নারী দিবস ২০১৫: একটি ফেসবুক অভিজ্ঞতা

Womens Dayউম্মে রায়হানা: ফেসবুক ব্যবহার প্রথম শুরু করি ২০০৭ সালে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়ায় অনেকদিন বন্ধ ছিল ফেসবুকে ঢোকা। বর্তমান অ্যাকাউন্টটা খুলি ২০০৯ সালে। তারপর থেকে মোটামুটি নিয়মিতই ব্যবহার করেছি তুমুল জনপ্রিয় এই যোগাযোগ মাধ্যম। হাজারখানেক বন্ধু রয়েছে ফেসবুকে, তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনি।

এ বছর নারী দিবসকে ফেসবুকের জানালা দিয়ে কেমন দেখলাম, সেই অভিজ্ঞতাই জানাতে চাইছি আজ।

ফেসবুকের পাতা থেকে পেয়েছি দারুণ দারুণ সব বিশ্লেষণী লেখা। সব পত্রিকা বা ওয়েবসাইট ফলো করা হয় না। ফেসবুকে লিংক থেকে পাওয়া যায়, পড়া যায়। অর্থনীতিতে নারীর অবদান, নারী দিবসের কর্পোরেট কালচার, নারীর যৌনশ্রম বা বেশ্যাবৃত্তি – এ সমস্ত বিষয়ে অন্য যে কোন দিনের চেয়ে প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা ছিল বেশি।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত নারীর উদযাপনের চেহারা, যা কিনা স্বাভাবিকও। আর এই মধ্যবিত্তদের নারী দিবস নিয়েই বলতে চাইছি কয়েকটা কথা।

পার্পল রঙের শাড়ী-জামা পরে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া বন্ধুদের ছবি দেখে খুব ভালো লেগেছে, এক বন্ধুকে দেখলাম নিজে পার্পল শাড়ী তো পরেইছে, বরকে পরিয়েছে পার্পল শার্ট, ছবির ক্যাপশন, নারীর জয় হোক। এমন ছবি আগে কখনই দেখিনি।

স্মার্টফোন আর সেলফির যুগ বলেই হয়তো ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছি, নইলে অগোচরেই রয়ে যেতো এই বিষয়টি। তবে গত পাঁচ বছরে এই দিনে ফেসবুকের পাতায় পার্পল রঙের ছড়াছড়ি এই প্রথম দেখলাম।

শুধু কর্মজীবী নারীরাই নন, আমার অনেক স্কুল-কলেজের বন্ধু, যাদের অবদান সমাজে স্বীকৃত হয় না, যাদের বলা হয় গৃহবধূ, কখনো কখনো সরাসরি ‘ভাবী’ বলে যাদের হেলাতুচ্ছ করা হয়, যাদের জীবন সিরিয়ালের- শপিংয়ের বলে ধরে নেওয়া হয় – সেই বন্ধুদের অনেককেও দেখলাম সন্তানের স্কুলের সামনে অভিভাবকরা মিলে ছবি তুলেছেন পার্পল পোশাকে। কেউ কেউ জায়েরা মিলে যৌথ পরিবারের ছাদে উঠে ছবি তুলে, দিয়েছেন ফেসবুকে, গেয়েছেন নারীর জয়গান, উদযাপন করেছেন নারীত্ব।

কেউ বলতে পারে, তাতে কী হয়েছে? নারীসমাজ (যদিও এই নারীসমাজ বলতে ঠিক কী বুঝায় তা আমি জানিনা) কতটুকু এগিয়েছে তাতে? এমনকি কেউ এ-ও বলতে পারেন এই পার্পল রঙের প্রদর্শনী নারীকে সৌন্দর্যচর্চা ও শরীর নিয়ে ব্যস্ত থাকার দিকে আরও একটু এগিয়ে দেয়।

সে সব তাত্ত্বিক বাহাস। যে কোন আদর্শবাদী অবস্থানেই থাকে নানা মত, নানা পথ। পুরুষের এই পৃথিবীতে নারীর হয়ে দাবি-দাওয়া শ্রমিক শ্রেণীর নারী প্রথম তুললেও, পশ্চিমে নারীবাদের উত্থানের সময় থেকেই শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত, শহুরে, শিক্ষিত নারীর দাবি দাওয়া ছিল কেন্দ্রে, বাদ পড়েছেন কৃষ্ণাঙ্গ নারী, মুসলিম নারী। ফলে, তৈরি হয়েছে আরও নানা স্কুল।

কিন্তু এমন অনেকে আছেন যারা নারী দিবসের সত্যিকার ইতিহাস জানেনই না, কিন্তু নিয়েছেন বিরুদ্ধ অবস্থান। নারী দিবসকে নিয়ে তাদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের অন্ত নাই। এদের অনেকেই তথাকথিত প্রগতিশীল নারী-পুরুষ।

বিরাট মানবতাবাদী সেজে মানুষ দিবস চাইছেন তারা।

নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস মুছে দেবার পুরুষাধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্র ছাড়া এই তথাকথিত মানবতাবাদকে অন্য কোন নামে ডাকতেই আমি রাজি নাই।

শ্রমিক নারীর অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক এই দিনটিতে যদি খাঁচায় থাকা মধ্যবিত্ত নারী একটু অন্যরকম করে সময় কাটায় তাতে সমস্যা কোথায় আমি বুঝতে পারি না। সত্যি পারি না।

গতকাল নিজের লেখা ফেসবুক স্ট্যাটাসটাই এখানে তুলে দিচ্ছি

‘ডায়বেটিক/এইডস দিবসে কেউ বলে না অ্যাজমা/কলেরা দিবস নাই কেন?
বন্ধু দিবসেও কেউ প্রশ্ন করে না কাজিন দিবস কই?
নারী দিবসেই লোকে পুরুষ দিবস/মানুষ দিবস খুঁজতে থাকে কেন?
এরা কি নারী শ্রমিকের মানবেতর কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে, ন্যয্য মজুরির দাবীতে লড়াই সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস মানে না, নাকি জানে না?
না জানলে গুগল করে না কেন?’

নারী দিবস বিরোধীদের মধ্যে অনেকে আবার এক কাঠি সরেস। তাদের অনেকেরই বক্তব্য এরকম – পার্পল রঙের সুসজ্জিতা আধুনিক নারীরা নাকি ক্লারা জেটকিন বা রোজা লুক্সেমবার্গের নামও জানেন না। সাজুগুজু করার উপলক্ষ পেয়েই নাকি তারা খুশী!

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করো, বৈষম্যমূলক মজুরি ব্যবস্থা উৎখাত করো, নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দাও – এই দাবি তোলার জন্য ব্যক্তি নারীর যাপিত অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট।

মধ্যবিত্ত নারীর নারীত্ব উদযাপনে প্রবল ঈর্ষান্বিত এই পুরুষদের কি মনে হয় পড়ালেখা করে নিজের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করতে হবে?

নারী কী করবেন আর কী করবেন না তার ফতোয়া দিতে আসা শিক্ষিত এই পুরুষরা কেউ তেঁতুল শফির চেয়ে কম বড় ফতোয়াবাজ নন। দুঃখিত, এভাবেই বলতে বাধ্য হচ্ছি।

ক্লারা জেটকিন, রোজা লুক্সেমবার্গ, এলিজাবেথ কেডি স্ট্যান্টন, মেরি ওয়েলস্টোনক্রাফট, ক্যাথরিন ম্যাককিনন, গ্লোরিয়া স্টেইনেম, অ্যান্ডরিয়া ডরোকিন, অ্যাডরিয়েন রিচ, ভার্জিনিয়া উলফ এমনকি রোকেয়া, প্রীতিলতার নাম না জেনেও নারী চাইতে পারে মুক্তি। নাকি পারে না?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.