নারীপ্রশ্নে কর্পোরেট চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ জানানো জরুরি

8 March 2উদিসা ইসলাম: আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে বেগুনী শাড়ি-জামার ভীড় দেখে গাড়িচালককে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কি হয় বাদল ভাই?

উনি বললেন- এইখানে তো আপা মেলা হয়, নাইলে সম্মিলন হয়। আমি বললাম – ও আচ্ছা।

নারী দিবস উপলক্ষে লেখালেখি গত দুইদিনে অনেক বেড়ে গেছে পত্রপত্রিকায়। ঠিক তেমনই চোখ আটকে গেলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবাইয়াত ফেরদৌসের একটি লেখায় যেখানে তিনি বলছেন, বিপদজনক হওয়া সত্ত্বেও কেন নারী মোটরবাইকে একদিকে পা দিয়ে বসে। দোষটা কি কেবল পুরুষের এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভাবনার যে দৈনতা, তার ঘাড়েই বর্তায় সেক্ষেত্রে? নিজেকে প্রশ্ন করতে গিয়ে উত্তর পেলাম- ও আচ্ছা, হতে পারে।

দিবস দরকার আছে কি নাই সে নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরী হতে দেখি। নারীর আবার আলাদা করে দিবস কি? এক বন্ধুকে দেখলাম স্ট্যাটাস দিতে- একটা দিবস হোক মানুষের জন্য। মানে আলাদা করে নারী দিবস হওয়ার বিরোধিতা মস্তিস্কে আছে। কিন্তু নারী দিবসের যে মূল্যবোধ, নারী দিবসের যে চেতনা, নারী দিবস তৈরী হওয়ার যে প্রেক্ষাপট তাকে ছোট করার কোন সুযোগ কি আদৌ আছে? নেই। বিশেষ করে এর ইতিহাসটা যদি আমাদের জানা থাকে।

এই দিনটির শুরু ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি সুঁচ কারখানার নারী শ্রমিকেরা দৈনিক শ্রম ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে আট ঘণ্টায় আনা, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। আন্দোলন করার অপরাধে সেসময় গ্রেফতার হন অনেকে। তিন বছর পরে ১৮৬০ সালের একই দিনে গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯০৮ সালে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের কারখানার প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক একই দাবিতে আন্দোলন করেন এবং আদায় করেন দৈনিক আট ঘন্টা কাজের অধিকার। এরপর ১৯১০ সালের এই দিনে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে নারী নেত্রী ক্লারা জেঁকিন দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই সারা বিশ্বে দিবসটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করা শুরু করে। এর দু বছর পর ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এরপর রঙ হলো, ঢঙ বাড়লো। তাই বলে দিনটার শুরুর যে ইতিহাস তা ফিকে করে দিলাম কি করে? দিলাম যখন কর্পোরেট সো কল্ড এক্টিভিজমের ভিতর দিয়ে আমরা নারী দিবস পালন শুরু করলাম। তখন আর প্রকৃত জিনিসটা আমাদের সামনে থাকলো না, কৌশলে সেটাকে আনুষ্ঠানিকতায় নিয়ে ফেলা হলো। এবং আমরা বলতে শুরু করলাম তাহলে কি বাকী ৩৬৫ দিন পুরুষের?

বিষয়টিকে মিলিয়ে পড়তে চাই পাবলিক বাসের অভিজ্ঞতার সাথে।

নিয়ম হলো, নারীর জন্য পাবলিক বাসে সংরক্ষিত আসন থাকবে।  আপনি বাসের সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর আসন (ইঞ্জিনের ওপর ও পাশে) নারীর জন্য বরাদ্দ রাখলেন। আপনি কোন পুরুষ সহযাত্রীকে সেই সিট ছেড়ে দিতে অনুরোধ করলে যা শুনতে হয়- আপনারা না সমানাধিকার চান, তাহলে সংরক্ষিত আসন কেন চান? আর সংরক্ষিত আসনের বাইরে কোন নারী বসতে গেলে যে মন্তব্য শুনতে হয়- আপনাদের জন্য আসন বরাদ্দ আছে, তার বাইরেও ঘিরতে চান?

এখন আমাদের করণীয় কি? ও আচ্ছা বলে বরাবরের মতো চুপ থাকা? না, তর্ক শুরু করা এবং তর্ক সহ্য করার সক্ষমতা তৈরী করতে হবে। কেন দিবস জরুরি সেটা বোঝার জন্য সামাজিক রাজনেতিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নারীর পরিসর চিনতে জানতে হবে। নারীকে একদিকে বাইকে পা দেওয়া কেবল পুরুষরা চাপিয়ে দিয়েছে নাকি নারী তার শরীর বিষয়ে সচেতন থাকতে গিয়ে নিজেই সে পদ্ধতিতে থাকতে চেয়েছে সে তর্কে নামতে হবে। কারোর পিছনে দু পা দিয়ে বসলে শরীরের যে অঙ্গগুলো চালকের গায়ে লাগে সেটার স্বস্তি-অস্বস্তি বোধ নারীর বেড়ে ওঠার সাথে তৈরী হয়। এখানে কেবল চাপিয়ে দেওয়া দিয়ে সমাধান খুঁজলে মুশকিল।

পাবলিক বাসে সংরক্ষিত নারী আসন উদ্যোগটাকে পুরুষরা যেমন ইতিবাচকভাবে নিতে পারেননি, ‘প্রগতিশীল’ ধারার নারীরাও অনেকে নিতে পারেননি। কিন্তু এর আসলে উদ্দেশ্য কি সেই বোঝাপড়ার জায়গা সুনির্দিষ্টভাবে সমাধান হওয়া জরুরি ছিলো। ও আচ্ছা, এটা আসলে সমানাধিকারের কথা বলে নারীদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া কিংবা ও আচ্ছা কেবল ওই নয়টা সিটেই নারীরা বসবে এই হয়ে দাঁড়ালো সংরক্ষিত আসনের মানে। অর্থাৎ পরিবর্তনের সাথে সে বিষয়ে বোঝাপড়ার যে সমান সম্পর্ক থাকা জরুরি সে রাস্তা আমরা এড়িয়ে গেছি।

আর এর ফাঁক গলে নারী অধিকার আন্দোলন পিছিয়ে গেছে বরাবরই।

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.