আমার সকল গান-৬(ঈর্ষাকাতর পুরুষ আর নারী দিবসের শুভেচ্ছা বাণী)

Thoughtsশারমিন শামস্: পৃথিবীতে অন্যতম কুৎসিত দৃশ্য হলো, ঈর্ষাকাতর পুরুষের মুখ। একটি পুরুষ তার কাজের জন্য, সফলতার জন্য যখন একজন নারীর প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েন, তখন তার চোখে মুখে সেই ঈর্ষা গভীর প্রভাব ফেলে বলেই আমার অভিজ্ঞতা বলে।

ঈর্ষা রিপুটি পুরুষকেই শুধু নয়, নারীকেও আচ্ছন্ন করে, কিন্তু আজীবন ঈর্ষার সাথে নারীকে জড়িয়ে এমন একেকটি মিথ দাঁড় করানো হয়েছে যে, মনে হয়, নারী মাত্রই ঈর্ষাকাতর, হিংসুটে। কিন্তু এই জীবনে, প্রায় এক যুগ সময়ের কর্মক্ষেত্রে বিচরণের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, ঈর্ষা নামক বোধটিতে কোন কোন পুরুষ এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, যা তাকে নানা নেতিবাচক কথা, কর্মকান্ড ও আচরণে উদ্বুদ্ধ করে।

আমার এই ছোট্ট সাংবাদিকতার জীবনে ঈর্ষাকাতর সহকর্মীদের ফেস করাও ছিল প্রতিদিনের এক অত্যাবশ্যক অ্যাসাইনমেন্ট। আর তাদের অধিকাংশই পুরুষ, একথা্ও বলতে হচ্ছে। আমার ধারণা, ঈর্ষাকাতর পুরুষের মনে সবসময়ই একটি বোধ কাজ করে, তাহলো, নারী তো নারীই, তার আবার এতো যোগ্যতা কীসের? আর যোগ্যতা যাই হোক, আমি পুরুষ, অতএব, ঐ নারীর আমার চেয়ে এগিয়ে যাবার কোন যুক্তি নেই। এটি অসম্ভব বলেই তারা মনে করেন।

ঈর্ষা হলে পুরুষ নারীকে পিছন থেকে টেনে ধরার সবধরনের চেষ্টা করেন। না পারলে তার সম্পর্কে নানা কথা ছড়ান। তাকে নানাভাবে অপমান করার চেষ্টা করেন। কথাবার্তায় তাকে আহত করেন। কর্মক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে নানা কথা ছড়িয়ে বসদের কাছে তার অবস্থা টেনে নামানোর প্রাণপন চেষ্টা করতে থাকেন। বিশেষ করে মেয়েদের একান্ত সমস্যাগুলোকে তার দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে নানাভাবে অপদস্ত আর অযোগ্য প্রমাণের কোন চেষ্টাই ছাড়তে রাজী নন এইসব পুরুষ।

এরকম সহকর্মী পেলে মেয়েটির চলার পথ কঠিন হয়ে ওঠে। মেয়েটি মানসিক অবসাদে ভোগে। তার নিরাপত্তাহীনতা বোধ জাগে। বিষন্নতা হয়। হতাশা আসে। বিরক্তি আসে। আমি হলফ করে বলতে পারি, প্রতিটি কর্মজীবী মেয়ে, এই ধরণের মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। এখন্ও হচ্ছেন। এবং ভবিষ্যতেও হবেন।

ঈর্ষাকাতর পুরুষ সাধারণত অযোগ্য হন। অযোগ্য এবং কম যোগ্য। যারা যোগ্য এবং প্রতিভাবান, তারা নিজেদের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন সাধারণত। প্রতিযোগিতায় তারা সামিল হন। দড়ি টানাটানির খেলায় নোংরামি করার সময় তাদের তুলনামূলক কম।

অযোগ্যরা কাজটাও ঠিকমত পারে না বলে অন্য সহকর্মীর পিছনে সময় নষ্ট করে। অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করে তুলতে চায়। এরা কর্মক্ষেত্রে নানারকম দলবাজি, গলাবাজি এসব করে নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করে।

মেয়ে সহকর্মী পুরুষদের তুলনায় নরম কোমল বিনয়ী স্বভাবের হয় বলে, সবার আগে মেয়েটির রাস্তায় কাঁটা বিছানোটাই বেশি সহজ তাদের জন্য।
এ পরিস্থিতিতে মেয়েটির যা করতে হয়, তার নাম যুদ্ধ। রীতিমত যুদ্ধ করে কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান পাকা এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় তাকে। নারীর চিরন্তন বৈশিষ্ট্য, অবস্থা, পরিস্থিতিকে এইসব পুরুষ সহকর্মী যখন নারীর দুর্বল দিক বলে প্রচারণা চালায়, তখন নারীকে সেই প্রচারণার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়। ফলে জীবনে অনেক ছোট বড় মূল্যও দিতে হয় তাকে।

এসব পুরুষ সহকর্মী প্রেগনেন্ট হলে বলেন, ‘সে অসুস্থ।’ সন্তান গর্ভে ধারণ তাদের চোখে অসুস্থতা। কারণ এভাবে বল্লেই প্রমাণ করা যাবে, মেয়েটি নয় মাস অসুস্থ থাকবে। অসুস্থ মানে কাজের অযোগ্য। এইসব পুরুষ মেয়েটি একদিন বাচ্চার জ্বরের জন্য কাজে আসতে না পারলে, বিষয়টি ঢাকঢোল পিটিয়ে বারবার উল্লেখ করতে থাকে। মেয়েটির বিয়ে ঠিক হলে আগাম চিন্তা ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে বসদের মনে, ‘এরপর সে ঠিকমত কাজে আসতে পারবে তো? চাকরিটা করবে তো? নাকি হুট করে ছেড়ে দিয়ে অফিসকে বিপদে ফেলবে?’

মেয়েটি ভাল অ্যাসাইনমেন্ট যাতে না পায়, সেজন্য অ্যাসাইমেন্টে মেয়েটি ঠিক টাইমে যায় না, গেলেও সেখানে গিয়ে ঠিকমত কাজ করে না, এরকম নানা কথা অফিসে বলে মেয়েটিকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে উন্মুখ থাকে অনেক পুরুষ সহকর্মী।

আমার অভিজ্ঞতা পুরোটাই গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট। অন্য মাধ্যমে যারা কাজ করছেন, আমার বন্ধু বা বোন, তাদের কাছ থেকেও শুনেছি নানা কষ্টের কথা। কর্মক্ষেত্রে বারবার ‘নারী’ পরিচয়টি তার শক্তি নয়, দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে সামনে চলে আসে। নারীকে তখন প্রমাণ করতে হয়, নতুন বৌ হলেও সে কাজে আসছে সময়মত, গর্ভবতী হলেও সে নাইট ডিউটি করছে, মা হলেও ছোট্ট সন্তানকে প্রবল জ্বরের ঘোরে রেখে অফিসে ছুটে আসছে। পুরুষকে এসব প্রমাণ করতে হয় না। নতুন জামাই ১৫ দিন ছুটি নিলে ‘পুরুষ মানুষ’ বলে সমালোচনা করার কেউ নেই। ছেলেমেয়ের জ্বরে বাবা ছুটি নিলে উল্টো সবাই প্রশংসা করে, ‘আহ, কী ভালো দায়িত্ববান বাপ’। আর প্রেগনেন্সি?

Shams
শারমিন শামস

পুরুষের সে ঝামেলা নেই। পুরষ তাই পাশের টেবিলে বসা প্রেগনেন্ট সহকর্মীকে আলগা স্বরে বলে, ‘কী ব্যাপার তুমি এত কাহিল হইছো কেনো? আমার বউকে দেখতাম, প্রেগনেন্সির টাইমে পুরাই ফিট। সব কাজ করছে। হাহাহাহাহা’- এই হলো ঈর্ষাকাতর পুরুষের একটি চিত্র, যা দেখেননি এমন কোন কর্মজীবী নারী নেই। অন্তত এদেশে। এবং এদেশের গণমাধ্যমের হাউসগুলোতে, যেখানে পেশাদারিত্ব বলে কোন বস্তু গড়ে ওঠেনি, কোন নীতিমালা নেই, কোন আচরণ নির্দেশিকা নেই।

তো এইসব হাউজেও আজকে নারী দিবস নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে। বেগুনি জামা পরে রিপোর্টাররা পিটিসি দিচ্ছে। ঈর্ষাকাতর পুরুষের দল শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। সবই হচ্ছে। যুগে যুগে নারীকে ঈর্ষাকাতর অযোগ্য-অসভ্য পুরুষের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই চলতে হবে পথ। এই নিয়তিকে এড়ানোর উপায় নেই। নিজেকে আরো যোগ্য, আরো পরিশ্রমী আরো লড়াকু করে তোলাই এই লড়াইয়ের প্রধান কৌশল।

লেখক- সাংবাদিক

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.