নারীর মানসিক বিকলাঙ্গতা-দায়ী আমরাই

women dress 1নাজিয়া হক অনি: আজকে নারী দিবস। সবাই খুব ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে অনেক কথা বলছেন। প্রতি বছরই সবাই বলে। যথারীতি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করেও দেয়া হবে। আমার কথাও এর ব্যতিক্রম না। কাজেই এই সুযোগে আমিও বলি। আমার কথাও আপনারা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েন। তবে এক কান থেকে আরেক কানে সোজাসুজি না গিয়ে যদি সম্ভব হয় আপনাদের মগজের চারপাশে তিন-চার সেকেন্ড একটু ঘুরিয়ে আনেন, তাহলেই আমি খুশি।

নারী অধিকার, সম অধিকার এসব কথা বলতে বলতে এখন পুরনো হয়ে গিয়েছে। আমরা অধিকার বলে চেঁচাতে চেঁচাতে এটা ভুলে যাই “অধিকার” বস্তুটি কেউ কোনদিন ফ্রি তে পায় না। এটা একটি টুথপেস্ট কিনলে একটি টুথব্রাশ ফ্রি এর বিজ্ঞাপন না। তাহলে “অধিকার” এর মুল্যও তেমনি হতো। ফ্রি ফ্রি ফ্রি। কিন্তু আমরা তো জানি অধিকার কতটুকু অমূল্য। উন্নত বিশ্বের মেয়েদের অবস্থার সাথে এদেশের মেয়েদের একটু তুলনা করলেই বোঝা যায় আমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়।

এর জন্য দায়ী কে? সমাজ  ব্যবস্থা? ধর্ম? সংস্কার? না। এর জন্য দায়ী আমাদের মানসিক অলসতা, মানসিক বৈকল্য, মানসিক দাসত্ব এবং সর্বোপরি মানসিক বিকলাঙ্গতা। তবে এই মানসিক বিকলাঙ্গতা একদিনের ফলাফল নয়। অনেক চর্চার মাধ্যমে অনেক সময় ব্যয় করে এই পর্যায়ে আজ আমাদের নারীরা মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ।

একটা পাখির বাচ্চাকে জন্মের পর থেকে যদি উড়তে দেয়া না হয়, পায়ে সুতা বেঁধে তার ঘুরে বেড়াবার সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় তবে একটা বয়সের পর তাকে সুতা খুলে দিলেও সে উড়তে পারবে না। উড়তে চাইলেও পারবে না আর যদি পারেও বা তা করতে যে কষ্ট করতে হয় তা করার জন্য যে মনোবল দরকার বা সেই মনোবল সৃষ্টি হতে যে পরিবেশ দরকার তা সে নিশ্চিত পাবে তাও বলা যায় না। এরকম উদাহরণই সচরাচর ব্যবহার করা হয় নারীর অবস্থা বোঝানোর জন্য। সবগুলোই অতি নিকৃষ্ট মানের তুলনা বলে মনে হয় আমার কাছে। কেন?

প্রথমত নারী একটা পাখির বাচ্চা না। একজন নারীকে জন্ম থেকে সমাজ যে শেকল পড়ায় তা তাকে পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়েই পরানো হয়। সে জানে এই শেকল পরলে তার পরিণতি এরুপ হবে। বিয়ে, অথবা আরও পরিষ্কার ভাবে বললে আমাদের সমাজে যে প্রথায় বিয়ে নামক চর্চাটি করা হয় তা এমন একটি শেকল যা যেকোনো মেয়ের জন্য তার সারাজীবনের স্বপ্ন পূর্ণ করার ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। বিয়ে দুটি মানুষের মধ্যে পবিত্র এক ভালবাসার বন্ধন এবং সামাজিক স্বীকৃতি। কিন্তু এর সাথে যেসব অনুষ্ঠানিকতা ও রীতিনীতি এদেশে যুক্ত হয়েছে তা দিয়ে একটা মেয়ের শিকড়ে যে আমূল টান পড়ে, খুব মেয়েই পারে সেই টানের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে, নিজের পরিচয় সৃষ্টি করতে। অধিকাংশই ঝরে পরে। এবং দ্বিতীয়ত, পাখির বাচ্চার ওইটুক জ্ঞান থাকে না যে ভবিষ্যতে তার উড়তে কষ্ট হবে, বা তার পরিপূর্ণ বিকাশে কোন অসুবিধা হবে, তাকে বলে দেয়ার বুঝিয়ে দেবারও কেউ নেই, তাই সে চুপচাপ মেনে নিতে পারে।

কিন্তু একজন নারীকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেও, তাকে কি কি উপায়ে সমাজ, সংস্কৃতি রীতিনীতি তার পূর্ণ বিকাশে কি কি উপায়ে বাধা দিতে পারে, হস্তক্ষেপ করতে পারে তার সম্যক জ্ঞান থাকার পরেও যখন সে একটি পরজীবী আগাছা রুপি মানসিক বিকলাঙ্গ প্রাণীতে পরিণত হয়, তার মস্তিষ্কের কোন চর্চা না করে কেবল দৈহিক সৌন্দর্য ও ছলা কলা অভিনয় ন্যাকামি আয়ত্ব করতে জীবন কাটিয়ে দেয়, তখন আসলেই মনে হয় আদৌ কি সমাজের দোষ? শিক্ষার দোষ? ধর্মের দোষ?

দোষ দেয়া খুব সহজ। আমি একটা জিনিস জীবনে করতে ব্যর্থ হলাম, নিজের ঘাড়ে নিজের দোষ স্বীকার করব এই সাহস খুব মানুষের থাকে, তাই আমি দোষ দেই সমাজকে, রীতিনীতিকে, ধর্মকে। আমি বলি আমাকে পরিবার বাধা দেয়, স্বামী বাধা দেয়, শ্বশুরবাড়ির লোক বাধা দেয়, সমাজ বাধা দেয়। ধর্ম বাধা দেয়।

ইদানিং তো ধর্মের অজুহাত দেয়া এক ধরনের ফ্যাশনই হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আসলেই কি তাই? একটা মেয়ে যদি ঠিক করে আমি সবচেয়ে বড় পদে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হব, দেশকে দেশের মানুষকে কিছু দিয়ে যাব, এবং সেজন্য তার লক্ষ্যে অটুট থাকে, যদি সে সেই মত পরিকল্পনা করে এগিয়ে যায় তাকে থামানোর ক্ষমতা কারো নেই। দরকার শুধু তাকে হাত ধরে শিক্ষা গ্রহণে সহায়তা করা।

একটা চারা গাছকে যেমন কিছুদিন পর্যন্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে সোজা বাড়তে পারে তার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়, কিছুদিন পর যেমন সে নিজেই বড় হতে পারে তেমন করেই প্রতিটি মেয়েকে ছোট থেকে পরিবার থেকে সে যেন মেয়ে নয়, একজন মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে, তার শিক্ষা দেয়া দরকার। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, সে যেন নিজ চেতনার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠতে পারে, সেইভাবে তাকে গড়ে তোলা দরকার। সে যে একজন মানুষ, তার জীবনে রঙ মেখে সং সাজার চাইতেও যে অনেক বেশি কিছু করার আছে এবং ওটা করতে পারার মধ্যেই যে তার সার্থকতা সেটা তাকে জানানো দরকার।

স্ত্রী নয়, মা নয়, কন্যা নয় তার পরিচয় সে একজন মানুষ। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতই সেও আরেকজন মানুষ। তাকে তার জীবনে অসাধারণ হয়ে উঠতে হলে আর সবার মতই কষ্ট করে পরিশ্রম করে বড় হতে হবে। পরের ঘাড়ে বসে থেকে জীবনে বেঁচে থাকা যায়, তবে সম্মান পাওয়া যায় না, এটা তাদের উপলব্ধি করতে দিতে হবে। এভাবে যদি তাকে ছোট থেকে মানসিকভাবে সবল করে তুলতে পারা যায়, তবে ওইটুকু সাহায্যই তার দরকার। বাকি পথ সে নিজেই খুঁজে নিবে।

একটা ছেলে শিশু ও মেয়ের শিশুর বড় করার মধ্যে যেদিন কোন পার্থক্য রাখা হবে না, সেদিনই সম্ভব হবে নারীর মানসিক বিকলাঙ্গতা দূর করা। তা নাহলে যতই নারীমুক্তির গান গাওয়া হোক না কেন, আর নারী দিবস পালিত হোক না কেন, আরও সহস্র বেগম রোকেয়া জন্ম নিলেও নারীদের অজুহাত দেবার অভ্যাস যতদিন না দূর হবে, নিজের দোষ নিজে দায় স্বীকার না করার অভ্যাস দূর হবে, পারিপার্শ্বিকতাকে দোষারোপ করার অভ্যাস দূর হবে, ততদিন পর্যন্ত নারীরা এমনই থাকবে, দুর্বল, অবহেলিত, অসম্মানিত।

-ডাঃ নাজিয়া হক অনি

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.