মাগুরার পাপের বোঝা নামিয়ে দিলো ৪ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

ECমাসুদা ভাট্টি: কেমন হলো ৪ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন? এক কথায় এর উত্তর, অভূতপূর্ব। সেটা কেমন? একটু ব্যাখ্যা করা যাক। বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে এখন দাঁড়িয়ে যেখান থেকে কেবল সামনের দিকটাই দেখার সুযোগ রয়েছে। কারণ এখন যদি কোনো ভাবে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হয় তাহলে সে গাঢ় অন্ধকার থেকে আমরা কখনোই ফিরে আসতে পারবো না। তার মানে হচ্ছে, দেশের গণতন্ত্র একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে, পরিস্থিতি সামাল দেয়া মুশকিল হতো।

বাংলাদেশে নির্বাচনের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। বিশেষ করে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচনই হোক না কেন তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাটা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হয়ে পড়েছিল। যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি উদ্ভট ও সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নির্বাচন-ব্যবস্থাকে আমাদের মেনে নিতে হয়েছিল এক প্রকার বাধ্য হয়েই। কিন্তু বিগত কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতাই আমাদের ভালো নয়, বরং ভয়ংকরই বলা ভালো। এমতাবস্থায় আদালতের নির্দেশে যখন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিল হলো তখন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই স্বস্তি বোধ করেছিলেন যে, বাংলাদেশকে আসলে নিজেকে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট-চরিত্র অর্জন করতে হলে এই তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যে ভাবে নির্বাচন হয়ে থাকে সে ভাবেই নির্বাচন করে দেখাতে হবে। মোটকথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারণে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও ঠিক গণতান্ত্রিক ছিল না, আধুনিক রাষ্ট্র হয়েও ঠিক আধুনিক হয়ে উঠতে পারছিলো না। সুতরাং এই পদ্ধতি বাতিল করে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনই ছিল একমাত্র পথ সঠিক ও সমুন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পা রাখার। সে বিচারে গতকাল (১৫ই জুন ২০১৩) অনুষ্ঠিত ৪ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। কারণ আমাদের এই দেশেই মাগুরা উপনির্বাচনের মতো একটি দলীয় ও কারচুপি-পূর্ণ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, যে কারণে তত্ত্বাবধায়কের মতো একটি অগণতান্ত্রিক কাঁটা জাতির গলায় এতোদিন আটকে ছিল। আমি নিশ্চিত যে, আমার সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন, ৪ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের এই উদার, সংগঠিত, সুসংহত, ব্যত্যয়হীন সমাপ্তি আমাদের মাগুরা-পাপ থেকে মুক্তি দিলো।

এই সিটি-নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা আবশ্যক বলে মনে করছি। তাহলো, মিডিয়া যেভাবে নির্বাচনটি “কভার” করেছে, সে দিকটি নিয়ে সামান্য আলোচনা জরুরী। বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাধীন – এই সিটি নির্বাচন আবারও সেটি প্রমাণ করেছে। বেশ চমৎকার ভাবেই এই নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচনকালীন সংবাদ জাতির সামনে পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরেছে দেশের মিডিয়া। কিন্তু একটি ব্যাপারে খট্‌কা লেগেছে যখন দেখা গিয়েছে যে, নির্বাচনের দুই দিন আগে প্রার্থীদের প্রচারণা বন্ধ হয়ে গেলেও গণমাধ্যমে ১৮ দলীয় প্রার্থীদের প্রচারণা বন্ধ থাকেনি। তারা বিগত তিন দিন ধরে কারণে-অকারণে সংবাদ-সম্মেলন করে সরকারের বিরুদ্ধে ও প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। এমনকি নির্বাচনের দিন তারা সর্বোচ্চ ৫-৭টি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ভোটারদের উস্কে দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস নির্বাচনী আচরণ-বিধিতে এই বিষয়টি সংযুক্ত হওয়া জরুরী যে, প্রার্থীদের প্রচারণার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় ভাবে সাংবাদিক সম্মেলনও বন্ধ করে দিতে হবে। নইলে তাতে ভোটারদের মনে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। মিডিয়া স্বপ্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ভালো হতো কিন্তু এখন বোধ করি নির্বাচন কমিশনকেই এই দায়িত্বটি পালন করতে হবে।

কিন্তু সবকিছুর পরও নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে, সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়েছে। গতকাল দিনভর বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা সরকার কারচুপি করে জয়লাভ করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছে। সেগুলো যে আসলে মিথ্যাচার ছিল সেকথা বলাই বাহুল্য। সে জন্য তাদেরকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে বলবো না কিন্তু ভবিষ্যতে এরকম মিথ্যাচার যে দলটির ক্ষতির কারণ হবে সেকথাটি স্পষ্ট ভাবে বলতে চাই। বিজয় লাভের এই কৃতিত্ব জনগণকেতো দিতেই হবে সেই সঙ্গে সরকারকেও ধন্যবাদ জানানো উচিত দলটির যে, এ দেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব কিছু নয়, সেটা সরকার প্রমাণ করেছে বলে। এই ভরসাতেই বিএনপি আগামি সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেবে বলে আমরা দলটির কাছে আশা করতেই পারি।

অপরদিকে আওয়ামী লীগের জন্য ৪ সিটি নির্বাচনে ভরাডুবি আসলে বড় ধরনের “ছবক”। আশাকরি, দলটি এই “ছবক” গ্রহণ করবে এবং সে অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। ক্ষমতায় গেলে যে আওয়ামী লীগ নামের দলটি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায় সেকথা আবারও প্রমাণিত হয়েছে, এখন বিষয়টি দলটির নেতাকর্মীরা বুঝলে হয়।

কিন্তু সবকিছু বাদ দিয়ে এই নির্বাচনে আসলে বিজয় হয়েছে আপামর জনগণের। কারণ, জনগণ বুঝতে পেরেছে তাদের শক্তির মূল মন্ত্রটি আসলে কোথায়, সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে সেই মন্ত্র ব্যবহারের পথ জনগণ আবিষ্কার করতে পেরেছে, আমাদের মতো আম-জনতার আনন্দের জায়গাটি এখানেই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.