব যে কিনা নিজের স্বজাতির মাংসে কামড় বসাতে পারে অবলীলায়। বড় হয়ে সাংবাদিক হবো এমনটা কখনোই ভাবিনি। তবে এই পেশার প্রতি ভাললাগা সব সময়ই কাজ করতো। এখন খুব কষ্ট হয় এই ভেবে যে, সাংবাদিকতার এমন দুর্দিনে নিজেকে এই পেশার সাথে যুক্ত করলাম যখন অন্যের চরিত্র হরণমূলক লেখা লিখে পত্রিকার কাটতি আর অনলাইনের হিট বাড়াতে হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.